একুশের চেতনা এখন

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ২২:৪৯

ভাষা আন্দোলন আর একুশের চেতনা এখন হয়ে গেছে ‘গাছে উঠে মই ছুড়ে ফেলে দেওয়ার মতো’। যখন প্রয়োজন হয় তখন ভাষা আন্দোলনের প্রেরণার কথা বলে আমরা মুখে ফেনা তুলে ফেলি। সে তালিকায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সুধী সমাজ সবাই রয়েছে। আমি বলবো, ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূতিকাগার। ভাষা আন্দোলনের প্রধান চারটি দিক হলো- ১. আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা ২. ছাত্রদের অংশগ্রহণ ৩. ১৪ ধারা ভাঙা ৪. পুলিশের গুলিবর্ষণ।

একুশের উত্তরাধিকার বহন করছে বইমেলা। ভাষার মাসেএকুশের চেতনার প্রতিফলন ঘটে বইমেলার মধ্য দিয়ে। বই বিক্রি মূল বিষয় নয়। এর সঙ্গে মিশে রয়েছে বেদনা ও গৌরব। ছাত্র যুবাদের প্রগতিশীল এই আন্দোলন তাদের বুকের রক্তের বিনিময়ে সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের সেই আত্মাহুতির পথ ধরে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্র প্রভাবিত হয়েছে। এটা এক অভাবনীয়, বিস্ময়কর ঘটনা। যারা কিছুদিন আগেও পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলেছে। অনেক প্রগতিশীল কবি-সাহিত্যিক জিন্নাহকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তারা সম্পূর্ণরূপে বদলে গেল। আমাদের সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে ভাষা আন্দোলন জাতীয়তাবাদী চেতনা তীব্রভাবে ছড়িয়ে দিয়েছিল।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে আমাদের শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক ইতিহাস লেখা হয়েছে। কিন্তু সেই আন্দোলন মফস্বল শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছিল। স্কুল কলেজের শিশু-কিশোররা সেই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। অসাধারণ সেই আন্দোলন রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তার করেছিল। আর এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মুসলিম লীগের শিকড় কাটা গিয়েছিল। সেই শিকড় আর গজায়নি। এই ভূখণ্ডে মুসলিম লীগ আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। যার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে। সে নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভারাডুবি হয়েছিল। সেই আন্দোলনের শক্তি পরবর্তীকালে আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা যুগিয়েছে।

ভাষা আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল, সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন চাই। সেই প্রত্যাশা কী পূরণ হয়েছে আজও? হয়নি। ইউরোপ, এশিয়ার অনেক দেশ তাদের মাতৃভাষাকে, রাষ্ট্রভাষাকে জীবিকার প্রধান মাধ্যমে পরিণত করেছে। এই ভাষা জানলে অন্য ভাষা না জেনেও তারা উচ্চশিক্ষা নিতে পারে। আমরা সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারিনি। বিদেশি ভাষার নির্ভরতা কমাতে পারিনি। সে কারণে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে বাংলা ভাষার প্রতি সেই ভালোবাসা সৃষ্টি হয়নি। যে ভালোবাসা পঞ্চাশের দশকের মানুষের মাঝে বিরাজমান ছিল তা এখন নেই। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলনে সেই অনীহা এখনো চলমান।

যে চেতনায় বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা করার দাবি সেদিন পূরণ হয়েছিল, সেই চেতনা বাঙালি আজও পুরোপুরি ধারণ করছে না। বাংলাভাষা বিস্তারে সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বায়নের প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছে। ঔপনিবেশিক মানসিকতা, সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার অভাবে উচ্চ আদালত, উচ্চশিক্ষাসহ সর্বস্তরে বাংলাভাষার প্রয়োগ হচ্ছে না। এর জন্য রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও এগিয়ে আসছে না। ফলে নতুন ও তরুণ প্রজন্ম ইংরেজি ভাষার দিকে বেশি ঝুঁকছে। যে কারণে একুশের চেতনা আজও অবহেলিত।

 লেখক: ভাষা সংগ্রামী, প্রাবন্ধিক