উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশের ভবিষ্যত্

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২১, ২১:০৬

বর্তমানই ভবিষ্যত্ নির্মাণ করে—একটি জাতি, সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নিতে এটাই মূলমন্ত্র। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা কোন পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, উন্নয়ন আর অগ্রযাত্রায় দেশকে এগিয়ে নিতে সার্বিক ব্যবস্থা কেমন, তার ওপরই ভবিষ্যত্ নির্ভরশীল। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ হরেও সাম্প্রতিক সময়ে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে নিজেকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে পদার্পণে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শুরুটা হয়েছিল রক্ত দিয়ে। ১৯৪৭-এ দেশভাগের পর, ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষার জন্য রক্তদান, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন এবং পরিশেষে ১৯৭১-এ লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ইংরেজ উপনিবেশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তানের কাছে হার না মানা সংগ্রাম করে লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে লাল-সবুজের পতাকা আজ বিশ্বে মাথা উঁচু করে জায়গা করে নিয়েছে। উপনিবেশ আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অবধি প্রতিটা সংগ্রাম ছিল মুক্তি, চেতনা, উন্নয়ন আর অগ্রযাত্রায় একেকটা সশস্ত্র পথ।

বর্তমান সময়ে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই অত্যাধুনিক আইটি প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। বাংলাদেশও বাদ পড়েনি এই তথ্যপ্রযুক্তির ছোঁয়া থেকে। এই সময়ের অত্যাধুনিক আইটি টেকনোলজি উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা পালন করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের দিকে লক্ষ করলেই তা পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। বর্তমানে পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প আমাদের নিজ অর্থায়নে সম্পন্ন হয়েছে, যা ২০২২ সালের মধ্যে সেই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন মান যুক্ত করবে। দেশের মানুষের জীবন-যাপনের মান, মাথাপিছু আয়ের পরিমাণসহ সামগ্রিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পন করেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ননীতি সংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) গত ১৫ মার্চ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এর ফলে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষিত হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ, যেখানে রয়েছে বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ৩০ লাখ শহিদের রক্তের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া এই বাংলাদেশকে আজকের অবস্থানে আসতে অতিক্রম করতে হয়েছে হাজারো প্রতিবন্ধকতা। যুদ্ধবিধ্বস্ত, প্রায় সর্বক্ষেত্রে অবকাঠামোবিহীন সেদিনের সেই সদ্যজাত জাতির অর্জনের পরিসংখ্যানও নিতান্ত অপ্রতুল নয়। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আটটি লক্ষ্যের মধ্যে শিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য উন্নতি প্রদর্শন করতে সক্ষম হয়েছে। নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের করা মন্তব্য এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মতো সাফল্য আছে বাংলাদেশের। বিশেষত শিক্ষার সুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার ও জন্মহার কমানো, গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্যসুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য।

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে বাংলাদেশ সরকার নিয়েছে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়ে দেশের ৪ হাজার ৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এই পোর্টালের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। দেশের সব কটি উপজেলাকে আনা হয়েছে ইন্টারনেটের আওতায়। টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১২ কোটি  ৩৭ লাখ এবং ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ৪ কোটি ৪৬ লাখে উন্নীত হয়েছে। সেবা প্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে চালু করা হয়েছে ই-পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পাদন করার বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। ফোর-জি প্রযুক্তির মোবাইল নেটওয়ার্কের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

স্বাধীনতার অর্ধশত বছরে এসে বাংলাদেশ অর্জন করেছে অভূতপূর্ব সাফল্য। সাফল্য ও ব্যর্থতার মানদণ্ডে সাফল্যের মেরু তুলনামূলক বেশি ভারী। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর পাশাপাশি মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্র, পায়রা সমুদ্রবন্দর, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উেক্ষপণ, কর্ণফুলী টানেলসহ দেশের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।

ভবিষ্যত্ বাংলাদেশ গড়বে তরুণ প্রজন্ম সম্ভাবনার। এর জন্য একঝাঁক দেশপ্রমিক তরুণ অপেক্ষারত, এখন নিজেদের নির্মাণ করছে ভবিষতে দেশের হাল ধরবে বলে। একটি প্রজন্ম দেশকে প্রতিকূল বিরূপ পরিস্থিতি থেকে তুলে নিয়ে এসেছে, আর নতুন প্রজন্ম তাকে বিশ্বের কাতারে উন্নত এবং আধুনিক দেশ হিসেবে তুলে ধরবে—এভাবেই দেশ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়