আজ পবিত্র আশুরা। হিজরি ১৪৪৩ সালের ১০ মহরম। আরবি ‘আশুরা’ শব্দটি ‘আশরুন’ মূল শব্দ হইতে উদ্গত। ইহা একটি ক্রমবাচক শব্দ, যাহার অর্থ দশম। ইসলামের দৃষ্টিতে হিজরি বর্ষের প্রথম মাস মহরমের ১০ তারিখকে বলা হয় আশুরা। বিশ্বজগতের প্রারম্ভকাল হইতে এই দিবস বিশেষ মর্যাদা ও সম্মানে ভূষিত। আরব দেশে জিলকদ, জিলহজ, মহরম ও সফর—এই চার মাস অধিক মর্যাদাপূর্ণ। এই মাসগুলিকে একত্রে বলা হয় আশহারুল হুরুম বা সম্মানিত মাসসমূহ। পবিত্র কোরআনুল করিমের সুরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে এই ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই পবিত্র দিনে আল্লাহ তায়ালার হুকুমে দুনিয়া সৃষ্টি হইয়াছে। আবার কিয়ামতও সংঘটিত হইবে এই দিনে। এই দিনে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন প্রায় ২ হাজার পয়গম্বর। আদি পিতা হজরত আদমের (আ.) দেহে পাক রুহ প্রদান, মা হাওয়া (আ.)কে পয়দা, মহাপ্লাবন শেষে হজরত নুহ নবির (আ.) জুদি পাহাড়ে অবতরণ, নমরুদের অগ্নিকাণ্ড হইতে মিল্লাতে আবা ইব্রাহিমের (আ.) নাজাত, ৪০ দিন মাছের পেটে থাকিবার পর হজরত ইউনুসের (আ.) নিষ্কৃতি, ১৮ বত্সর পর হজরত আইউব (আ.)-এর রোগমুক্তি, হজরত মুসা (আ.)-এর নীল নদ পাড়িদান ও ফেরাউনের সলিলসমাধি, হজরত ঈসা (আ.)-এর ঊর্ধ্বাকাশে গমন প্রভৃতি অসংখ্য আলোড়ন সৃষ্টিকারী ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী এই মহান দিবস।
উপর্যুক্ত কারণে আশুরা হইতেছে একটি শুকরিয়া দিবস। আবার ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ৬১ হিজরির ১০ মহরমের এই দিনেই ঘটে বিশ্ব মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচাইতে মর্মান্তিক ও বিয়োগান্তক ঘটনা। এই দিনে বর্তমান ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালার মরুপ্রান্তরে আখেরি নবি হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ও ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলি ও খাতুনে জান্নাত ফাতেমাতুয যাহরা (রা.)-এর আদরের পুত্র ইমাম হুসাইন (রা.) নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে শাহাদত বরণ করেন। ঐ দিন তিনিসহ তাহার ৭২ জন সঙ্গীসাথি শহিদ হন, যাহাদের অধিকাংশই ছিলেন আহলে বায়েত বা নবি (স.)-এর বংশধর। কারবালার এই মর্মন্তুদ ঘটনা কুটিলতা, বিশ্বাসঘাতকতা, নৃশংসতা ও ষড়যন্ত্রের এক বড় দৃষ্টান্ত হিসাবে ইসলামের ইতিহাসে আজও স্মরণীয়। সেই হিসাবে আশুরা একটি শোকাবহ দিনও বটে।
এই পবিত্র দিনে আসলে আমাদের করণীয় কী? আমরা জানি, রমজানের এক মাসের রোজার পূর্বে আশুরার রোজাই ছিল অবশ্যপালনীয়। এই জন্য পবিত্র আশুরার দিনে অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি রোজা রাখা উত্তম। যাহাতে অন্য ধর্মের সহিত সাদৃশ্য না হয়, এই জন্য এই রোজা আশুরার দিনের আগে বা পরে মিলাইয়া দুইটি রোজা রাখিবার নিয়ম রহিয়াছে ইসলামে। হাদিস শরিফে এই রোজাকে সকল নফল রোজার মধ্যে সর্বোত্তম বলা হইয়াছে। ইতিমধ্যে আমাদের ধর্ম মন্ত্রণালয় জানাইয়া দিয়াছে, এবার করোনা ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে পবিত্র এই দিনে সকল ধরনের তাজিয়া মিছিল, শোভাযাত্রা ও অন্যান্য মিছিল বন্ধ থাকিবে। ইহা ছাড়া যে সকল সংক্ষিপ্ত কর্মসূচি গ্রহণ করা হইবে তাহা স্বাস্থ্যবিধি মানিয়াই পালন করিতে হইবে।
পবিত্র আশুরার প্রধান শিক্ষা হইল এক আল্লাহর নিরঙ্কুশ আনুগত্য করা এবং নিরন্তর তাহার শুকরিয়া আদায় করা। আর কারবালার ঘটনা হইতে আমরা এই শিক্ষা লইতে পারি যে, আমরা কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করিব না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কোনো আত্মত্যাগকে হাসিমুখে বরণ করিব। এই জন্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখিয়াছেন, ‘ফিরে এলো আজ সেই মহরম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’ এই দিনে ঢাকাসহ সারা দেশে যাহাতে শান্তিপূর্ণভাবে পবিত্র আশুরা পালিত হয়, সেই জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকিতে হইবে।
