ছেলেবেলায় আমরা সকলেই আদর্শলিপিতে পড়িয়াছিলাম, ‘লেখাপড়া করে যেই, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সেই’। শিক্ষকগণ আমাদের জগত্সংসারে চলিবার নিমিত্তে জ্ঞান ও আদর্শমূলক বিভিন্ন নীতিশিক্ষা দিয়াছিলেন বটে, তবে সেই শিক্ষা বাস্তবজীবনে কতটা ফলপ্রসূ হইয়া উঠে তাহা বর্তমান বাস্তবতায় ভাবিয়া দেখার প্রয়োজন রহিয়াছে। যেই ছাত্রটি ছেলেবেলায় আত্মস্থ করিয়াছিল যে, পড়ালেখা করিলেই গাড়ি-ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়ানো যাইবে, সেই ছাত্রটি বড় হইয়া দেখিতে পায় ঘুষ ছাড়া তাহার চাকরি হইতেছে না, উপরি ছাড়া কোনো কাগজপত্র এক টেবিল হইতে আরেক টেবিলে সরানো যাইতেছে না, প্রতিটি টেবিলে ড্রয়ার রাখাই হইয়াছে যেন তাহার উপরির পয়সা যত্নসহকারে জমা রাখিবার নিমিত্তে। ছাত্রটি বুঝিতে পারে গাড়ি-ঘোড়ায় প্রকৃতপক্ষে চড়িয়া বেড়ায় চোর এবং দুষ্কৃতকারীরা—যাহারা চুরিচামারি, লুটপাট, দুর্নীতি করিয়া সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, আজকের দিনে কবি মদনমোহন তর্কালঙ্কার বাঁচিয়া থাকিলে তাহার নীতিবাক্য পরিবর্তন করিয়া হয়তো লিখিতেন, চুরিচামারি করে যাহারা, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে তাহারা!
ঘুষ, দুর্নীতি, রাহাজানি, অপকর্ম শুধু যে আজকের দুনিয়াতেই বিরাজ করিতেছে এমনটি নহে। প্রসঙ্গক্রমে একটি গল্পের অবতারণা করা যাইতে পারে। দেশ স্বাধীন হইবার পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক ছাত্রকে ব্যায়াম করিতে দেখিয়া তাহার পিতা প্রশ্ন করিলেন, পড়ালেখা বাদ দিয়া সে ব্যায়াম করিতেছে কোন উদ্দেশ্যে? ছাত্রটি উত্তর দেয়, আগে জান বাঁচাইতে হইবে তো, তাহার পরেই না পড়ালেখা! আমরা বুঝিতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়ে গুন্ডা-সন্ত্রাসীদের ভয়েই বেচারা পড়ালেখা বাদ দিয়া ব্যায়াম করিতে শুরু করিয়াছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, সিট বাণিজ্য হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত ছিল সেই সকল ছাত্রনেতা নামধারী দুষ্কৃতকারীরা; কিন্তু দেশ তো স্বাধীন হইয়াছে ৫০ বছর হইয়াছে, দেশের ঘুষ, দুর্নীতি, অপকর্ম ইত্যাদি সামগ্রিক পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হইয়াছে সেই প্রশ্ন কি আজকের দিনে অপ্রাসঙ্গিক? আমরা দেখিতে পাই, রাজনৈতিক প্রভাব খাটাইয়া একশ্রেণির ঠিকাদার টেন্ডার বাগাইয়া লয়, সেই টেন্ডার কমিশনের বিনিময়ে এক হাত, দুই হাত করিয়া কয়েক হাত ঘুরিয়া এমন হাতে পৌঁছায়, যাহার হয়তো লাইসেন্সই নাই! বিষয়টি সম্পর্কে যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অবগত নহে তাহা বলিবার উপায় নাই। ইহার পরও এই সকল কাজকারবার বন্ধ হয় না। যে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনায় সরাসরি মন্ত্রীদের দিকে আঙুল তুলিয়া ধরা সহজ বটে; কিন্তু ঘটনার পিছনে প্রকৃত কার্যকারণ সম্পর্কে আমরা নিবিড়ভাবে ভাবিয়া দেখি কি?
ছেলেবেলায় আমরা যেই সকল নীতিবাক্য আত্মস্থ করিয়া থাকি, বড় হইবার পর বাস্তব দুনিয়ায় আসিয়া দেখিতে পাই সেই সকল নীতিবাক্য আজকের দুনিয়ায় প্রাসঙ্গিক হইতেছে না। সকল কিছুই পরিবর্তন হইয়া যাইতেছে, অনেক পরিবর্তন নিঃসন্দেহে দুনিয়ার জন্য ভালো কিছু বহিয়া আনিবে না। সুতরাং আজকের দুনিয়ায় যাহারা দেশ পরিচালনা করিতেছেন, দেশের যাহারা নীতিনির্ধারক রহিয়াছেন তাহাদের ঠান্ডা মাথায় বসিয়া ভাবিতে হইবে। কী ঘটিতেছে সমগ্র দেশে তাহা বিবেচনা করিয়া সকল প্রকার অন্যায়, অপকর্ম, দুর্নীতি রোধে তাহাদের শক্ত অবস্থান লইতে হবে। সমাজের সর্বত্র ময়লা জমিতে জমিতে এমন অবস্থা যেন সৃষ্টি না হয়, সেই ময়লা দূর করা অসাধ্য হইয়া যায়। আমাদের মনে রাখিতে হইবে—জীবনে যাহা কিছুই দেখিয়া, শুনিয়া, পড়িয়া, আত্মস্থ করিয়া অভিজ্ঞতা অর্জন করা হইয়াছে, সকল কিছুকেই বাস্তব জীবনে অর্থাত্ সংসার, পরিবার হইতে শুরু করিয়া দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগাইতে হইবে। সতর্কতার সঙ্গে স্মরণ রাখিতে হইবে, গোঁজামিল দিয়া জীবন ও দেশ কোনোটাই চলিতে পারে না।
