আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা গবেষণাবান্ধব নয়। দেশের উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরীক্ষা পাশের উপযোগী মুখস্থ বিদ্যার ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া স্কুল-কলেজ পর্যায়ে গণিত ও বিজ্ঞানের মতো প্রায়োগিক বিষয়গুলোও অন্তস্থ না করিয়ে করানো হয় মুখস্থ, যা শিক্ষার্থীদের মস্তিষ্কের চিন্তনদক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও উর্বরতা শক্তির বিকাশে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষে ব্যক্তিজীবনে এসবের ব্যবহার জানে না। জানে না এসবের প্রায়োগিক ক্ষেত্র সম্পর্কে। যার পেছনে দায়ী বিষয়সংশ্লিষ্ট যথোপযুক্ত গবেষণা জ্ঞানের অভাব।
গবেষণার ক্ষেত্রে বয়স ও দারিদ্র্য কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। আমাদের এ উপমহাদেশীয় গণিতবিদ শ্রীনিবাস রামানুজন হতদরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও গবেষণাকাজের মাধ্যমে গণিতের বিভিন্ন শাখায় দেখিয়েছেন অসামান্য পাণ্ডিত্য। মাত্র ১০ বছর বয়সি রামানুজনকে এস এল লোনি লিখিত ‘ত্রিকোণমিতি’ বইটি দেওয়া হলে তখন থেকেই শুরু হয় গণিতে সহজাত বুদ্ধিমত্তা ও বিশেষ প্রতিভা প্রদর্শন। গভীর উপলব্ধি জ্ঞান ও বুদ্ধিদীপ্ত গবেষণার মাধ্যমে মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি বইয়ের বিষয়গুলোতে অর্জন করেন অসাধারণ দক্ষতা। এমনকি তিনি নিজে কিছু উপপাদ্যও আবিষ্কার করেন এবং পৃথকভাবে বিজ্ঞানী অয়েলারের এককত্ব পুনরাবিষ্কার করেন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে রামানুজন বার্নোলির সংখ্যা ও অয়েলার-মাসেরনি ধ্রুবকের ওপর সম্পন্ন করেন নিজের গবেষণাকাজ। রাতের পর রাত গবেষণাকর্মে নিমগ্ন থাকার ফলাফল হিসেবে তিনি গণিতের বিভিন্ন শাখার সঙ্গে পরিচিত হন ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষ করে সংখ্যাতত্ত্ব, গাণিতিক বিশ্লেষণ, অসীম ধারা ও আবৃত্ত ভগ্নাংশ শাখায় রয়েছে তার অনবদ্য ভূমিকা। তার রেখে যাওয়া নোটবুক থেকে পরবর্তী সময়ে আরো অনেক নতুন সমস্যার সমাধান পাওয়া গেছে, যা বর্তমান মহাকাশ গবেষকদের মহাকাশ-সম্পর্কিত বিভিন্ন জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধানে সূচনা করেছে নতুন দিগন্তের।
মহাকাশ জয়ের তীব্র ইচ্ছা মহাকাশ গবেষকদের জন্য ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও এ বিষয়ে গবেষকগণের নিরলস গবেষণা এখন অনেকটাই সফল ও সার্থক। ১৯৫১ সালে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ গবেষকগণ চাঁদের মাটিতে পদার্পণের সম্ভাব্যতা বুঝতে পেরেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় নিরলস সাধনা ও কর্মপ্রচেষ্টার ফলে ১৯৫৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরের লুনা-২ মিশনটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণকারী মনুষ্যনির্মিত প্রথম বাহন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই অ্যাপোলো-১১ মিশনের মাধ্যমে চাঁঁঁদের মাটিতে মানুষের প্রথম সফল অবতরণ করায়। সম্প্রতি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের পর তৃতীয় দেশ হিসেবে তৃতীয় বারের মতো চীনের মহাকাশযান চাঁদের মাটিতে অবতরণ করেছে। এটি ছিল চাঁদের মাটিতে মনুষ্যবিহীন ও স্বয়ংক্রিয় অ্যালগোরিদম-ভিত্তিক পদ্ধতিতে দুটি মহাকাশযানের সংযুক্তির প্রথম সফল ও ঐতিহাসিক ঘটনা, যা মহাকাশ গবেষণার মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
চন্দ্রজয়ের পর মহাকাশ গবেষকগণ এবার হাত বাড়িয়েছেন সুদূর মঙ্গল গ্রহের পানে। পাথফাইন্ডার, স্পিরিট, অপরচুনিটি এবং কিউরিওসিটি রোভারের পর এবার ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পার্সিভিয়ারেন্স নামে অত্যাধুনিক একটি রোভার পাঠাতে সক্ষম হয়েছে নাসা, যা মঙ্গল গ্রহের ‘ইয়েজেরো অভিঘাত খাতে’ অনুসন্ধান পরিচালনা করবে। আগের রোভারের সমস্যাগুলো সমাধানপূর্বক বর্তমান রোভারটির মডেল তৈরি করেন সার্দান ক্যালিফোর্নিয়ার জেট প্রপালসন ল্যাবেরেটরিতে কর্মরত গবেষকগণ। সম্প্রতি মার্স সোসাইটি অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত আইপিএএস চ্যালেঞ্জে অংশ নেয় বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দল। এ বছরের আয়োজনের বিষয় ছিল ‘প্রোপেলিং এক্সপ্লোরেশন’। সারা বিশ্ব থেকে অংশ নেওয়া ২৬টি দলের ভেতর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম ইন্টারপ্ল্যানেটারের ড্রোন ‘নির্ভীক’ ৮ম স্থান লাভ করে, যা দেশের জন্য গৌরবের! ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ নাসার নভোচারীরা মঙ্গলের পথে পা বাড়াবে। আর এর মাধ্যমে সুপ্রশস্ত হবে মানব ইতিহাসের আরো একটি সমৃদ্ধ গবেষণার পথ।
সৃষ্টিলগ্ন থেকে গবেষণালব্ধ সৃজনশীল জ্ঞান এভাবেই প্রকৃতির হাজারো সমস্যা ও রহস্যকে সমাধানপূর্বক মানুষের অজানাকে জানার, অদেখাকে দেখার স্বপ্ন পূরণের পাথেয়। তবে, আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষিত মানবসত্তা এখন পর্যন্ত গবেষণাকে হূদয়ঙ্গম করতে পারেনি, যার অন্যতম কারণ শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণার মতো সহনশীল ও সময়সাপেক্ষ কাজে আত্মনিয়োগের অনীহা। শুধু মুখস্থবিদ্যার ওপর ভর করে দেশকে প্রযুক্তির উচ্চশিখরে পৌঁছে দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। তার জন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী গবেষণায় নিরলসভাবে অবিচল থাকা। দেশের সার্বিক প্রযুক্তিগত উন্নয়নে গবেষণাবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
