তরুণ উদ্যোক্তা মেহেদী হাসানের 'কার ডিলার'

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২১, ১৪:৪০

শতভাগ নিষ্ঠা , সততা ও একাগ্রতা যেকোনো ব্যবসার মূল পুঁজি, এগুলোকেই  ব্যবসার সাফল্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এভাবেই মন্তব্য করলেন , বাংলাদেশের বারিধারার কারডিলার কোম্পানির  উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান। তরুন এই উদ্যোক্তার শুরুটাতে চাকরি করে ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা ছিল। গাড়ির এক্সপোর্ট কোম্পানিতে কর্মরত এক বন্ধুর সাথে গাড়ি নিয়ে প্রায়ই কথা হতো। গাড়ি কার ভালো না লাগে! কিন্তু সাধ্যের কারণে অনেকেই গাড়ি কিনতে পারেনা।

রায়হান নামের তার এই বন্ধু জাপান থেকে বিভিন্ন দেশের মার্কেটে এক্সপোর্ট করতো। সে আফ্রিকার কয়েকটা দেশের হয়ে সে কাজ করতো।তার চাকরি কালীন সময়ের কথা বলতে গিয়ে বলেন , বন্ধু রায়হান একদিন হুট করে কল দিয়ে বললো , বাংলাদেশের মার্কেটে তার কোম্পানি সার্কুলার দিয়েছে। কিন্তু আমার কোনো কোয়ালিফিক্যাশন ছিলোনা। মিনিমাম রিকয়ারমেন্ট ছিলো গ্রাজুয়েশন। আর আমার ছিলো ইন্টারমিডিয়েট সার্টিফিকেট। তার পরেও আমি সিভি দেই এবং ভাগ্যক্রমে দুই দিন পরে কল আসলো। তারপর ভাইভাতে টিকলাম। মোটামুটি সুন্দরভাবেই কাজ করতে থাকলাম কোম্পানিতে। আমার কাজ ছিল সেল করা , ক্রেতাসাধারণের সাথে সুসম্পর্ক বজিয়ে রাখা।

আমি যখন গাড়ি সেল করা শুরু করলাম আমি গাড়ি সেল করলাম ২৭ টা। তাও আবার প্রথম মাসেই। আর পুরো বাংলাদেশি মার্কেটে highest seller হই। সাথে বাংলাদেশ অফিসেও টপ হই। বাংলাদেশ অফিস হচ্ছে হোল অফিস যেখানে টপ হলে ১০০০$ দিতো আর বাংলাদেশি মার্কেটে টপ হলে আরও ৪০০$ দিতো।

মেহেদী হাসান আরও বলেন , আমি যখন বিজনেস করতে নামি তখন আমার কাছে জাস্ট ইম্পোর্ট লাইসেন্স করার টাকা টাই ছিলো জাস্ট। তাও আমার অনেক আত্মবিশ্বাস ছিলো যে , আমি পারবো। আমি যখন কোম্পানিতে ছিলাম তখন যেহেতু আমি প্রায়ই টপ হতাম মার্কেটে তাই বাংলাদেশের প্রায় সব ইম্পোর্টার দের সাথেই আমার পরিচয় ছিলো।

আমাকে অনেকে না চিনলেও আমি আমার প্রয়োজনে সবাইকেই চিনতাম এবং সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতাম। তখন দেখা যেতো বাংলাদেশের সেরা সেরা গাড়ির শোরুম গুলোর সাথে আমার বেশ ভালো বন্ডিং ছিলো। অনেকেই শোরুমে অফার দিলো তবে সেটা না করে আমি ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট টা করে ফেলি আর কি আই আর সি।

তো যেহেতু কোম্পানি তে আমার কাজ ছিলো জাস্ট ইম্পোর্টার দের ইনফরমেশন দেয়া সাথে গাড়ি সেল দেয়া। তবে হোলসেলে গাড়ি সেল করার সাথে ঐ ব্যাপার টা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি সেখানে যেয়ে আরও নতুন নতুন ইনফরমেশন জানতে পারলাম । এক ফ্রেন্ডের সাথে বসলাম দেন কাস্টমার দের সাথে কথা বলে দেখলাম অনেক নতুন কিছু আছে। আমি বুঝতে পারতেছিলাম না।

তাই আমার মনে হলো আমাকে আরও জানতে হবে আর সে জন্য আমি শোরুমে চাকরি নিলাম। আর এই শোরুমের চাকরিটা আমার জন্য ছিলো প্লাস পয়েন্ট। কারণ, এখানে এসে আমি গাড়ি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পারলাম। যেগুলো আগে জানা ছিলোনা। ঐ চাকরিটা আমি প্রায় বছর খানেক এর উপর করেছিলাম। মানে আমার মনে সবসময় বিজনেস এর চিন্তায় ঘুরতো। আর কি এজন্য আমি এক্সপার্ট এর জব ছেড়ে দিছিলাম যেনো আমি ইম্পোর্টার হতে পারি। আমি গাড়ি কিনবো , সেল করবো আমার একটা শোরুম থাকবে এরকম একটা স্বপ্ন ছিলো।

যখন আমি কোম্পানিতে ছিলাম তখন ইনফরমেশন গুলো জেনে ছিলাম কিন্তু ওতো নিখুঁত ভাবে না। বাট শোরুমে জব নেয়ার পর ইচ এন্ড এভ্রিথিং আমি একদম নিখুঁত ভাবে জানলাম। বিভিন্ন গাড়ির ইনফরমেশন আমি বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে নিতাম। কোন গাড়ির কি আছে কি নাই সব কিছু। ২০০৯ সালে বাবা মারা যায়। পরিবারকে সাপোর্ট দেয়ার দায় পড়ে আমার ঘাড়ে। যার জন্য গ্রাজুয়েশন টাও স্টপ হয়ে যায়। ৪র্থ সেমেস্টারে যেয়ে গ্রাজুয়েশন অফ করে দেই। পরিবারের এই চরম সময়টা আমাকে জীবন সম্পর্কে ভাবতে সাহায্য করেছে।

তিন ভাইবোন আর মায়ের সংসার। আব্বা মারা যাওয়ার পর বড়ভাই পড়ালেখা করে নাই। বাসার খরচ , ছোট বোনের পড়াশোনার খরচ , আমার খরচ আমাকেই বহন করতে হতো। এমন অনেক জায়গায় আমি হেঁটে হেঁটে গেছি। দুয়ারে দুয়ারে চাকরি খুঁজেছি। দিন গুলো খুব কষ্টের ছিলো। মানে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমি এই দিন উপেক্ষা করে সামনে আগাতে পারবো এটাও আমার ভাবনায় আসতো না।

শোরুমে ১ বছর জব করার সময়ে আমার ইম্পোর্টার লাইসেন্স হয়ে যায়। তো আমি যেটা করতাম মাঝে মধ্যে একটা দুইটা গাড়ি আমি আমার লাইসেন্স দিয়ে ইম্পোর্ট করতাম আর কি। তারপর গাড়ি গুলো আমি যে শোরুমে জব করতাম ওই শোরুমের থ্রো তেই সেল করতাম। বছর খানেক যায় এরপর আমি নিজে শোরুম দেই।

প্রথম শোরুম ছিলো গ্লোবাল অটো যেটা ছিল একটা পার্টনারশিপে পরবর্তীতো বারিধারাতে মেহেদী হাসান তার নিজস্ব শোরুম প্রতিষ্ঠা করেন যেটি CarDrealer নামে পরিচিত। আমি শোরুম এ জব করাকালে দেখতাম যে আমাকে কাস্টমারের জন্য ওয়েট করতে হত। মানে কোনোদিন একজন আসত। কোনোদিন ৪-৫ জন আসতো আবার এমনও দিন গেছে কেউই আসতোনা। ব্যাপারটি আমার কাছে কেমন যেন লাগতো।

তখন থেকেই আমি ভাবতাম আমি এমন কিছু করবো যেন কাস্টমারকে আমি না খুঁজে উল্টো কাস্টমার আমাকে খুঁজে। সোজা কথায় আমি কাস্টমার এর জন্য সারাদিন শোরুমে বসে থাকার কোনো ইচ্ছা আমার ছিলোনা। তাই আমি ভাবলাম ইউটিউব এ ভিডিও বানালে কেমন হয়! তখন আসলে টুকটাক ভিডিও বানানো শুরু করি।

তো আসলে ভিডিও বানানোর জন্য প্রাক্টিসই করছি ১ দের বছর এরপরও যখন ভিডিও বানাতাম , দেখতাম আসলে ভিডিও বানাতেই পারতাম না , মানে ক্যামেরার  সামনে কথায় বলতে পারতাম না। আমার চেষ্টা একটায় আমাকে তারা খুঁজে নিবে আমার কাজের মাধ্যমে আর অথেনটিক ওয়েতে ইনফরমেশন গুলো প্রোভাইড করার চেষ্টা করতাম। এবং মানুষ যাতে উপকৃত হয় এবং ফিল করতে পারে।

তারপর একটা সময় পর ভালো করতে থাকলাম। প্রথমে পার্টনারশিপে ভিডিও করতাম। তারপর পার্টনারশিপ ছেড়ে নিজেই করা শুরু করলাম। আর সেই শূণ্য পরিকল্পা থেকে আজ আমার কোম্পানি লিমিটেড কোম্পানি হয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন , আমি যতটুকু পারি ক্রেতা সাধারণকে সাহায্য করার চেষ্টা করি। ফেইসবুক , ইউটিউবে আমার এখন একটা নির্দিষ্ট অডিয়েন্স আছে। সবাই আমার থেকে কিছু চায় আর সেটা অথেনটিক কিছু অভিয়াস্লি। যেহেতু অনলাইনে ব্যবসা করি ক্লায়েন্ট ছাড়াও অনেকেই কল দেয় চেষ্টা করি সবাইকেই সমান গুরুত্ব দেয়ার। যেন সবাই উপকৃত হয়। ইউটিউবে আমাদের ঠিকানা CarDealer নামে। ইউটিউব চ্যানেলটি নিয়ে প্লান সম্পর্কে তিনি জানান , নিয়মিত ভিডিও করতে চাই কিন্তু ব্যস্ততার মাঝে রেগুলার ভিডিও করা হয়না, প্লান আছে ইন ফিউচারে এট লিস্ট রেগুলার ভিডিওটা করবো। একটু ডিফরেন্ট ডিফরেন্ট কন্টেন্ট থাকবে। আমার মেসেজ হচ্ছে তারা যখনই গাড়ি কিনবে আজকে কিনুক আর ৫ বছর পরে কিনুক আর ১৫-২০ বছর পর কিনুক তারা যেন ফিক্সড হতে পারে যে এখান থেকে গাড়ি কিনবো।

ইত্তেফাক/এএইচপি