আফগানিস্তানে প্রথম তালেবান সরকারের নীতিনির্ধারক ছিলেন মোল্লাহ ওমর। কিন্তু তিনি কখনো সামনে আসেননি। একটি কাউন্সিল তৈরি করে শাসন চালাতেন। এবারও সেই একই বিষয় ঘটতে পারে বলে মনে করছেন ওয়াহিদুল্লাহ হাসিমি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তালেবান নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ ওয়াহিদুল্লাহ হাসিমি জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে তালেবান থিংকট্যাংক কাউন্সিল তৈরির দিকেই ঝুঁকে আছে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিনদের ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত, অর্থাত্ নির্ধারিত সময়সীমার পরও কাবুলে মার্কিন সেনা থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এদিকে গতকাল আফগানিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে তালেবানের গুলিতে দুই জন নিহত হয়েছে। তালেবান জানিয়েছে, কাবুলে চরম বিশৃঙ্খলায় রবিবার থেকে ১২ জন নিহত হয়েছে। অন্যদিকে তালেবানকে অভিনন্দন জানিয়েছে আলকায়েদা।
সেনাবাহিনী
হাসিমি জানিয়েছেন, আফগান সেনার কর্মকর্তা এবং যুদ্ধবিমানের পাইলটদের নতুন প্রশাসনে যোগ দেওয়ার আবেদন জানাতে পারে তালেবান। এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তালেবান মনে করে, আফগান বাহিনীর সঙ্গে তালেবান যোদ্ধাদের মিশিয়ে একটি নতুন সেনাবাহিনী তৈরি করা দরকার। বস্তুত, তালেবান গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শী হলেও তাদের কোনো বিমানবাহিনী নেই। তালেবান পাইলটও নেই। ফলে আফগান বাহিনী থেকেই বিমানবাহিনী তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। আত্মসমর্পণ করা আফগান সেনাদের থেকেও দক্ষ অফিসারদের নতুন বাহিনীতে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।
আফগান বাহিনীর কর্মকর্তাদের অধিকাংশই যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও তুরস্কে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। সেই প্রশিক্ষণ নতুন বাহিনীতে কাজে লাগবে বলেই মনে করছে তালেবান। পাশাপাশি গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক বিদেশি ঘাঁটি তারা নিজেদের দখলে নিয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ জার্মান ও মার্কিন ঘাঁটি। সেখানে অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্রের পাশাপাশি হেলিকপ্টার এবং যুদ্ধবিমানও দখল করেছে তারা। সেই সমস্ত আধুনিক বিমানের জন্য প্রশিক্ষিত পাইলট প্রয়োজন। আফগান বাহিনী থেকেই সেই পাইলটদের পাওয়া যাবে বলে মনে করছে তারা। তবে বাহিনীতে কেবল আফগান বাহিনীর সেনা রাখা হবে না, যথেষ্ট পরিমাণে তালেবান যোদ্ধাও মোতায়েন করা হবে, যাতে নতুন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে সেনাবাহিনী।
গণতন্ত্র নয়
নতুন আফগানিস্তানে গণতন্ত্রের কোনো জায়গাই থাকবে না বলে স্পষ্ট করেছেন হাসিমি। তিনি জানিয়েছেন, মূলত শরিয়াহ আইনের ওপরেই গড়ে উঠবে শাসনব্যবস্থা। তবে সেই ব্যবস্থা গত তালেবান শাসনের মতো হবে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি হাসিমি। অদূর ভবিষ্যতে তা স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে কাউন্সিল তৈরির বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত তিনি। তার বক্তব্য, তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে সরকারের প্রধান হবেন। কিন্তু সম্ভবত তিনি প্রেসিডেন্ট হবেন না। প্রেসিডেন্ট করা হতে পারে আখুন্দজাদার ডেপুটিদের। এই মুহূর্তে আখুন্দজাদার তিন জন ডেপুটি আছেন। মোল্লাহ ওমরের ছেলে মৌলভি ইয়াকুব, হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রধান সিরাজউদ্দিন হাক্কানি এবং দোহায় তালেবানের রাজনৈতিক প্রধান আবদুল ঘানি বারাদার। মঙ্গলবার ২০ বছর পর তিনি কান্দাহারে পা রেখেছেন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের বক্তব্য, তালেবান যে নতুন সরকার গঠন করতে চলেছে, তার মডেল হবে খানিকটা ইরানের মতো। শীর্ষ নেতার কাছে সবাই জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। তার নিচে থাকবেন প্রেসিডেন্ট এবং তার নিচে কাউন্সিল। অন্যদিকে যে সেনাবাহিনী তৈরি হবে, সেখানেও দুটি ভাগ থাকতে পারে। একদিকে শীর্ষ নেতার তত্ত্বাবধানে রেভল্যুশনারি গার্ডের মতো বাহিনী, অন্যদিকে সাধারণ সেনাবাহিনী। সুপ্রিম লিডারের সেনা হবে মূলত তালেবান যোদ্ধাদের নিয়ে। সাধারণ সেনাবাহিনীতে বর্তমান আফগান ফৌজের সেনাদের যুক্ত করা হবে।
এবিসি নিউজের প্রশ্নবাণে জর্জরিত বাইডেন
কাবুলে তালেবান বাহিনী প্রবেশের পর থেকে শহরের মূল বিমানবন্দরের ভেতরে ও আশপাশে ১২ জন নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে তালেবান বাহিনী। ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আমেরিকান নাগরিক ও মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করা ৫০ থেকে ৬৫ হাজার আফগানকে তারা সরিয়ে নেবে। আমেরিকা ৫ হাজার ২০০-এর ওপর লোককে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নিয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় সরানো হয়েছে ২ হাজার মানুষকে। পেন্টাগন সাংবাদিকদের জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য প্রতিদিন ৯ হাজার মানুষকে বিমানে করে নিয়ে আসা। প্রেসিডেন্ট বাইডেন জানিয়েছেন, একজন আমেরিকান আফগানিস্তানে থাকা পর্যন্ত মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
কাবুলে বিশৃঙ্খলার জন্য ভুল স্বীকার করবেন কি না—এমন প্রশ্নে বাইডেন বলেন, না। তিনি আরো বলেন, ‘বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে সেনা প্রত্যাহারের অন্য পথ সম্পর্কে আমি জানি না।’ একটি মার্কিন সামরিক বিমান থেকে আফগানদের পড়ে যাওয়া সম্পর্কে বাইডেন বলেন, এটা চার দিন আগের ঘটনা, পাঁচ দিন আগের কথা। বাইডন মাত্র গত মাসে বলেছিলেন, তালেবানের আফগানিস্তান দখল খুবই অসম্ভব। তার সেই মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে বাইডেন বলেন, গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছিল, এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে সম্ভবত এ বছরের শেষ নাগাদ।
স্বাধীনতা দিবসে গুলি
দেশের ১০২তম স্বাধীনতা দিবস পালনে রাস্তায় জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করছিলেন আসাদাবাদের বাসিন্দারা। সেখানে হঠাত্ গুলি চালায় তালেবান। এতে দুই জন নিহত ও আট জন আহত হন। কাবুলের রাস্তায়ও জাতীয় পতাকা নিয়ে মিছিল করেন বহু মানুষ। তালেবানের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন তারা। প্রতিবাদ বন্ধ করতে সেখানে কারফিউ জারি করে দেয় তালেবান। জালালাবাদে তালেবানের গুলিতে এক কিশোর আহত হয়েছে। প্রতি বছর ১৯ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করে আফগানিস্তান। মার্কিন উড়োজাহাজের চাকায় পাওয়া দেহাবশেষ আফগান ফুটবলার জাকি আনওয়ারির। এদিকে পঞ্জশির উপত্যকায় সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ এবং প্রখ্যাত এক তালেবানবিরোধী যোদ্ধার ছেলে আহমাদ মাসউদের নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। তিনি বলেন, আফগানিস্তানে তালিবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কেবল পঞ্জশির উপত্যকাতেই সীমাবদ্ধ। তাই গোটা আফগানিস্তান তালেবানের নিয়ন্ত্রণে বলা যাচ্ছে না। —ডয়চেভেলে, বিবিসি ও আলজাজিরা
