ভূমিকম্প মানবসভ্যতার অন্যতম ভয়ানক এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যে মাটির ওপর মানুষের পুরো সভ্যতা দণ্ডায়মান, সেই জমিন যখন ওলটপালট হয়ে যায়, এর থেকে ভয়ের আর কিছু থাকতে পারে না। আজকাল হরহামেশা কিছু প্রশ্ন আমাদের মনে জাগছে, যেমন—মাঝেমধ্যেই আমাদের দেশের জমিন, বিশেষ করে সিলেট, চট্টগ্রাম ও ঢাকাবাসী প্রায়শই স্বল্পস্থায়ী ভূমিকম্প টের পাচ্ছে কেন? ভূমিকম্পের কার্যকারণ কী? ভূমিকম্প কীভাবে প্রতিরোধ করা যায় বা আদৌ যায় কি না? ভূমিকম্পের পূর্বাভাস কি দেওয়া সম্ভব? ইত্যাদি। বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকেও ভূমিকম্পের মারাত্মক সব ধ্বংসের খবরাখবর আমরা পাচ্ছি। এই দুদিন আগেও হাইতিতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে কয়েক শ লোক নিহত হলো। বারবার সে দেশে ভূমিকম্প হয়ে দেশটি ধ্বংসের মুখে চলে গেছে। এদিকে গত ২৯ ও ৩০ মে ২০২১ সিলেট শহর ও আশপাশের এলাকায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘনঘন কয়েকটি ভূকম্পন অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে ঐ ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪.১। পরবর্তী সময়ে ৭ জুন সিলেট শহরে মৃদু মাত্রার ভূমিকম্প হয়। তখন সিলেট শহরের মানুষ ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় ছুটে এসেছিল। সিলেট শহরের দুটি ছয়তলা ভবন হেলে পড়ে এবং সিলেট অঞ্চলসহ সমগ্র দেশে মানুষের মনে শঙ্কার সৃষ্টি হয়। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি বিরাজ করে। এছাড়া গত ৭ জুলাই সিলেট, ঢাকা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে পুনরায় মাঝারি মাত্রার আরো দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। গত ০৮/০৮/২০২১ তারিখে চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয় এবং গত ১০/০৮/২০২১ তারিখে মিয়ানমারে ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি অনুযায়ী, ভূমিকম্প হয় প্লেট টেকটোনিকের (Plate Tectonic) সংঘর্ষের ফলে। পাশাপাশি দুটি মহাদেশীয় প্লেটের সীমান্ত অঞ্চলে যে প্রবল পীড়নের (Stress/Oppression) সৃষ্টি হয়, সেই পীড়ন যখন বড়সড় চ্যুতির (Fault) সৃষ্টি করে এবং তার অন্তর্নিহিত শক্তি বের করে দেয়, তখন ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
প্রাকৃতিক কারণসমূহ :ভূপৃষ্ঠে বা ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি গভীরতায় বড় মাত্রার বিস্ফোরণ ঘটলে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের উত্পত্তি হতে পারে। তাছাড়া আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ও অগ্ন্যুত্পাতের সময় সাধারণত ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।
প্রায় এক ডজন ছোট-বড় অংশ নিয়ে ভূত্বক গঠিত। এই অংশগুলোকে প্লেট টেকটনিক (Plate Tectonic) বলে। এই প্লেটগুলো নিচের অশক্ত ম্যান্টলের ওপর ভাসতে থাকে এবং প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে ঘষা খেতে থাকে। কখনো একটি প্লেট অপরটির ওপরে উঠে যায় কিংবা নিচে চলে যায়, যাকে অধোগামী অঞ্চল (Subduction Zone) বলে। কোথাও আবার একে অপর থেকে দূরে সরে যায়, যাকে অপসারী অঞ্চল (Spreading Zone) বলে।
মানবসৃষ্ট কারণসমূহ :মানবসৃষ্ট অনেক কারণে কোনো কোনো স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত হতে পারে। যেমন জলাধার নির্মাণ, পারমাণবিক পরীক্ষা, খনিজ উত্তোলন ইত্যাদি। কোনো স্থানে অতিরিক্ত খনিজ (গ্যাস, তেল ইত্যাদি) উত্তোলনের কারণে শিলার স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে ধ্বংসের সৃষ্টি হয়ে ভূমিকম্প দেখা দিতে পারে। ১৯৮৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় খনিজ উত্তোলনের কারণে নিউক্যাসল ভূমিকম্প এর উত্কৃষ্ট উদাহরণ। প্রাকৃতিকভাবেই কার্বন চক্রের প্রভাবে ভূমিকম্প হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এর ব্যত্যয় হয় না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যবেক্ষণাগারে ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের মে মাসের মধ্যে ৪ মাত্রার ওপরে মোট ৮৬টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। এই ছোটখাটো কম্পনগুলো ভারী ভূমিকম্পের সম্ভাবনা নির্দেশ করে। বাংলাদেশ মূলত ভারত ও মিয়ানমারের ভূ-অভ্যন্তরের দুটি ভূ-চ্যুতির (Fault Lines) প্রভাবে আন্দোলিত হয়। উল্লেখ্য, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ মূলত ভারতীয়, ইউরেশীয় ও মিয়ানমারের টেকটোনিক প্লেটের মধ্যে অবস্থান করছে। ভারতীয় ও ইউরেশীয় প্লেট দুটি দীর্ঘদিন যাবত্ হিমালয়ের পাদদেশে আটকা পড়ে আছে। অপেক্ষা করছে বড় ধরনের নড়াচড়ার বা বড় ধরনের ভূকম্পনের। বাংলাদেশে আটি ভূতাত্ত্বিক চ্যুতি এলাকা (Fault Zone) সচল অবস্থায় রয়েছে। বৃহত্তর সিলেটের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অবস্থিত হালুয়াঘাট চ্যুতির ডাউকী চ্যুতি অংশ ও শাহজীবাজার চ্যুতি (আংশিক ডাউকি চ্যুতি) উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের নিচে জমে ওঠা টেকটোনিক প্লেটের চাপ বিগত ৪০০ বছর ধরে জমে আছে। এই চাপ যখন মুক্ত হবে, তখন সৃষ্ট ভূমিকম্পের মাত্রা দাঁড়াবে প্রায় ৮.২ রিখটার। এমনকি তা ৯ রিখটারেও পৌঁছাতে পারে। এরকম ঘটনা ঘটলে প্রায় কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভূমিকম্পের তীব্রতার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে।
১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ পরিচালিত Risk Assessment Tools for Diagnosis of Urban areas against Seismic Disaster (Radios) জরিপে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্বের ২০টি শহরের মধ্যে ঢাকাও একটি। ২০১০ সালে জাপানের Tokyo Institute of Technology (TIT)-এর সহায়তায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, ঢাকা ও সিলেটের সম্প্রসারিত অংশে জলাশয় ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে এবং হচ্ছে অনেক আবাসিক এলাকা। ভূমিকম্পের সময় নরম মাটি ও ভরাট করা এলাকার মাটি ভূমিকম্পের কম্পন তরঙ্গকে বাড়িয়ে দেয়। ফলে ভূমিকম্পের তীব্রতা বাড়ে।
ভূতাত্ত্বিকদের অভিমত, বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরে F1, F2, F3 ও F4 নামে চারটি ভূকম্পন উত্স রয়েছে। এগুলোর প্রতিটিই ৭-৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প তৈরি করতে পারে এবং যেকোনো সময় ভূমিকম্প তৈরি করে সুনামি ঘটতে পারে, যা ভূমিকম্প ঘটার মাত্র ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টার মধ্যে সুনামি বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়তে পারে। উল্লেখ্য, ১৭৬২ সালে সুমাত্রা সমুদ্রতলের একটি ভূমিকম্প থেকে সৃষ্ট সুনামি বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়েছিল এবং তত্সময়ে সৃষ্ট ফাটলটি এখনো সত্রিয় রয়েছে।
সাধারণত বড় মাত্রার ভূমিকম্পগুলোর পুনরাবৃত্তির সময়কাল বেশ বড় হয়। বাংলাদেশ তথা বেঙ্গল বেসিনের ক্ষেত্রে রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির সময়কাল প্রায় ৩৫০ বছর। এ কারণে বড় মাত্রার ভূমিকম্পগুলোর পুনরাবৃত্তির সময়কাল, পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্যতার গণিত ব্যবহার করে বের করতে গেলে সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন, যা খুবই অপ্রতুল। বেঙ্গল বেসিনে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির সময়কাল ঠিকঠাকভাবে হিসাব করতে গেলে কমপক্ষে ১ হাজার বছরের তথ্য জানা দরকার। সাধারণ হিসাব অনুযায়ী বেঙ্গল বেসিনে প্রতি ৩৫০ বছর বা কাছাকাছি সময় পর পর একটা করে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প সংঘটিত হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ১৮৮৫ ও ১৮৯৭ সালে দুটো ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ১৮৯৭ সালে গ্রেট ইন্ডিয়ায় ৮.১ মাত্রার শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটে। এ সময় অবিভক্ত আসামের কামরূপ, সোরালপাড়া, দবং, নওগাঁ এবং মেঘালয়ের শিলং ও বাংলাদেশের সিলেট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাকে বলতে গেলে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে প্রতি ১০০ বছর পর পর সাধারণত ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি গুজরাটের আহমেদাবাদ, ভুজসহ এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রলয়কারী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. সোমিত্র মুখার্জি আইআরএম-১সি স্যাটেলাইট থেকে দূরসংবেদী তথ্য বিশ্লেষণ করে গুজরাটের কোংকন কেরল ও উত্তরাঞ্চলে এক প্রলয়কারী ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি জানান, গুজরাটের ভূমিকম্পের মূলেই হচ্ছে ঐ রাজ্যে ১৯৯৯ সালে ঘটে যাওয়া ব্যাপক খরা। তবে এ সবই হচ্ছে অনুমাননির্ভর।
চীন ও তুরস্কের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বড় মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ক্লাস্টার হিসেবে সংঘটিত হয়। তবে আমরা জানি, ভূমিকম্প উত্পত্তির পেছনে শিলাস্তরের বিচ্যুতি (displacement) দায়ী। তাই অ্যাকটিভ ফল্টে (সান অ্যান্ড্রিয়াস ফল্ট) বিচ্যুতির পরিমাণ হিসাব করে ভূমিকম্প সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা ও সম্ভাব্য মাত্রা নিরূপণ করা যায়। তবে সে ক্ষেত্রে বিচ্যুতির পরিমাণ সঠিকভাবে বের করতে রেডিও কার্বন ডেটিং জানা দরকার, যা নির্ণয় করা সময়সাপেক্ষ ও জটিল।
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত কার্যক্রম :ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ইতিমধ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভূমকম্পসহ সব দুর্যোগের সময় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের করণীয় নির্ধারণ করে ‘দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি, ২০১৯ (Standing Orders on Disaster, 2019)’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এর অধীন দুর্যোগকালীন কার কী করণীয় তা নিরূপণ করা হয়েছে। উক্ত নীতিমালার অধীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল (NDMC) গঠন করা হয়েছে। উক্ত স্থায়ী আদেশাবলির অধীন মাঠ পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড পর্যন্ত অংশীজনের করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সে মোতাবেক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। অধিকন্তু, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বয়ে জরুরি প্রতিক্রিয়া সংস্থাগুলোর জন্য জাতীয় কন্টিনজেন্সি প্ল্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। তাছাড়া, বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুমোদন লাভ করেছে। ইতিমধ্যে ভূমিকম্প-পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার (Search and Rescue) সরঞ্জাম ক্রয়পূর্বক সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বেঙ্গল বেসিন বা বাংলাদেশের টেকটোনিক অবস্থানের কারণে এখানে নিয়মিত বিরতিতে মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প হবেই। ঢাকাসহ সারা দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার তত্পরতার অপ্রতুলতা ইত্যাদি কারণে ভূমিকম্প ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে। যেহেতু ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়ার কোনো প্রযুক্তি এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি, তাই সচেতনতাই আমাদের একমাত্র সমাধান। ভূমিকম্প ও তত্সংশ্লিষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ তার সক্ষমতা প্রমাণ করবে, সেটাই প্রত্যাশা। যদিও এক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা অদ্যাবধি সীমিত।
n লেখক :পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়, সিলেট
