মার্কেট সেগমেন্টেশনের গুরুত্ব

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২১, ২১:২৮

মার্কেট সেগমেন্টেশন মার্কেটিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মার্কেট সেগমেন্টেশন হলো সম্ভাব্য গ্রাহকদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে গ্রুপ বা সেগমেন্টে বিভক্ত করার প্রক্রিয়া। মূলত একই ধরনের বৈশিষ্ট্য যেমন জনসংখ্যাতাত্ত্বিক, আগ্রহ, চাহিদা বা অবস্থান ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে মার্কেট সেগমেন্টেশন করা হয়। মার্কেট সেগমেন্টেশনের ফলে কোম্পানি খুব সহজেই ক্রেতার কাছাকাছি যেতে পারে যেটি ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জন সহজ করে তোলে। পৃথিবীতে প্রায় ৭৫০ কোটি মানুষ আছে। তার মানে এই না, ৭৫০ কোটি মানুষ আপনার কাস্টমার বা সবার পছন্দ এক। মানুষের বয়স, পছন্দ, ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে চাহিদাও ভিন্ন হয়, তাই সবাইকে একই পন্থায় সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। যেমন, আপনি সারা বছর ধরে বাংলাদেশে শীতবস্ত্র উত্পাদন করে মার্কেটে সাপ্লাই দিয়ে থাকেন। শীতকালে আপনার কাপড়ের যথেষ্ট চাহিদা থাকলেও গরমের সময় তা শূন্যে নেমে আসবে। তবে এটি যদি সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, ফিনল্যান্ডের মতো শীতপ্রধান দেশ হয়, তবে সারা বছর শীতবস্ত্রের চাহিদা থাকাটা স্বাভাবিক। তাই ভোক্তার চাহিদা ও বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বাজারকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করতে হবে। যেমন গ্রীষ্মপ্রধান দেশের জন্য পাতলা কাপড়ের, শীতপ্রধান দেশের জন্য তুলনামূলক মোটা কাপড়ের পোশাক তৈরি করতে হবে। সাধারণত ভৌগোলিক, ডেমোগ্রাফিক, মনস্তাত্ত্বিক, আচরণমূলক—এই চারটির ওপর ভিত্তি করে মার্কেট সেগমেন্টেশন করা হয়। জিওগ্রাফিক সেগমেন্টেশন বা ভৌগোলিক বিভক্তীকরণে ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে বাজারকে ভাগ করা হয়। যেমন কোনো আইসক্রিম বা কোল্ডড্রিংকস কোম্পানি সব সময় গ্রীষ্মপ্রধান দেশের ভোক্তাদের টার্গেট করবে। চট্টগ্রামে মেজবান একটি ঐতিহ্যগত আঞ্চলিক উত্সব, তাই চট্টগ্রামে প্রায় রেস্টুরেন্টের ম্যানুতে মেজবানি আইটেম রাখা হয়। ডেমোগ্রাফিক সেগমেন্টেশনে বয়স, লিঙ্গ, আয় ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বাজারকে বিভক্ত করা হয়। ধরা যাক আপনি একটি গার্মেন্টসের মালিক। বাংলাদেশ ছাড়াও আমেরিকা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে কাপড় রপ্তানি করেন। এখন কাপড় উত্পাদনের আগে আপনাকে ভাবতে হবে কোন দেশের জন্য কোন কোয়ালিটির কাপড় তৈরি করছেন। আপনি যদি মার্কেট সেগমেন্টেশন ছাড়া সব দেশের জন্য একই কোয়ালিটির কাপড় তৈরি করেন, তাহলে মার্কেটে সুবিধা করাটা আপনার পক্ষে সম্ভব না। কারণ সব দেশের মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা এক না। যদি আপনি একটি টি-শার্ট ৫০ ডলার মূল্যে বিক্রির জন্য তৈরি করেন, তাহলে আমেরিকা, কানাডায় ভালো করলেও বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। ফলে বিক্রি কমে ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।

পছন্দের ক্ষেত্রে বয়সও একটা ফ্যাক্টর। আপনার বাবার পছন্দ আর আপনার পছন্দ বয়সের ভিন্নতার কারণে এক হবে না। তাই এপেক্স, বাটার মতো জুতা কোম্পানিগুলো বয়সের কথা বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন ডিজাইনের জুতা তৈরি করে। যদি আমরা ইউনিলিভারের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব তারা হরলিক্সের মতো হেলথ ড্রিংকস তৈরিতে বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী প্রোডাক্টে ভিন্নতা রেখেছে। যেমন বাচ্চাদের জন্য জুনিয়র হরলিক্স, নারীদের জন্য ওমেনস হরলিক্স, প্রেগন্যান্ট নারীদের জন্য মাদারস হরলিক্স ইত্যাদি।

সাইকোগ্রাফিক সেগমেন্টেশন বা মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তীকরণে ভোক্তার জীবনযাত্রার মান, সামাজিক অবস্থান, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বাজারকে বিভক্ত করা হয়। যেমন আরব ধনীদের স্বর্ণের প্রতি তীব্র আসক্তি রয়েছে। তাই কোম্পানিগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড গোল্ডের তৈরি ফোন, গাড়ি ইত্যাদি তৈরি করে দেয়। গাড়ির প্রতি তাদের বিশেষ আকর্ষণ থাকায় ফেরারি, বিএমডব্লিউর মতো কোম্পানিগুলো সেখানে ভালো অবস্থান করে নিয়েছে। যখন ক্রেতার পণ্য সম্পর্কিত জ্ঞান, মনোভাব ও পণ্যের ব্যবহারের ভিত্তিতে বাজার বিভক্তীকরণ করা হয়, তাকে বিহেভিয়ারেল সেগমেন্টেশন বা আচরণমূলক বিভক্তীকরণ বলে। যেমন ঈদ, নববর্ষে পাঞ্জাবির বিক্রি বৃদ্ধি পায়, ভালোবাসা দিবসে ফুল ও শুভেচ্ছা কার্ড বিক্রি বৃদ্ধি পায়। আবার ভোক্তারা কেমন উপকারিতা লাভের আশায় পণ্যটি ব্যবহার করছে, তা-ও একটা বিষয়। যেমন সানসিল্ক খুশকির জন্য এন্টি ডেনড্রফ, চুল পড়া রোধে এন্টি হেয়ার ফল শ্যাম্পু বাজারে এনেছে। আবার পেপসোডেন্ট দাঁতের মাড়ির যত্নে পেপসোডেন্ট গাম কেয়ার, শিরশির অনুভূতির জন্য পেপসোডেন্ট সেনসিটিভ এক্সপার্ট বাজারে ছেড়েছে।

বৈশ্বায়নের এই যুগে ব্যবসা আজ কোনো অঞ্চল বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। স্থান, কাল, পাত্রভেদে চাহিদায় আছে ভিন্নতা। তাই মার্কেট সেগমেন্টেশন ছাড়া ব্যবসায় সুবিধা করা মোটেও সম্ভব নয়। আর মার্কেট সেগমেন্টেশনের ফলে কোম্পানি নির্দিষ্ট ভোক্তাদের ওপর ফোকাস করতে পারে, তাদের প্রয়োজন ও চাহিদা নিয়ে কাজ করতে পারে। ফলে ব্যবসায় লক্ষ্য অর্জন অনেকটা সহজ হয় এবং সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া