শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সরবরাহ

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৩৫

শিল্পের প্রাণ হইল বিদ্যুত্ ও জ্বালানি শক্তি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যতীত শিল্পকারখানায় সক্ষমতা অনুযায়ী উত্পাদন সম্ভব নয়। বর্তমান সরকার বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ব্যাপারে আগের তুলনায় অনেক বেশি তত্পর। পত্রিকা মারফত আমরা প্রায়শই বিদ্যুত্ উত্পাদনের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রার চমকপ্রদ সংবাদ দেখিতে পাই। ২০৪১ সালের মধ্যে সরকার ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা অর্জন করিবার লক্ষ্যে কাজ করিতেছে, বিদ্যুত্ বিতরণ কোম্পানিগুলি ইতোমধ্যেই সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প হাতে লইয়াছে, সমুদ্রে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করা হইয়াছে। স্থলভাগেই ব্যবস্থা করা হইতেছে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের। চট্টগ্রাম হইতে পাইপলাইনে তেল সরবরাহের কাজ চলিতেছে। সরকার আশাবাদ ব্যক্ত করিতেছে যে, বর্তমানে পর্যাপ্ত বিদ্যুত্ রহিয়াছে, আগামী এক বত্সরের মধ্যে পর্যাপ্ত গ্যাসও মজুদ হইবে। সুতরাং সরকার মনে করিতেছে যে, বিনিয়োগের এখনই চমত্কার সময়।

কিন্তু পুরা বিষয়টি অনেকের নিকট এখনো দূর হইতে কাশবন ঘন দেখিবার মতো মনে হইতেছে। শিল্প কলকারখানার মালিক ও শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুত্ সরবরাহ এবং শিল্পঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে না আনিলে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হইবে না। ব্যাংকগুলিকে শিল্পঋণে ১৫ শতাংশ সুদ দিতে হইতেছে। এই সুদের হার পাঁচ শতাংশের মধ্যে না থাকিলে সেই পরিবেশকে বিনিয়োগ-বান্ধব বলা যাইবে না। যদিও সার্বিকভাবে ইহা স্বীকার করিতে হয় যে, বিদ্যুতের অবস্থা আগের যে কোনো সময়ের চাইতে এখন অনেক ভালো। তবে সমস্যা হইতেছে, আমরা এখনো মানসম্পন্ন বিদ্যুত্ পাইতেছি না। ভোল্টেজের আপ-ডাউন এবং সংযোগ বিচ্ছিন্ন হইবার ফলে শিল্প উত্পাদন প্রায়শই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইয়া থাকে।

বিগত দুই দশকে গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকটে বেশিরভাগ শিল্পকারখানা তাহার উত্পাদন সক্ষমতার সম্পূর্ণটুকু কাজে লাগাইতে পারে নাই। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে কেহ কেহ বিকল্প জ্বালানি হিসাবে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করিতে বাধ্য হইয়াছে। তাহাতে বৃদ্ধি পাইয়াছে শিল্পের উত্পাদন খরচ। বিশ্ব বাজারে যে তুমুল প্রতিযোগিতা রহিয়াছে, উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি পাইলে তাহাতে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হইতে হয়। অন্যদিকে সময়মতো রপ্তানি করিতে না পারিলে শুধু যে বাজার হারাইবার আশঙ্কা থাকে তাহা নহে, বরং উদ্যোক্তাও ঋণজটিলতায় পড়েন। এমনিতেই সুদের উচ্চহার এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হইলে নিয়মিত ঋণের কিস্তিও স্বাভাবিকভাবেই পরিশোধ করা দুঃসাধ্য হইয়া পড়ে। অর্থনীতির চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো একটি খাত প্রভাবিত হইলে তাহা বহু খাতে ছড়াইয়া পড়ে। বিগত দুই দশকে যাহারা বিনিয়োগ করিয়া বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সংকটের কারণে যে ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হইয়াছেন, তাহা অনেক ক্ষেত্রেই চুন খাইয়া মুখ পুড়াইবার মতো। সুতরাং অতীতে যাহারা শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ করিয়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ ও গ্যাসের সরবরাহের অভাবে বিভিন্নভাবে ক্ষতির শিকার হইয়াছেন, তাহাদের বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করিতে হইবে।