তালেবানের নিয়ন্ত্রণে আফগানিস্তান

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২১, ২৩:০১

২০ বছর আগে ২০০১ সালে আফগানিস্তান থেকে তালেবানকে উত্খাত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। একটি আধুনিক আর ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গড়া এবং তালেবানকে নির্মূল করাই ছিল মূল লক্ষ্য। এজন্য আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনীকে প্রশিক্ষণ আর অস্ত্র দিয়েছে। এ কাজে ১৫ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি খরচ করেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব। কিন্তু উলটো ৮৫ হাজার সদস্যের তালেবান আরো শক্তিশালী আর তিন লাখ সদস্যের বেশি আফগান বাহিনী দুর্বল হয়েছে। আফগানিস্তানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এখন সেই তালেবানই। বাসিন্দাদের মধ্যে তাদের শাসনের পুরানো স্মৃতিই ফিরে আসছে। তাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই আতংকে আফগানিস্তান ছাড়তে বিমানবন্দরে ভিড় করছেন। বিমানবন্দরে গোলাগুলিতে পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। সরকারি অফিস খালি ও রাস্তা-ঘাট জনশূন্য হয়ে পড়েছে। মার্কিন দূতাবাস থেকে সব কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আফগানিস্তানের দায়িত্বে তালেবান

গতকাল নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, সোমবার প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি দেশত্যাগ করার পর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দখলে নেয় তালেবান। তারা গতকাল নিজেদের                বিজয়ী ঘোষণা করে এবং ‘যুদ্ধ শেষ’ বলে উল্লেখ করে। গতকাল সোমবার আফগানিস্তান সরকারের দায়িত্ব নেয় তালেবান। যদিও এটা আনুষ্ঠানিক নয়। আগের মন্ত্রীরাই থাকবেন না কী তালেবান নিজস্ব মন্ত্রী নিয়োগ করে সরকার চালাবেন সেই বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, প্রেসিডেন্সিয়াল গার্ডসের শীর্ষ ব্যক্তি তালেবানকে প্রাসাদে স্বাগত জানাচ্ছেন। সিনিয়র আফগান কর্মকর্তারা তালেবানকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিভিন্ন শহরেও কর্মকর্তারা তালেবানের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিচ্ছেন। কাবুলে নিরাপত্তায় বিভিন্ন স্থানে চেকপয়েন্ট বসিয়েছে তালেবান সদস্যরা। তারা গাড়ি তল্লাশি করছে। তালেবানের মুখপাত্র সুহায়েল শাহীন বলেছেন, কয়েক দিনের মধ্যেই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে বলে তারা আশা করছেন। কাবুলের জনগণের জানমাল নিরাপদ রাখা এবং নারীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মী ও কূটনীতিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন তিনি।

শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে কাবুলে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়েছে তালেবান সদস্যরা। অনেক বাড়ির নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে তারা। তারা হুমকি দিয়েছে, কাজে না ফিরলে শাস্তি পেতে হবে। যদিও তালেবানের অন্যতম মুখপাত্র সুহায়েল শাহীন বলেছেন, আমরা প্রাইভেট সেক্টর, সরকারি কর্মকর্তা বিশেষ করে কাবুলের বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করে বলছি, আমরা কোনো প্রতিশোধে যাব না। তাদের জীবন এবং সম্পত্তি নিরাপদ।

পুরানো আতংক ঘিরে ধরছে আফগানবাসীকে

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর তালেবান দেশে শরীয়াহ আইন চালু করেছিল। সেই মোতাবেক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিশেষ করে নারীদের অধিকার চরমভাবে লংঘন করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিযোগ। ১০ বছরের বেশি মেয়েদের পড়ালেখা তথা স্কুলে যাওয়াও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। বোরকা ছাড়া নারীরা ঘর থেকে বের হতে পারতেন না। সেই পুরানো স্মৃতিই ঘিরে ধরছে আফগানবাসীকে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ন্যাটো বাহিনী সৈন্য প্রত্যাহারের পর আফগানিস্তানের অনেকেই আতংকে ভুগছেন। তাই তারা আফগানিস্তান ছাড়তে দেশ ছাড়ার একমাত্র পথ কাবুল বিমানবন্দরে ভিড় করছেন। বিমানে উঠতে হুড়োহুড়ি শুরু করেছেন। বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় আছেন মার্কিন সৈন্যরা। তুর্কি সেনারাও সেখানে মোতায়েন আছে। নিজ দেশের নাগরিকদের নিরাপদে ফিরিয়ে নিতে মার্কিন সেন্যরা বিমানবন্দরে কাটাতারের বেড়া দেয় এবং ফাঁকা গুলিও ছোঁড়ে। অনেকে বিমানের চাকার ভেতরে বসে দেশ ছাড়ছে। দু্’জনের চাকা থেকে পড়ে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ৬৫ টি দেশ এক বিবৃতিতে বাসিন্দাদের দেড় ছাড়ার সুযোগ দিতে তালেবানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এরই মধ্যে বিমানবন্দরে গোলাগুলিতে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। কেবল সাধারণ মানুষ নয়, ১০০ আফগান সৈন্যকে বহন করা একটি বিমান তাজিকিস্তানে পৌছায় গতকাল। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস তাদের কর্মীদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছে।

কাবুলের কেন্দ্রস্থলে ভুতুড়ে পরিবেশ

কাবুল তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার একদিন পর শহরের রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়েছে। শহরের অসংখ্য কার্পেট আর গহনার দোকানগুলোর পাশাপাশি ছোট ছোট ক্যাফেও বন্ধ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দোকানের মালামাল রক্ষা করার জন্য তারা এই ব্যবস্থা নিয়েছেন। অনেকের মধ্যে এই চিন্তাও রয়েছে যে, তাদের পরবর্তী গ্রাহক কোথা থেকে আসবে।

‘আমি পুরোপুরি শোকের মধ্যে আছি। শহরে তালেবানের প্রবেশ আমাকে ভীত করে তুলেছে, কিন্তু আমাদের সবাইকে ঘানির (প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি) ছেড়ে চলে যাওয়া পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বেশি খারাপ করে তুলেছে,’ রয়টার্সকে বলেছেন একজন দোকান মালিক। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সরকারি অফিসগুলো খালি পড়ে আছে। কূটনীতিক আর তাদের পরিবারের সদস্যরা চলে যাওয়ায় কাবুলের দূতাবাস এলাকা পুরোপুরি জনশূন্য।

জাতিকে প্রশান্তির প্রতিশ্রুতি তালেবানের

তালেবান ঘোষণা দিয়েছে, জনসাধারণ তাদের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড খুব তাড়াতাড়ি শুরু করতে পারবেন। একজন নেতা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, সাধারণ জীবনযাত্রা আগের তুলনায় আরও ভালোভাবে চলবে। যদিও জাতিসংঘ জানিয়েছে, তালেবান টার্গেট কিলিং শুরু করেছে। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া একটি ভিডিও ভাষণে তালেবানের উপ-প্রধান নেতা মোল্লাহ বারাদার আখুন্দ বলেছেন, এখন সময় হয়েছে আফগানিস্তানের মানুষের সেবা আর তাদের জীবনমান উন্নয়ন করার। কাবুল দখল ও বিজয় ঘোষণার একদিন পরে গতকাল নতুন এই ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। ‘জাতিকে আমরা সবচেয়ে ভাল সেবা দেবো, পুরো জাতির জন্য প্রশান্তি নিয়ে আসবো, তাদের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য যতদূর যা করা দরকার, আমরা তাই করবো।’ অন্য যোদ্ধা পরিবেষ্টিত হয়ে ভিডিও ভাষণে বলেন মোল্লাহ বারাদার আখন্দ। তিনি আরও বলেন, ‘যেভাবে আমাদের এখানে আসতে হয়েছে, তা কাঙ্খিত ছিল না। সেই সঙ্গে আজ আমরা যে অবস্থানে পৌঁছেছি, তাও কেউ ভাবেনি।’