কাবুলে তালেবান, ঘানির দেশত্যাগ

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২১, ২২:০৭

আফগানিস্তানে কার্যত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ এখন তালেবানের হাতে। রাজধানী কাবুলের চারদিক ঘিরে রেখেছে তারা। রাজধানীর ভেতরেও প্রবেশ করেছে। অপেক্ষা কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের। তালেবান সরকারকে পরাজয় স্বীকার এবং শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি করেছে। এ নিয়ে আলোচনাও চলছে। গতকালই দেশ ছেড়ে তাজিকিস্তানে গেছেন আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এর প্রধান হতে পারেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলি আহমাদ জালালি। তবে তালেবান নেতা মুল্লাহ বারাদারও প্রধান হতে চান। তালেবানের ভয়ে বাসিন্দাদের কাবুল ছাড়ার হিড়িক পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কর্মীদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়।

কাবুলে তালেবান

যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার পর গত ৬ আগস্ট আফগানিস্তান দখলের লড়াই শুরু করে তালেবান। মাত্র ৯ দিনের মাথায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি প্রায় সব প্রাদেশিক রাজধানী দখল করে। মাত্র সাতটি প্রাদেশিক রাজধানী গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরোপুরি দখল করতে পারেনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি। গতকাল তারা কাবুলেরও নিয়ন্ত্রণ নেয়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাবুলের চারদিকে এখন তালেবান। প্রবেশপথগুলো তালেবানের নিয়ন্ত্রণে। তালেবান প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের দিকেও যাত্রা করেছে। প্রাসাদের কাছে এবং কাবুলের বিভিন্ন স্থানে কাছে গুলির শব্দ শোনা গেছে। প্রথমে নিষেধ করলেও পরে তালেবান তাদের যোদ্ধাদের কাবুল শহরে ঢোকার আদেশ দেয়। তাদের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, কাবুলে লুটপাট ঠেকানোর জন্যই এ আদেশ। তিনি বলেন, সরকারি বাহিনী শহরের বিভিন্ন অংশ ও তাদের চেকপয়েন্টগুলো ছেড়ে চলে গেছে, তাই বিশৃঙ্খলা ও লুটপাট ঠেকাতে তালেবান বাহিনী শহরে ঢুকছে। তবে জোর করে ক্ষমতা নেওয়া হবে না বলে তালেবান জানিয়েছে।

তালেবানের আরেক মুখপাত্র সুহায়েল শাহীন এক বিবৃতিতে দাবি করেন, আগে যারা দুর্নীতিবাজ সরকারের সঙ্গে ছিলেন তারা আত্মসমর্পণ করেছেন। সুহায়েল জানান, সবাইকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়েছে। তালেবানের এক জন কর্মকর্তা বলেন, তাদের যোদ্ধাদের আকাশে গুলি ছুড়ে উল্লাস করতে নিষেধ করা হয়েছে। তালেবান বলছে, বিমানবন্দর ও হাসপাতালে স্বাভাবিক কাজকর্ম চলবে এবং জরুরি সরবরাহে বাধা দেওয়া হবে না। বিদেশিদের উদ্দেশে বলা হয়েছে যে, তারা চাইলে চলে যেতে পারে, নতুবা তালেবান প্রশাসকদের কাছে তাদের উপস্থিতির কথা নিবন্ধন করাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাসের কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ জোরদার করেছে। তালেবান বাগরাম বিমানবন্দর দখল করেছে। একটি কারাগারের ৫ হাজার বন্দিকে ছেড়ে দিয়েছে।                প্রেসিডেন্ট ঘানির দেশত্যাগ

আফগানিস্তান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি দেশ ছেড়েছেন। তিনি তাজিকিস্তানে গেছেন। তবে নিরাপত্তার কারণে ঘানির অফিস থেকে এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তালেবান যোদ্ধারা ঝটিকা অভিযানে আফগানিস্তানের অধিকাংশ এলাকার দখল নেওয়ার পর গতকাল রবিবার তারা কাবুল শহর ঘিরে ফেলে। এরপর থেকেই পদত্যাগ করার জন্য আশরাফ ঘানির ওপর চাপ বাড়ে। আশরাফ ঘানি একটি বিমানে করে তাজিকিস্তান চলে যান। ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহও দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তালেবান জানিয়েছে, তারা প্রেসিডেন্ট ঘানির দেশত্যাগ সম্পর্কে শুনেছেন। এ নিয়ে তারা খোঁজখবর নিচ্ছেন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হচ্ছেন?

শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনা আফগানিস্তানের বিভিন্ন মাধ্যমে চলছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হচ্ছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিক আলি আহমাদ জালালির নাম শোনা গেলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হতে চান তালেবান নেতা মুল্লাহ বারাদার। তিনি গতকালই কাতার থেকে আফগানিস্তানের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। তিনি তালেবানের কূটনীতির দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি গত মাসে স্বীকৃতি আদায়ে চীন এবং রাশিয়া সফরও করেছেন। শোনা যাচ্ছে, তালেবান আলি আহমাদকে মানতে চাইছে না।

কাবুল ছাড়ছেন বাসিন্দারা

তালেবানের অগ্রযাত্রা এবং রাজধানীর প্রবেশদ্বারে তাদের অবস্থান নেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শহরের বাসিন্দারা কাবুল ছেড়ে পালাতে শুরু করে। কোন পথে শহর ছাড়বে মানুষ তা ঠিক করতে হিমশিম খাওয়ায় রাস্তায় গাড়ির লম্বা লাইন তৈরি হয়। ব্যাংকগুলোতে প্রচণ্ড ব্যস্ততা দেখা যায়। কারণ মানুষ তাদের সঞ্চিত অর্থ তুলে নেওয়ার চেষ্টায় ব্যাংকে ভিড় করে। আফগানিস্তানের এমপি ফারজানা কোচাই বলেন, ‘আমি আমার বাসা থেকে দেখতে পাচ্ছি মানুষ পালানোর জন্য রাস্তা দিয়ে ছুটছে। তবে জানি না তারা কোথায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। ঘর থেকে পালিয়ে তারা কোন রাস্তা দিয়ে কোথায় যাবে জানে না। তাদের কাঁধে ব্যাগ। খুবই হূদয়বিদারক দৃশ্য।’ পাকিস্তান জানায়, তাদের সঙ্গে সীমান্তের আফগানিস্তান অংশের দখল তালেবান গ্রহণ করার পর তোরখাম সীমান্ত পারাপার চৌকি বন্ধ করে দিচ্ছে। ফলে শহর থেকে বের হবার একমাত্র পথ এখন কাবুল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। তালেবান বলেছে, তারা ক্ষমতায় আসছে। তবে এক জন বেসামরিক নাগরিকও যেন তাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন। তবে তারা যুদ্ধবিরতিতে যাবে না। ওদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এক জন মার্কিনির ক্ষতি হলে দ্রুত তালেবানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মার্কিন দূতাবাসের কাছে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে। তবে বিস্তারিত জানা যায়নি। একটি মার্কিন হেলিকপ্টারকে কাবুলের আকাশে উড়তে দেখা যায়। আবার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তালেবান পালটা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা বন্ধ না করলে তারাও অভিযানের দিকে যাবে। —আলজাজিরা, বিবিসি ও ডেইলি মেইল