এই লড়াই চালাইয়া যাইতে হইবে

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২১, ২১:১৬

বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হইতেছে দিন দিন। কিছু দিন পূর্বেও করোনায় দৈনিক গড় মৃত্যু যেইখানে ছিল আড়াই শতাধিক, এখন সেই সংখ্যা দুই শতের নিচে নামিয়া আসিয়াছে। গতকাল প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সারা দেশে এক দিনে করোনায় মারা গিয়াছেন ১৮৭ জন। নূতন করিয়া শনাক্ত হইয়াছেন ৬ হাজার ৬৮৪ জন। শনাক্ত ও মৃত্যুর হার কমিতে থাকার বিষয়টি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু ইহাতে আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগিবার কোনো অবকাশ নাই। করোনার বিরুদ্ধে লড়াই আমাদের অব্যাহতভাবে চালাইয়া যাইতে হইবে। বর্তমানে করোনা সংক্রমণের হার ২০ শতাংশ। কিছু দিন পূর্বেও ইহা ছিল ৩০ শতাংশ। তবে ইহা ৫ শতাংশের নিচে নামা না পর্যন্ত বা পুরাপুরি নির্মূল না হওয়া অবধি করোনাবিরোধী যুদ্ধে আমাদের ক্ষান্ত দেওয়া যাইবে না।

বিষয়টির অবতারণা করা হইল এই কারণে যে, করোনার সংক্রমণ কমিতে থাকায় বিভিন্ন হাসপাতালে করোনার সাধারণ শয্যাগুলি খালি হইয়া যাইতেছে। ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট আসিবার পূর্বেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হইয়াছিল। আমরা প্রায় নিশ্চিত ছিলাম, করোনা বিদায় নিতে চলিয়াছে। কিন্তু হঠাত্ নূতন ধরনের করোনা আসিয়া সকল কিছু তছনছ করিয়া দেওয়ার উপক্রম হইল। সীমান্ত এলাকাগুলিতে জোনভিত্তিক লকডাউন ঘোষণাসহ বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইল। এই জন্য কিছু সাধারণ শয্যা খালি হইলেও সতর্কতা স্বরূপ এই শয্যাগুলি করোনা রোগীদের জন্য আরো কিছু দিন বা কয়েক মাস বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। বর্তমানে আইসিইউর চাহিদা অনেক। পুরাতন রোগীরা দ্রুত সুস্থ হইতেছেন না বলিয়া আইসিইউ বেড শিগিগরই খালি হইতেছে না। ফলে আইসিইউ সেবার প্রতি এখন অধিক মনোযোগ রাখা দরকার। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, একসময় আমেরিকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাইয়াছিল। ইহার পর তাহা ধীরে ধীরে কমিয়া আসে। এখন আবার খবর পাওয়া যাইতেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের হাসপাতালগুলোতে বিশেষ করিয়া রেকর্ড-সংখ্যক শিশু ভর্তি হইয়াছে। ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট সেই দেশটিতেও ছড়াইয়া পড়িয়াছে মারাত্মকভাবে। সুতরাং আমাদের শিশুদের নিয়াও সতর্ক থাকিতে হইবে। সম্প্রতি বাংলাদেশেও মারাত্মক ল্যামডা ভ্যারিয়েন্টের রোগী দেখা গিয়াছে।

বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, ন্যাচারাল ইনফেকশনের স্বাভাবিক গতি, লকডাউন ও টিকা প্রদান কার্যক্রম গতিশীল হওয়ার কারণেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ হ্রাস পাইতেছে। লকডাউন আরো কিছু দিন অব্যাহত রাখিতে পারিলে ভালো হইত। কিন্তু আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে অধিক দিন লকডাউন, শাটডাউন বা কারফিউ জারি রাখা সম্ভব নহে। কেননা জীবনের সঙ্গে ‘জীবিকা’ বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের এত অর্থ নাই যে, সরকার জনগণকে কয়েক মাস ধরিয়া ঘরে রাখিয়া খাবারসহ তাহাদের দৈনন্দিন চাহিদা সরাসরি মিটাইতে পারিবে। তবে ইনফেকশন চ্যানেল বন্ধ করিবার সবচাইতে কার্যকর উপায় হইল মুখে মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, জনসমাগম এড়াইয়া চলা, করোনা রোগীর দ্রুত টেস্ট করা ও পরিবারে কার্যকরভাবে আইসোলেশনে রাখা ইত্যাদি। এইখানে জনসচেতনতাই মুখ্য বিষয়। বিশেষজ্ঞরা ইহাও বলিতেছেন, নূতন আর কোনো ভ্যারিয়েন্টের আক্রমণ না হইলে এবং একই সঙ্গে টিকা দেওয়ার হার বাড়িতে থাকিলে কিছু দিন উপসর্গহীন ও মৃদু উপসর্গযুক্ত করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়িতে পারে। এই ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক করিবার প্রয়োজন রহিয়াছে। তাহাদের জন্য অনলাইন ও হটলাইনের মাধ্যমে চিকিত্সা পরামর্শসেবার পরিধি বাড়ানো যাইতে পারে।

যেই সকল অঞ্চলে করোনা সংক্রমণের হার অধিক এবং অধিক সংখ্যক করোনা রোগী হাসপাতালে ভর্তি রহিয়াছেন, সেইখানে আমাদের সেবা কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে। আমাদের মূল কথা, করোনা ভাইরাস দিন দিন দুর্বল হইতেছে, কিন্তু আমাদের দুর্বল বা ক্লান্ত হইলে চলিবে না।