বিপ্লব বিশ্বাস
বিভিন্ন এনজিও এমনকি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে তাদের সব শর্ত পূরণ করার পরও ঋণ গ্রহণের সময় ঋণগ্রহীতার শুধু স্বাক্ষরসহ ব্ল্যাংক চেক বা ফাঁকা চেক জমা রাখা হয়। আবার সাধারণ দরিদ্র পরিবারের শিক্ষিত ব্যক্তি যাঁরা বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতে যান, তাঁদের কাছ থেকেও জমা রাখা হয় একই রকম ব্ল্যাংক চেক বা ফাঁকা চেক। পরবর্তী কয়েক বছর চাকরি করার পর স্বাভাবিকভাবেই বাজারে কিছু টাকা বাকি পড়ে। এই টাকা আদায়ে দেরি হলেই কোম্পানির পক্ষ থেকে ঐ কর্মচারীকে অভিযুক্ত করা হয় এবং কারণ দর্শানো কোনো নোটিশ না পাঠিয়ে বা বরখাস্ত না করেই কাজ থেকে বিরত থাকতে মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়। দেখা যায় যে, কিছুদিনের মধ্যেই ঐ ব্ল্যাংক চেকে পাওনা টাকার চেয়েও অনেক বেশি অঙ্কের টাকা বসিয়ে কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। চেক ডিজঅনার মামলার অভিযুক্তের কাছে সমন পাঠিয়ে বা আদালত থেকে ওয়ারেন্ট ইস্যু করায় এই দরিদ্ররা অযথা পুলিশি হয়রানির শিকার হচ্ছে। এভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে দরিদ্র কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রকৃত পাওনার চেয়েও আদায় করা হচ্ছে অনেক বেশি টাকা। অনেক সময়ই এই প্রতারিত কর্মচারীরা জমি-জমা, গরু-ছাগল, মায়ের গহনা ইত্যাদি বিক্রি করে টাকা দিয়ে এইসব কোম্পানির কবল থেকে মুক্তি পাচ্ছে। একইসঙ্গে অন্য কর্মচারীদের কাছে পাওনা টাকার দায়ভারও চাপিয়ে কোম্পানির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ঐ ব্ল্যাংক চেকে ইচ্ছেমতো লাখ লাখ টাকার অঙ্ক বসিয়ে মামলা করে হয়রানি করা হচ্ছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে দেওয়া চাকরিতে যোগদানপত্র থাকা সত্ত্বেও লিখিতভাবে বরখাস্ত না করে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর এদেরকে কোনোরকম বেতনভাতাও দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে এই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ২০১৮ সালেই বলেছিলেন, দেশের প্রচলিত আইনে ব্ল্যাংক চেক অর্থাত্ শুধু স্বাক্ষরিত চেক জামানত হিসেবে রাখার আইনি কোনো ভিত্তি নেই। কারণ এ নিয়ে বাদী-বিবাদীকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। এছাড়া ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে প্রকাশিত সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বলা হয়েছে, চেকদাতা ও গ্রহীতার মধ্যে লেনদেন সম্পর্কিত কোনো বৈধ চুক্তি প্রমাণ করতে না পারলে শুধু চেক ডিজঅনার হলেও চেকদাতাকে সাজা দেওয়া যাবে না। এ রায়ে আরো রলা হয়েছে, বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে কী চুক্তি বলে বা বিবেচনায় চেকদাতা চেক ইস্যু করেছিলেন এবং সেই চুক্তিটি ব্যর্থ হয়নি, যার কারণেই বিবাদীর কাছে বাদীর পাওনা রয়েছে।
কাজেই এনজিও বা বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্ল্যাংক চেকের ব্যবহার বন্ধ করা এবং একইসঙ্গে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে যে ব্ল্যাংক চেক রাখা হয়, তাও বেআইনি ঘোষণা করা উচিত। লেনদেনের নিরাপত্তার জন্য অন্য যে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এমনকি সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে যাঁরা চাকরি করেন, তাদের কাছ থেকেও এধরনের শুধু স্বাক্ষরসহ ব্ল্যাংক চেক বা ফাঁকা চেক জমা রাখা হয় না। ব্যক্তিগত লেনদেনের জন্য একমাত্র চেকদাতার নিজের হাতে লিখিত তারিখ, প্রাপকের নাম ও টাকার অঙ্কসহ চেক গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কাজেই কোনো প্রাইভেট কোম্পানি যাতে এধরনের ব্ল্যাংক চেকের অপব্যবহার করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি করতে না পারে, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
ফরিদপুর
