অর্থনীতিতে নারীর অবদান ও প্রতিবন্ধকতা

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২১, ২১:১৮

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ হলেও বর্তমানে কৃষি থেকে বেরিয়ে শিল্পের দিকে ঝুঁকছে। এর সঙ্গে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে শিল্প ও নগরায়ণের দিকে। ফলে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে। নারীরা গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন শহরের দিকে। শহরে গড়ে উঠছে কলকারখানা, পোশাকশিল্প, সেবাশিল্প ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে বাড়ছে শিক্ষিত, স্বল্পশিক্ষিত ও দক্ষ নারীর চাহিদা। বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় ১০০ ঃ ১০০। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ কোটি ২২ লাখ নারী। বর্তমান পৃথিবীর অর্থনীতিতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নারী শক্তির চাহিদা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে নারীরা অবদান রাখছেন। পোশাক খাতে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে এবং মোট গার্মেন্টস কর্মীর প্রায় ৫৪ শতাংশ নারী। এই খাতে নিয়োজিত নারী কর্মী দেশের শিল্প খাতে নিয়োজিত নারী কর্মীর ৭০ শতাংশ।

প্রবাসী আয়ে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী,  ১৯৯১ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৬ জন নারী প্রবাসে কাজ করতে গেছেন। প্রবাসী আয় প্রাপ্তির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে সপ্তম। প্রবাসী আয়ে নারীরা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সহায়তা করছেন। কৃষিতে এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমশক্তি নিয়োজিত। দেশের জনসংখ্যার অধিকাংশ এখনো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট কর্মক্ষম নারীর মধ্যে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক কৃষিকাজে নিয়োজিত। নারী শ্রমশক্তির ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়োজিত কৃষিকাজে। বিবিএসের ২০১৮ সালের তথ্যমতে, দেশের কৃষি খাতে নিয়োজিত নারী আছেন প্রায় ৯০ লাখ ১১ হাজার।

চা-শিল্প, সেবাশিল্প ও বাংলাদেশের শাসন সার্ভিসেও দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী শক্তি নিয়োজিত আছে। চা-বাগানে কাজ করা মোট শ্রমিক ১ লাখ ২২ হাজারের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী সেবা খাতে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, সংখ্যায় প্রায় ৩০ লাখ নারী এ খাতে কর্মরত আছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের শাসন ক্যাডারে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী কর্মরত আছেন। তাদের সংখ্যা প্রায় ২৬ শতাংশ। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চলতি বছরের হিসাব অনুযায়ী ১৪৯ জন ইউএনও  ছাড়াও বর্তমানে ১০ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি), ৩৮ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) এবং ১৭৩ জন সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে কর্মরত আছেন। সচিবের মধ্যে ১১ জন নারী। ৫১১ জন অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে ৮৩ জন, ৬৩৬ জন যুগ্ম-সচিবের মধ্যে ৮১ জন নারী।

নারীরা যেমন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক পরিবার আছে, যারা মনে করে নারীদের বাড়ির বাইরে যাওয়া উচিত নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীরা যেসব পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে কাজ করেন, সেসব পরিবেশ-পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে নয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি প্রবল বৈষম্য করা হয়। ফলে তারা আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েন। নারীরা অনেক সময় পুরুষের চেয়েও বেশি সময় কাজ করে সমান মজুরি পান না। অনেকে আবার যৌন হয়রানির মতো ঘটনার শিকার হন।

বিশাল এই নারী শক্তিকে যদি অর্থনীতিতে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হয়, তাহলে তাদের জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা স্বল্প শিক্ষিত হয়েও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন। আবার সঙ্গে সঙ্গে তাদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার হার আরো বাড়াতে হবে। এর ফলে এগিয়ে যাবে দেশ, কমবে নারীর প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়ন।

n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়