ডিজিটালাইজেশনের প্রধান অন্তরায়

উচ্চমূল্য ও ধীরগতির ইন্টারনেট

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২১, ২১:১৮

আধুনিক যুগে প্রায় প্রতিটি দেশই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে নিজেদের উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বহু আগে থেকেই এদেশের নীতিনির্ধারকেরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যে আত্মপ্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, তা ইতিমধ্যে বাস্তবে পরিণত হয়েছে। অল্প সময়ের ব্যবধানে মোট জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশকে তারা ইন্টারনেটমুখী করতে পেরেছেন। এর মধ্যে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যেমন রয়েছে, একইভাবে অসংখ্য নিরক্ষর লোকও রয়েছে। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ইন্টারনেট গ্রাহক ৯ কোটি ১৪ লাখ ২১ হাজার। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৫৬ লাখ ৩০ হাজার। আর দেশে মোবাইল সংযোগ রয়েছে ১৫ কোটি ৭৫ লাখ ৪৪ হাজার। অর্থাত্ দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা গত ১০ বছরে ১০০ গুণ বেড়েছে।

উপর্যুক্ত ইতিবাচক খবরের ভিড়ে নেতিবাচক খবরও কম নয়। সময়ের ব্যবধানে হু হু করে দেশে ইন্টারনেট, ব্রডব্যান্ড ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও সেবার মান সেই অর্থে বাড়েনি, বরং বিভিন্ন মহল এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের অসত্ উদ্দেশ্য সফল করছে। ১৯৯৬ সালে এ দেশে সর্বপ্রথম ইন্টারনেট চালু হয়। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর অতিবাহিত হয়েছে, কিন্তু মন্থর গতির ইন্টারনেট এখনো এ দেশে আলোর মুখ দেখেনি। পূর্বে মানুষ যখনই ধীরগতির ইন্টারনেট ও ব্রডব্যান্ডের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, তখন তারা থ্রিজি ও ফোরজির আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনেছে। ভেবেছে, উচ্চগতির এসব ইন্টারনেট দেশে এলেই তাদের ভোগান্তি কমে যাবে। তবে সেই অবস্থা আজ পর্যন্ত হয়নি। বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে ভয়ংকর সব তথ্য। গুগল ও বেশ কয়েকটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এম ল্যাবের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সবচেয়ে ধীরগতির তালিকায় বাংলাদেশ তৃতীয়। অন্যদিকে ইন্টারনেটের গতির তুলনায় বিশ্বের ২২১টি দেশের মধ্যে ১৮৪তম অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। এই সমীক্ষায় ৪ লাখ ৬৭ হাজার বার বাংলাদেশের ৫০ হাজার স্বতন্ত্র আইপি অ্যাড্রেসের ইন্টারনেটের গতি পর্যালোচনা করা হয়। এতে গড় গতি পাওয়া যায় ৩ দশমিক ২ এমবিপিএস। একই সঙ্গে গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গড় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি এশিয়ার গড় ইন্টারনেটের গতির তুলনায় প্রায় ৬ দশমিক ২ গুণ ধীর এবং পুরো বিশ্বের তুলনায় ৭ দশমিক ৭ গুণ ধীর। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ লিবিয়া, সিরিয়া, উগান্ডা ও সোমালিয়ার মোবাইল ইন্টারনেট গতিও বাংলাদেশের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে।

ইন্টারনেটের গতিতে যখন এই দুর্বিষহ অবস্থা, তখন থেমে নেই এর দাম। পৃথিবীর অন্য যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় এখানে ইন্টারনেটের বাজার বেশ চড়া। এমনকি কম দামে মোবাইল ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেটের দামে বড় ধরনের পার্থক্য লক্ষ করা যায়। এ সমস্যা নিরসনের মাধ্যমে দেশের মানুষের কাছে ইন্টারনেট সহজলভ্য করতে সরকার ব্যান্ডউইডথের দাম কমানোর পাশাপাশি ভ্যাটের হার কমালেও সেই সুবিধা ভোগ করতে পারছেন না মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। মোবাইল ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা জিএসএমএর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের মূল্য তুলনামূলক অনেক বেশি।

প্রতিবেশী ভারতে যেখানে এক জিবি ডেটার গড় মূল্য সাড়ে ১৮ রুপি। সেখানে বাংলাদেশের এক জিবি ডেটার গড় দাম ৯৯ সেন্ট বা ৮৩ টাকা। বাংলাদেশে ইন্টারনেটের এই চড়া মূল্য নিয়ে বারবার অভিযোগ জানিয়ে আসছে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। তবে মোবাইল অপারেটর কর্তৃপক্ষ বারবার এমন নানা যুক্তিতে তাদের দায় এড়িয়ে চলেছে। তারা বলছে, ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আমদানি করতে অন্তত ১৬টি পক্ষ জড়িত থাকে। এদের মধ্যে রয়েছে—ইন্টারনেট ট্রানজিট (আইপি ক্লাউড), বিদেশি ডাটা সেন্টারের ভাড়া, দেশি-বিদেশি ব্যাকহল চার্জ, ল্যান্ডিং স্টেশন ভাড়া, কেন্দ্রীয় সার্ভারের পরিবহন খরচ, গেটওয়ে ভাড়া, আইএসপি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, এনটিটিএন প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক ভাড়া, ইন্টারনেট যন্ত্রাংশের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ধার্য করা ভ্যাট ও শুল্ক, বিটিআরসির রাজস্ব ভাগাভাগি ইত্যাদি। ফলে সব পক্ষের চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই তাদের ইন্টারনেটের দাম বাড়াতে হয়। অন্যদিকে মোবাইলের গ্রাহকদের কাছে কম দামে ইন্টারনেট-সেবা পৌঁছে দিতে বিটিআরসি কর্তৃপক্ষ কয়েক দফা মোবাইল ইন্টারনেটের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দাম বেঁধে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো বাস্তবায়ন হয়নি।

এসব কারণে ইন্টারনেট তথা প্রযুক্তির ব্যবহার করতে গিয়ে প্রায়শই সাধারণ মানুষকে বেগ পেতে হচ্ছে। ধীরগতির ইন্টারনেট প্রবাহ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রেখেছে। এতে সারা বিশ্বের ন্যায় অনলাইন জগতে মুক্ত বিচরণ সম্ভব হচ্ছে না, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অন্যতম বাধা। তাই অন্যান্য দেশের মতো প্রযুক্তির উত্কর্ষতা কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশকে ডিজিটাল করতে ইন্টারনেট সমস্যার সমাধান করা সময়ের দাবি।

n লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়