এ যেন বঙ্গচেতনার এক পবিত্র তীর্থভূমি। এখানে পা রাখলেই মনে হয়, ইতিহাস কথা বলছে। চলছে সময়ের সীমাহীন ধারাভাষ্য। দেওয়ালে টাঙানো প্রতিটি ছবিতেই যেন প্রাণের স্পন্দন, মুক্তির স্বাদ। হ্যাঁ, কলকাতা মহানগরীর মধ্যভাগে ৮ নম্বর স্মিথ লেন আজও ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। এ ঠিকানায় গভর্নমেন্ট বেকার হোস্টেলেই অতিবাহিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছাত্রজীবনের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বছর। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৬ সময় বোধহয় থমকে দাঁড়িয়েছে এখানে। আজকের মৌলানা আজাদ কলেজের নাম ছিল তখন ইসলামিয়া কলেজ। এখানেই পড়তেন শেখ মুজিবুর রহমান। আইএ থেকে বিএ পর্যন্ত। ১৯৪৬ সালে সাধারণ সম্পাদকও হয়েছিলেন কলেজের ছাত্র সংসদের। থাকতেন অদূরেই বেকার হোস্টেলে। তিনতলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের ২৪ নম্বর সেই ঘর আজও সাজানো পরিপাটি করে। তাঁর ব্যবহূত শয্যা, চেয়ার-টেবিল দেখলে কে বলবে, মাঝে অতিক্রান্ত হয়ে গেছে অনেকগুলো বছর? মনে হতে পারে, এই তো মাত্র কিছুদিন আগেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন এই ঘরেই। সেই স্মৃতি আজও বুকে আঁকড়ে আছে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতিকক্ষ’।
দিন কয়েক আগেই এক মেঘলা নিঝুম দুপুরে পৌঁছে গিয়েছিলাম স্মিথ লেনের সেই মুজিবতীর্থে। অবশ্যই মৌলানা আজাদ কলেজের অধ্যক্ষ শুভাশিস দত্তের বিশেষ অনুমতি নিয়ে। কারণ, এখানে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ঐতিহাসিক হস্টেল প্রাঙ্গণে এখনো সবুজের সমারোহ, বাগানে আমগাছ। মহানগরী কলকাতার সেই চিরপরিচিত কোলাহল, ব্যস্ততা অনুপস্থিত এখানে। ব্রিটিশ আমলের হোস্টেলে এখনো কাঠের সিঁড়ি আর লোহার সিঁড়ির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সেই সিঁড়ি ভেঙে তিনতলায় উঠে পৌঁছে গেলাম উত্তর-পূর্বে প্রশস্ত বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে। তার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক করিডরের প্রবেশদ্বারের ইন্টেরিয়র ডেকরেশনেই ফুটে উঠেছে বঙ্গচেতনার প্রতীকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ। বাম দিকের দেওয়ালে প্রশস্ত ফলকে শোভা পাচ্ছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—জীবন ও কারাজীবন’। পাশেই আবক্ষ প্রতিকৃতি।
ভেতরে প্রতি ইঞ্চিতে যত্নের ছোঁয়া। প্রথমেই চোখে পড়বে তার আবক্ষ প্রস্তরমূর্তি। ২০১১ সালে এখানেই বাংলাদেশের জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সেই সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মণি। ২০১৯-এ এসেছিলেন সাংসদ জনাব মহম্মদ তাজুল ইসলাম। করিডরের দেওয়ালে শোভিত হচ্ছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের পরে ১৯৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের ঐতিহাসিক জনসমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের মুহূর্তও ফ্রেমবন্দি। ইন্দিরা গান্ধীর পাশে বঙ্গবন্ধু। মুক্তিযুদ্ধে জয়ের পরে সেদিন ব্রিগেডে এসেছিল লাখ লাখ মানুষ। অনেকেরই দাবি, ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের ভাষণ শুনতে, তাদের দেখতে সেদিন সর্বকালের রেকর্ড জনসমাবেশ হয়েছিল ব্রিগেডে। আছে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আরো কিছু বিরল ছবি। বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক ছবিতেও দৃষ্টি আটকে যাচ্ছে বারবার। হাতছানি দিচ্ছে ঢাকায় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর এক অন্তরঙ্গ মুহূর্ত।
এবারে প্রবেশের পালা বঙ্গবন্ধু স্মৃতিকক্ষে। ছোট্ট ঘরের দেওয়ালে বিশাল তৈলচিত্রে যৌবনের বঙ্গবন্ধু। শিল্পীর তুলিতে ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা ছাত্রজীবনের শেখ মুজিবুর রহমানকে। সামনে সযত্নে রাখা তার ব্যবহূত চেয়ার-টেবিল। কলেজজীবনে পড়াশোনা করতেন এখানে বসেই। সাদা টেবিলক্লথের ওপরে সাজানো বঙ্গবন্ধুর লেখা বই, ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। ডান দিকে সাদা চাদরে ঢাকা শয্যা, সিঙ্গল বেড। এখানেই দিনের শেষে ক্লান্তিমুক্তি। স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য জুড়ে দেওয়া হয়েছে পাশের ২৩ নম্বর ছোট্ট কামরাটিকেও। এই ঘরে সুসজ্জিত ক্যাবিনেটে থরে থরে সাজানো মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন লেখকের কিছু উল্লেখযোগ্য বই। দেওয়ালে হাসিমুখে বঙ্গবন্ধুর হাত নাড়ার বিরল মুহূর্ত। বাম দিকের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা আছে পুরোনো ডিজাইনের একটি ছোট আলমারি। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর বিশেষ উদ্যোগে ১৯৯৮ সালে নতুন রূপে সেজে ওঠে এই স্মৃতিকক্ষ। ২৩ ও ২৪ নম্বর ঘর মিলিয়ে তৈরি হয় বঙ্গবন্ধু মিউজিয়াম। ৩১ জুলাই এর উদ্বোধন করেন রাজ্যের সেই সময়ের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী সত্যসাধন চক্রবর্তী।
মৌলানা আজাদ কলেজের অধ্যক্ষ শুভাশিস দত্ত শুরু থেকেই বেকার হস্টেলে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি রক্ষার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন বেশ আন্তরিকভাবেই। স্মৃতিকক্ষকে করে তুলেছেন আরো আকর্ষণীয়। আবক্ষমূর্তি নতুন রূপ পেয়েছে তারই বিশেষ আগ্রহে। তার কথায়, ‘বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি তার জীবন বাজি রেখেছিলেন শুধু একটি জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবেন বলে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার আহ্বানকে কণ্ঠলগ্ন করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ শপথ নিয়েছিল এক নতুন সূর্যোদয়ের। বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবনের এক গৌরবজনক অধ্যায় কেটেছিল কলকাতায়। ইসলামিয়া কলেজে, যা এখন মৌলানা আজাদ কলেজ। ১৯৪৪-এ আইএ, ১৯৪৭-এ বিএ। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি সত্তার লড়াকু নেতা।’
অধ্যক্ষ জানালেন, প্রতি বছরই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর প্রয়াণ দিবসে তার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতে স্মৃতিকক্ষে আসেন বাংলাদেশ উপদূতাবাসের আধিকারিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। এবারও তার প্রস্তুতি চলছে।
সুনীল দাস বাল্মিকী তার সহকর্মীদের নিয়ে প্রতিদিন ঝকঝকে রাখেন করিডর ও স্মৃতিকক্ষ। শোক দিবসের আগে যত্ন চলছে আরো নিখুঁতভাবে।
বাংলাদেশের মানুষের কাছে শোকের মাস এই আগস্ট। বাংলাদেশের জাতীয় শোক দিবস ১৫ই আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনেই মানবতার শত্রু প্রতিক্রিয়াশীল ঘাতক চক্রের হাতে সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
কিন্তু বিশ্ববাসীর মন থেকে কোনো দিনই মুছে ফেলা যাবে না বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক বঙ্গবন্ধুকে। যিনি ছিলেন অকৃত্রিম ভারতবন্ধুও। দুই বাংলার আত্মিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের দিশারি। সমগ্র বাঙালি জাতিকে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করে তুলেছিলেন যে মহামানব, তার প্রতি হূদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
n লেখক :ভারতীয় সাংবাদিক
