নতুনভাবে জেগে ওঠার জন্য বাড়ি ফেরা প্রয়োজন

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২১, ২১:০৫

এই বিষণ্ন সময়ে জীবনকে আবারও নতুন করে সাজানো প্রয়োজন। নিঃসন্দেহে এটি একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়। মহামারি করোনা ভাইরাসে বিশ্বব্যাপী জীবন বিধ্বস্ত হওয়াতে আমাদের অনেকেই, এমনকি লাখ লাখ মানুষ উপলব্ধি করছে, জীবনের মূল বিষয়গুলোতে ফিরে যাওয়া উচিত এবং এই অসারতার পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা টেলিভিশনের পর্দায় দিনের পর দিন লক্ষ করছি বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাদের নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছে। লকডাউনে ঘরে থাকা সবচেয়ে জরুরি। ভাইরাস থেকে দূরে থাকাটাও একান্ত প্রয়োজন।

সবকিছুই সত্য। কিন্তু আপনি যখন একজন রিকশাচালকের আর্তনাদ শোনেন, যিনি বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিতে ভিজে সেই প্রাচীন তিন চাকার ওপর ভর করে যাত্রীদের সেবা দিতে অপেক্ষা করছেন, যার মাধ্যমে জোগাড় হবে তার দৈনন্দিন খাবার; যখন আপনি একজন কারখানার কর্মীর সঙ্গে কথা বলেন, যার চাকরিটা আর নেই—এ যেন এক পুরোনো ও হারানো বিশ্বের প্রতিচ্ছবি, তখন আমাদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পাণ্ডিত্য ফুটে ওঠে। সড়ক-মহাসড়কে এবং উন্মত্ত নদীর বুক জুড়ে চলাচলরত ফেরিতে পুরুষ ও নারীরা নাড়ির টানে গ্রামের পথে পাড়ি জমাচ্ছে, যারা অনেক দিন আগে নিজেদের ঘর ছেড়ে সুখের সন্ধানে এসেছিল এই অপরিচ্ছন্ন শহরে। ছোট বাচ্চাদের সেই কী মর্মান্তিক দৃশ্য! যারা তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত, তাদের পা ফুলে গেছে এবং তাদের কেন হাঁটতে হচ্ছে তা নিয়েও তারা বেশ বিভ্রান্ত! বিষয়টি নিয়ে মনে প্রশ্ন জেগে ওঠাটাই স্বাভাবিক, দেশ জুড়ে গণপরিবহনের ওপর হঠাত্ নিষেধাজ্ঞা জারি না করে এই সব মানুষকে গণপরিবহনে গ্রামে ফেরত যাওয়ার অনুমতি কি কর্তৃপক্ষের দেওয়া উচিত ছিল না?

আমরা আশা করে বসে আছি শহর ও গ্রামে এসব অসহায় মানুষ ভাইরাস মোকাবিলা করতে নিজেদের ঘরে বসে থাকবে। আমরা ভেবে দেখছি না, শহর এবং গ্রামে এসব নারী-পুরুষ যাদের চাকরি-বাকরি নেই, আয়-রোজগার নেই এবং খাবার টেবিলে নেই খাবার অথচ মাসিক বাসাভাড়া পরিশোধের দায়ে ভারাক্রান্ত হয়ে আছে। মহামারির এমন দুঃসময়ে তারা নিজ বাড়িতে বন্দিদশা অবস্থায় কাটাবে, এমনটি আমাদের প্রত্যাশা করা উচিত নয় এবং সেটি সম্ভবও নয়।

এবং সে কারণেই তারা এই সংকটময় মুহূর্তেও হেঁটে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, এই আশায় যে রাস্তায় কোনো না কোনো স্থানে কারো ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা রিকশা পাওয়া যাবে এবং রাস্তার মোড়ে দয়াপরবশত হয়ে তারা নিজস্ব গাড়িতে তাদের পৌঁছে দেবে রোদ-ঝড় ও বৃষ্টিতে জীর্ণশীর্ণ সেই টিনের কিংবা খড়ের ছাউনির ঘেরা বাড়িতে, যা তাদের কাঙ্ক্ষিত সেই পুরোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই। তার পরও এটা একটা বাড়ি তো এবং আসল বাড়ি হচ্ছে সেটাই যেখানে আমার ভাইবোন, তাদের স্বামী-স্ত্রী থাকে। তাদের সপক্ষে আমিও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে বলতে চাই, জীবন কখনোই আর আগের মতো থাকবে না। না, এটা এডওয়ার্ড গ্রের সেই কবিতার লাইনের মতো সেই মুহূর্ত নয়, যা আজকাল আমার মধ্যে কাজ করে—‘আলো নিভে যাচ্ছে...সেই আলো আর আমাদের জীবদ্দশায় ফিরবে না’ (অবশ্যই এই অন্ধকার একদিন চলে যাবে এবং রাত শেষে ফিরে আসবে সোনালি প্রভাত)।

হ্যাঁ, আজ আমার, আমার ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে এই উপলব্ধি জাগ্রত হয়েছে যে, আমাদের শেকড়ে ফিরে যেতে হবে। আমাদের পারিবারিক অস্তিত্বের মূলে ফিরে যেতে হবে। আজ এটাই আবশ্যকীয় ও বাধ্যতামূলক। আমার ভাই আমাদের ছোট্ট সেই গ্রামটিতে বংশপরম্পরায় পাওয়া এক খণ্ড জমিতে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পারিবারিক অর্থনীতির এক নতুন ভিত্তি স্থাপন করেছে। যে জমিতে আমরা প্রতি বছর ধান ও পাট লাগিয়ে আশানুরূপ ফলন পেতাম, সেই জমিতেই তিনি একসারি মেহগনি গাছের চারা লাগিয়েছেন। এই মেহগনি চারাগুলো কয়েক বছরের মধ্যে বড় বৃক্ষ হয়ে উঠবে এবং অবশ্যই পরিবারের দুঃসময়ে সেগুলো সহায়ক হবে।

সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে বড় ধরনের সংকটমুহূর্তই আজ আমাদের ওপর নেমে এসেছে। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর উদ্ভাবনীশক্তির দ্বারা আর্থিক জোগান বাড়াতে হবে, যার ফলে বাড়ির উঠোনে ও পুকুরে যেখানে ছোটবেলায় আমরা খেলেছি এবং একে অপরকে জল ছিটিয়ে দিয়েছি, সেখানে সবজির মাচা করার ব্যাপারটি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। বছরের পর বছর আমরা একসময় এসব জায়গায় টম্যাটো আর কিছু সবজি উত্পাদন করেছি। বাড়ির আশপাশে বেগুন, কাঁচামরিচ, ঢ্যাঁড়শ, লাউ ইত্যাদিও লাগানো হতো। এসব ফলনে আমাদের সবার মাধ্যই আনন্দের বন্যা বয়ে যায়! মহামারির এই সময়ে আমরা কেবল পরিবারের প্রয়োজনেই প্রকৃতির এই মনোমুগ্ধকর ফলফলাদি-শাকসবজির উত্পাদন বাড়াতে পারি। কয়েক সপ্তাহ আগে আমার ভাই, বোন আর ভাবি গ্রামের বাড়ির আঙিনায় কিছু ফলগাছের চারা লাগিয়েছে যেখানে কয়েক দশক আগে পরিবারের স্বাস্থ্য ও আর্থিক সুরক্ষায় জন্য আমাদের পিতামহ নারিকেল, আম, খেজুর ও তালগাছ লাগিয়েছিলেন।

জীবন একই রকম থাকবে না। এই অনিশ্চয়তার দিনগুলোতে জীবনকে পুনরায় ঢেলে সাজানো প্রয়োজন, পুনরায় গড়ে তোলা প্রয়োজন। মেহগনিগাছ, ফলের চারা ও সবজির মাচার পাশাপাশি আমরা একটি পারিবারিক খামারও করতে পারি যে খামারে থাকবে দুধেল গাভি ও ছাগল, থাকবে হাঁস-মুরগি। খামারটি শুধু পারিবারিক আয় উপার্জনেই নয়, পারিবারিক স্বাস্থ্যের জন্যও বেশ ভালো একটি উদ্যোগ হবে।

বাড়ির পুকুরটি মাছে পরিপূর্ণ থাকলেও পাশে আরেকটি ছোট নতুন পুকুর খনন করে পারিবারিকভাবে ও পরিকল্পিত উপায়ে মাছ চাষ করলে নিশ্চিতভাবেই আমাদের গ্রামের বাড়িটি একটি শক্তিশালী পারিবারিক ভিত্তিমূলে পরিণত হবে। আমরা বছরের পর বছর জীবিকার জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছি। এখন সময় এসেছে নিজেদের জন্য কিছু করার। মহামারির গতিপ্রকৃতি গভীরভাবে অনিশ্চিত ঠিকই কিন্তু এটি আমাদের পরিবারিক বন্ধনকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে এবং বিষয়টি একটি পরিবারের গণ্ডি থেকে পুরো একটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। আমার চিন্তা জুড়ে গ্রামে একটি ছোট সমবায় গড়ে তোলার প্রয়াস ফুটে উঠেছে, যা আমাদের প্রতিবেশীদের আর্থিক নিরাপত্তায় সহায়ক হবে। আমরা ভাইবোনেরাও ভাবছি, পারিবারিক অর্থনৈতিক ধারা নিশ্চয়ই সম্প্রদায়গত তথা সামগ্রিকভাবে সামাজিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের বংশের বড় অংশ জুড়ে চাচা/মামা, চাচি/মামি এবং চাচাতো/মামাতো ভাইবোন, ভাইপো ও বোনঝিরা রয়েছেন তাদের মাঝে ‘শিকড়ে ফিরে আসা’র জন্য স্বপ্ন বুনন শুরু করব।

মহামারি আমাদের জীবনের বিকল্পধারাগুলোকে পুনরায় সাজিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। যেমন করে বর্ষার জল টিনের চালের ওপর ঝমঝমিয়ে পড়ে, তেমনি করে আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক ভবিষ্যতের, যখন গ্রামে তাক-সুসজ্জিত বইয়ের লাইব্রেরি থেকে গ্রামের তরুণরা জ্ঞান আহরণ করে এই চারণভূমির বাইরেও বিশ্বকে আলোকিত করে তুলবে।

জীবনের এই কঠিন সময়ে নতুনভাবে জেগে ওঠার জন্য বাড়ি ফেরা প্রয়োজন এবং আমাদের পৈতৃক আবাসস্থলে নতুন করে পারিবারিক অর্থনীতি গড়ে তোলাও জরুরি।

n লেখক :সাংবাদিক ও জীবনীকার

ইংরেজি থেকে অনুবাদ :এইচ এম নাজমুল আলম