হেফাজতের আমির বাবুনগরীর ইন্তেকাল

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২১, ২৩:১৫

চট্টগ্রামের দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষা পরিচালক ও  হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাস-পাতালের চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর। তিনি চার কন্যা, এক পুত্র ও স্ত্রীসহ অসংখ্য ছাত্র ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। গতরাত ১১টায় হাটহাজারী মাদ্রাসায় জানাজা শেষে সংলগ্ন কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে বিকালের দিকে তার লাশ গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের    ফটিকছড়ি উপজেলার বাবুনগরে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে শোকের আবহ সৃষ্টি হয়। এ সময় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী প্রয়াত এ ধর্মীয় নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান।

সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী ইত্তেফাককে বলেন, হুজুর (জুনায়েদ বাবুনগরী) দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। তার কিডনির সমস্যা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছিল। গত ৮ আগস্ট হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে গাড়িতে বসে তিনি করোনার টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণ করেন। যতদূর জানতে পেরেছি বৃহস্পতিবার সকালের দিকে তিনি মাদ্রাসায় হঠাত্ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে নগরীর বেসরকারি সিএসসিআর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করেন।

হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মীর ইদরীস নদভী জানান, হুজুর (বৃহস্পতিবার) সকালে নিজ কক্ষে বিছানায় শোয়া অবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যান। ডাক্তার এসে অক্সিজেন দিয়ে কৃত্রিমভাবে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা করেন। পরে চিকিত্সকের পরামর্শে অ্যাম্বুলেন্সে করে উনাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর ডাক্তাররা মৃত ঘোষণা করেছেন।

সিএসসিআর হাসপাতালের চিফ অপারেটিং অফিসার ডা. সালাহউদ্দিন মাহমুদ বলেন, দুপুর সোয়া ১২টার দিকে উনাকে (বাবুনগরী) হাসপাতালে আনা হয়। অবশ্য হাসপাতালে আনার আগেই তিনি মারা গিয়েছিলেন। হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে সাড়ে ১২টার দিকে উনাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৫৩ সালের ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার বাবুনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ বছর বয়সে তিনি আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে ভর্তি হন। সেখানে মক্তব, হেফজ ও প্রাথমিক শিক্ষা শেষে দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৭৬ সালে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর করাচিতে জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ায় তাখাচ্ছুছাত ফিল উলুমুল হাদিস গবেষণা বিভাগে ভর্তি হন। তিনি জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়া থেকে হাদিসের সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন। ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে বাবুনগর মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। তিনি দারুল উলুম হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষা সচিব ও শায়খুল হাদিস, বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম নূরানী তালীমুল কোরআন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাসিক মুঈনুল ইসলামের প্রধান সম্পাদক ছিলেন।

যেভাবে আলোচনায় ছিলেন জুনায়েদ বাবুনগরী

বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি আল্লামা শফীর নেতৃত্বে গঠিত হয় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ছিলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। ২০১১ সালে বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন নীতির (২০০৯) এর কয়েকটি ধারাকে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক দাবি করে এর তীব্র বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলাম। ২০১৩ সালে ইসলাম ও রসুলের কটূক্তিকারী নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসির দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করে ১৩ দফা ঘোষণা করে হেফাজত। একই বছর ৫ মে তারা সারা দেশ থেকে ঢাকা অভিমুখী লংমার্চ করে মতিঝিল চত্বরে সমাবেশ করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকাসহ সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন হেফাজত নেতাকর্মীরা। ৬ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন অভিযোগে জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেফতার করা হয়।

হেফাজতের আমিরের মৃত্যুতে শোক

হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। জুনায়েদ বাবুনগরীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ চট্টগ্রাম বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।