বিশ্বের ইতিহাসে একেক যুগে একেকজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেন। তারা স্বীয় দেশ, জাতি ও সমাজকে অন্ধকারের পাপাঙ্ক হতে মুক্ত করেন। এরাই রাজনৈতিক অনাচার, কুসংস্কার থেকে সমাজকে তুলে এনে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করেন। বস্তুত জাতির ভাগ্যগুণেই শত-সহস্র বছরে এমন দু-একজন মহান পুরুষের আবির্ভাব ঘটে থাকে। বাঙালি জাতির ভাগ্যগুণেই তেমন এক মহাপুরুষের জন্ম হয় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ, গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। বাংলার রাজনৈতিক আকাশের সহস্র বছরের অবচেতনার গুহামুখ ভেদ করে জন্ম নেওয়া এ নবজাতকই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারি।
মা-বাবা আদর করে শিশুর নাম রাখলেন খোকা। একদিন এই খোকা দুর্বার গতিতে জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজেকে অতিক্রম করে খোকা নাম থেকে বহু বিশেষণে বিশেষায়িত হয়ে উঠতে লাগলেন। কী জাদু ছিল তার মধ্যে! যার স্পর্শে সমগ্র বিশ্বের সমকালীন রাজনীতিবিদ, কবি, শিল্পী-সাহিত্যিকসহ শ্রেষ্ঠ মনীষীরাই তাকে নিয়ে ভেবেছেন ও লিখেছেন। প্রসঙ্গক্রমে ভারতের খ্যাতিমান লেখক নিরঞ্জন মজুমদারের ১৯৭১ সালে লেখা ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক নিবন্ধের একটি উক্তি উল্লেখ করতেই পারি। বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘দেশে দেশে নেতা অনেকেই জন্মায়, কেউ ইতিহাসের একটি পঙিক্ত, কেউ একটি পৃষ্ঠা; কেউ বা একটি অধ্যায়। কিন্তু কেউ আবার সমগ্র ইতিহাস। শেখ মুজিব হচ্ছেন এই সমগ্র ইতিহাস।’ আলজেরিয়ায় ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে কিউবার নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সময় ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি হিমালয়ের সমতুল্য। আর এইভাবেই আমি হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা লাভ করেছি।’
মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল গভীর ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধু শিশুদের বলতেন, পৃথিবীতে যত প্রকারের ভালোবাসা আছে তার ভেতর দেশপ্রেম হচ্ছে সর্বোত্কৃষ্ট। পাকিস্তানের সংসদে শেখ মুজিব বক্তৃতা দিতেন বাংলায়। তিনি বলতেন, দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন অসাধারণ প্রতিভাধর নেতা। প্রতিভার গুণেই তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির ভাগ্যবিধাতা। তীক্ষ মেধা আর অদম্য সাহসের জন্য শেরে বাংলা- সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতাদের তিনি শুধু চোখেই পড়লেন না, তাদের সান্নিধ্য পেয়ে হয়ে উঠলেন বাংলার রাজনীতির যোগ্য কান্ডারি। আর পেছনে ফেরা নয়। শত সহস্র বছরের নির্যাতিত, নিপীড়িত সুবিধাবঞ্চিত বাঙালি জাতির জীবনজয়ী সংগ্রামে অবতীর্ণ হন তিনি। নিজের কৈশোর-যৌবন বিসর্জন দিয়ে, এই মহান পুরুষ স্বীয় ঐন্দ্রজালিক নেতৃত্বগুণে হয়ে ওঠেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তার আহ্বানেই ১৯৭১-এর ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সকল বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু সেদিন ১০ লক্ষাধিক জনতার সামনে বাঙালি জাতির স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখিয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যা মুক্তির সনদ হিসেবে স্বীকৃত।
দীর্ঘ নয় মাস এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের পর ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ’৭১-র ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি রাষ্ট্র স্থান করে নেয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পাকিস্তানের জেল থেকে বিশ্ব ইতিহাসের এই মহান নেতা চির উন্নত শিরে ফিরে আসেন আপন মাতৃকোলে। সেদিন থেকে শেষ হয় পরাধীন বাঙালির হাজার বছরের রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার। সেদিন লাখ লাখ জনতার বাকরুদ্ধ কণ্ঠে যেন বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল কবিগুরুর সেই অমিয় বাণী—‘ভেঙেছে দুয়ার এসেছে জ্যোতির্ময় তোমারি হোক জয়।’ কিন্তু হায়! হঠাত্ বিনা মেঘে বজ্রপাত। মহান বিজয়ের মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় যেতে না যেতেই বাঙালির ভাগ্যাকাশে নেমে এলো মহাদুর্যোগের ঘনঘটা। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫। এই দিন রাতের আঁধার শেষে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। জাতির ললাটে অঙ্কিত হলো চিরকলঙ্কের দাগ।
সময় যত যাচ্ছে, মানুষটি তত বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছেন। তিনিই বাঙালি জাতির সৌভাগ্যের বরপুত্র। মহাকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বঙ্গবন্ধু বাঙালি হূদয়ে চিরভাস্বর নক্ষত্র। তার জীবনাদর্শের আলোয় উদ্ভাসিত হবে আমাদের আগামীর পথচলা।
n লেখক : উপাচার্য, চাঁদপুর বিজ্ঞান
ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
