আফগানিস্তানে নতুন সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা করছে তালেবান। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। রাশিয়া ও তালেবান উভয় পক্ষ থেকেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের কথা জানানো হয়েছে। জাতিসংঘও আলোচনার মাধ্যমে তালেবানকে নতুন সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। এদিকে তালেবান গতকাল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে এবং সবাইকে কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কারো বাড়ির ভেতরে না যেতে সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন তালেবানের নেতা। ক্ষমতা নেওয়ার পর দু’দিন পর গতকাল মঙ্গলবার প্রথম সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের কর্মকা্ল, নারী অধিকার, মিডিয়ার স্বাধীনতা ও সরকার গঠনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেছে তালেবান।
নতুন সরকার হবে সবার অংশগ্রহণে
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তালেবানের প্রাথমিক কর্মকাণ্ডে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপিকে ল্যাভরভ জানিয়েছেন, ‘আমি এটাকে ইতিবাচক সংকেত বলে মনে করি। কারণ তালেবানের ঘোষণা এবং অন্য মতের প্রতি তাদের সম্মান দেখানোটা ভালো দিক। তারা এমন একটি সরকার গঠন করতে চায়, যেখানে কেবল তারা নন, অন্যরাও অংশ নেবেন।’ এছাড়া ল্যাভরভ কালিনিনগ্রাদে এক আলোচনায় বলেন, মস্কো কাবুলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার চায়। এজন্য তিনি আফগানিস্তানের সব রাজনৈতিক, নৃতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনাকে সমর্থন করছেন। রাশিয়া তালেবানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে। সোমবার রাশিয়া জানিয়েছে, কীভাবে দায়িত্ব পালন করে তার ওপর ভিত্তি করে তালেবানকে স্বীকৃতি দেবে মস্কো। গতকাল মঙ্গলবার আফগানিস্তানে তালেবানের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রুশ রাষ্ট্রদূত দিমিত্রি জিরনভের।
বার্তা সংস্থা এপি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সিনিয়র তালেবান নেতা আমির খান মুত্তাকি রাজধানী কাবুলে আছেন। তিনি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছেন যাদের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই এবং সাবেক আফগান সরকারের জাতীয় সমঝোতায় নেতৃত্বদানকারী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ রয়েছেন। এর মাধ্যমে সরকারে তালেবান ছাড়াও অন্যদের যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে তালেবানের রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান মোল্লাহ বারাদার তালেবান শীর্ষ নেতাদের নিয়ে আফগানিস্তানের কান্দাহারে পৌঁছেছেন। তারা কোথা থেকে সেখানে পৌঁঁছেছে তা স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে বেশিরভাগ নেতাই কাতারের দোহায় ছিলেন এবং মার্কির বাহিনী প্রত্যাহারের পর দেশ শাসনের রূপরেখা নিয়ে আমেরিকানদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। তালেবানের অন্যতম মুখপাত্র সুহায়েল শাহিন জানিয়েছেন, সরকার হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থাত্ এতে সবার অংশগ্রহণ থাকবে। তালেবানকে আলোচনার মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, যে সরকার হবে ঐক্যবদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রতিনিধিত্বমূলক এবং যেখানে নারীদের পূর্ণ, সমান ও অর্থবহ অংশগ্রহণ থাকবে।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, আফগানিস্তান পরিস্থিতির বিষয়ে তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগ রাখছে। ইইউ’র পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল জানিয়েছেন, ইইউ তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। কারণ তারা যুদ্ধে জিতেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো জানিয়েছেন, তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। কারণ কানাডার আইন অনুযায়ী তালেবান এখনো সন্ত্রাসী গ্রুপ।
সংবাদ সম্মেলনে যা বললো তালেবান
তালেবানের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তাদের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, ২০ বছর আগেও আমাদের দেশ মুসলিম রাষ্ট্র ছিল। আজও আছে। কিন্তু অভিজ্ঞতা, পরিপক্কতা এবং দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ২০ বছর আগের তালেবানের সঙ্গে আজকের তালেবানের বিশাল তফাত রয়েছে। আমরা এখন যেসব পদক্ষেপ নেব তার সঙ্গে সে সময়কার তফাত রয়েছে। এটা বিবর্তনের ফসল। তিনি বলেছেন, আফগানিস্তানের শাসন ব্যবস্থা পরিচালিত হবে ইসলামি মূল্যবোধ অনুযায়ী। মুখপাত্র বলেন, ২০ বছরের সংগ্রামের পর আমরা (দেশকে) মুক্ত করেছি এবং বিদেশিদের বহিষ্কার করেছি। গোটা জাতির জন্য এটা গর্বের মুহূর্ত। আফগানিস্তান যাতে একটা যুদ্ধ ক্ষেত্র বা সংঘাতের দেশ না হয় সেটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই। আমরা শত্রুতার অবসান চাই। আমরা ঘরে ও বাইরে কোথাও কোন শত্রু চাই না, বলেন মুজাহিদ।
আফগানিস্তানের মাটি কারো বিরুদ্ধে ব্যবহার হবে না বলে উল্লেখ করেছেন মুজাহিদ। আফগানিস্তান আল-কায়দা যোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠার ঝুঁকি আছে কিনা সাংবাদিকরা এমন প্রশ্ন করলে মুজাহিদ বলেন, আফগানিস্তান কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘাঁটি হবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমরা এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি। যারা বিদেশিদের জন্য অনুবাদকের কাজ করেছে বা বিদেশিদের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ করেছে তাদের প্রতি ভবিষ্যত্ আচরণ সম্পর্কে মুজাহিদ বলেন, কারোর প্রতি প্রতিশোধ নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, যারা এদেশে বড় হয়ে উঠেছেন তারা এদেশেরই সন্তান। আমরা চাই না তারা চলে যাক। তারা আমাদের সম্পদ। তিনি আরও বলেন, কেউ কারোর বাসার দরজায় টোকা মেরে জিজ্ঞাসা করবে না ‘আপনি কাদের সঙ্গে কাজ করতেন?’ তিনি আশ্বাস দেন, কাউকে হয়রানি করা হবে না।
নারীর অধিকার প্রশ্নে তালেবান মুখপাত্র বলেন, শরিয়াহ আইনের অধীনে নারীর অধিকার রক্ষায় আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, নারীরা আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমরা এই আশ্বাস দিতে চাই যে নারীদের প্রতি কোনো বৈষম্য করা হবে না। মুজাহিদ বলেন, আমাদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী চলার অধিকার আমাদের আছে। অন্য দেশের অন্য দৃষ্টিভঙ্গি, ভিন্ন নিয়ম, ভিন্ন বিধান থাকবে। আফগানদের মূল্যবোধের নিরীখেও তাদের নিজস্ব আইন এবং বিধান আছে। তালেবান মুখপাত্র বলেন, বেসরকারি সংবাদ মাধ্যমকে তালেবান প্রশাসনের অধীনে কাজ করতে হবে। আমরা মিডিয়াকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা চাইব আমাদের সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যে থেকে মিডিয়া কাজ করবে। বেসরকারি মিডিয়া স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে। মিডিয়ায় ইসলামি মূল্যবোধের পরিপন্থি কিছুই প্রচার করা যাবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। মিডিয়াকে উদ্দেশ্য করে মুখপাত্র বলেন, আমাদের যেখানে ঘাটতি থাকবে, দেশের কল্যাণে সেই ঘাটতি আপনারা পূরণ করবেন। কিন্তু মিডিয়াকে আমাদের বিরুদ্ধে কাজ করতে দেওয়া হবে না এবং সংবাদমাধ্যম দেশ ও জাতির ঐক্যের লক্ষ্যে কাজ করবে।
আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য সবাইকে ক্ষমা করা হয়েছে জানিয়ে জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেন, আমাদের যোদ্ধা, আমাদের জনগণ, সব পক্ষ, সব উপদল, সবার অন্তর্ভুক্তি আমরা নিশ্চিত করব। তিনি জানান, সরকার গঠনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছি। কাজ সম্পূর্ণ হলে এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হবে। অন্যদিকে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ দাবি করেছেন, তিনিই দেশটির বৈধ তত্ত্বাবধায়ক প্রেসিডেন্ট।
সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা
আফগানিস্তানের সব সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে তালেবান আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন সম্পূর্ণ আস্থার সঙ্গে কাজে ফিরে আসেন। ‘সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হচ্ছে...সুতরাং আপনারা সম্পূর্ণ আস্থার সঙ্গে নিয়মিত জীবনযাত্রা শুরু করতে পারেন।’ তালেবানের বিবৃতি উদ্ধৃত করে খবর দিয়েছে এএফপি। কাবুলের অনেক জায়গায় গতকাল রুটির এবং ওষুধের দোকান খুলেছে এবং রাস্তাঘাটে আরো বেশি গাড়ি চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আজমল আহমাদে ঘানি সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে রবিবার রাতে আফগানিস্তান ছাড়েন। - বিবিসি, আলজাজিরা ও দ্য গার্ডিয়ান
