এম এ আলআমিন
করোনা ভাইরাসের টিকা তৈরি করতে চায় আফ্রিকা। ধারণা করা যায়, পশ্চিমা বৃহত্ ওষুধ প্রস্তুতকারীরা এতে বাদ সাধবে। আফ্রিকার এই সাহসী উদ্যোগ টিকা উত্পাদনের ক্ষেত্রে মহাদেশটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে দেবে। কেবল করোনা নয়, এই ধারা চলতে থাকলে যক্ষ্মা ও এইডসের টিকা তৈরির ক্ষেত্রেও মহাদেশটি আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।
রোগ প্রতিরোধমূলক টিকার জন্য আফ্রিকা ৯৯ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। করোনার সময়েও মহাদেশটিতে এ পর্যন্ত সবচেয়ে কম মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি দুটি পশ্চিমা কোম্পানি সেখানে এমআরএনএ টিকা প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি হাব স্থাপন করেছে। প্রক্রিয়াটির শুরু ২০২০ সালের অক্টোবরে। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় টিকার ওপর মেধাস্বত্ব অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করে। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে স্বল্প আয়ের দেশগুলো পেটেন্ট লঙ্ঘন না করেই করোনার টিকা উত্পাদন করতে পারত। প্রস্তাবটি এখনো ঝুলে আছে। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর আপত্তির মুখে প্রস্তাবটি আটকে আছে। তবে এ কথাও ঠিক যে, পেটেন্টের বাধা তুলে নিলেই যে দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর সমস্যার সমাধান রাতারাতি সমাধান হয়ে যেত তা নয়। কারণ উত্পাদনের ফর্মুলাই তো তাদের কাছে নেই।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমআরএনএ প্রযুক্তির হাব বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে বৃহত্ ওষুধ নির্মাতা কোম্পানিগুলো টিকা তৈরির একেবারে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পদ্ধতি শেয়ার করতে পারবে। ফ্রান্সও সরকারিভাবে উদ্যোগটি অনুমোদন করেছে। প্রথম হাবের প্রাথমিক অংশীদার হিসেবে দুটি দক্ষিণ আফ্রিকান কোম্পানি বাছাই করা হয়েছে। এগুলো হলো আফ্রিজেন বায়োলজিক্স অ্যান্ড ভ্যাকসিন ও বায়োভ্যাক। দুটোই কেপটাউনভিত্তিক কোম্পানি। প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করবে আফ্রিজেন।
মহামারি শুরুর আগে এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো টিকা বা চিকিত্সা উপকরণ তৈরি হয়নি। তবে টিকা তৈরিতে বায়োএনটেক/ফাইজার ও মডার্নার সাফল্য ইইউ দেশগুলোকে এ কাজে এগিয়ে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা এখন এমআরএনএ প্রযুক্তি সরবরাহে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিটি বিভিন্ন রকম ক্যানসারসহ ইবোলা ও এইচআইভির মতো প্রাণঘাতী রোগের চিকিত্সায় ব্যবহার করা যেতে পারে। বিপুল সম্ভাবনার কারণে বড় বড় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো নয়া প্রযুক্তিটির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক অমুনাফাভোগী প্রতিষ্ঠান হেলথ অ্যাকশন ইন্টারন্যাশনালে ইউরোপিয়ান প্রজেক্টসের সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার জুমে ভিডাল বলেন, ‘ওষুধ কোম্পানিগুলো বিপজ্জনক খেলা খেলছে।’ তিনি মনে করেন, এর ফলে সাধারণ মানুষের চেয়ে কোম্পানিগুলোই বেশি উপকৃত হবে।
সদ্য প্রতিষ্ঠিত হাবের মাধ্যমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এমআরএনএ টিকা তৈরির জন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে। এমআরএনএ প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যে টিকা তৈরিতে সফল বলে প্রমাণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে আফ্রিজেন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে। ইউনিভার্সিটিগুলোর নেটওয়ার্ক এবং আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) সহায়তায় কোম্পানিটি টিকা প্রযুক্তি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ করবে। প্রযুক্তি হস্তান্তরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যে এবারই প্রথম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করল তা নয়, ২০০৭ সালেও সংস্থাটি ফ্লুয়ের টিকা সম্প্রসারণের জন্য এ কাজ করেছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধি অনুসারে দুই উপায়ে হাব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবে। স্বল্প ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর জন্য বিনা মূল্যে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি ব্যবহার করবে অথবা এই হাব ঐ দেশগুলোর কাছে উত্পাদনের লাইসেন্স সরবরাহ করবে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য অবাধ লাইসেন্স ব্যবহারের সুযোগ নেই বলে মনে করেন। কারণ বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির মধ্যে এরই মধ্যে যে চুক্তিগুলো হয়ে গেছে, তার আওতায় এটি সম্ভব হবে না।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এমআরএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষিণ আফ্রিকায় উত্পাদিত টিকা যুক্তরাজ্যে বাজারজাত করা বা সেখান থেকে আমদানি করা যাবে না। এক্ষেত্রে চুক্তি ছাড়াও আরো সমস্যা আছে। আন্তর্জাতিক ফার্মা লবি আইএফপিএমএর ডিরেক্টর জেনারেল টমাস কুয়েনি বলেন, ‘হাবের বিধি কোম্পানিগুলো মানবে কি না, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ বিষয়। কোনো কোম্পানি স্বেচ্ছায় প্রযুক্তি ও লাইসেন্স শেয়ার করতে রাজি হবে কি না, সেটা বাইরে থেকে বলা সম্ভব নয়। কারণ যে প্রতিষ্ঠানের কাছে সেগুলো হস্তান্তর করা হবে, সেগুলো সর্বোচ্চ আস্থার পরীক্ষায় টিকতে হবে।
