১৪০ প্রজাতির মাছের কোনোটিই আর নেই
সৈয়দ আবদুল ওয়াজেদ, চট্টগ্রাম অফিস
গত সাড়ে তিন দশকে মাছশূন্য হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের প্রাণ প্রবাহিনী কর্ণফুলী নদী। মোহনা থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত এখন আর জেলেদের মাছ ধরতে দেখা যায় না। মাত্রাতিরিক্ত বহুমুখী দূষণ, চট্টগ্রাম বন্দর, জ্বালানি তেলের জেটি, মোহনার কাছাকাছি দুটি সার কারখানা থেকে কর্ণফুলীতে রাসায়নিক বর্জ্য নিক্ষেপ, সময়মতো ড্রেজিংয়ের অভাবে নদীর নাব্য হ্রাস এবং নদীর পানিতে ক্রমাগত বর্জ্যকণা বৃদ্ধি পাওয়াকেই মাছশূন্যতার জন্য দায়ী করছেন পরিবেশ ও প্রাণী বিজ্ঞানীরা। ১৯৮৬-৮৭ সালের পর্যবেক্ষণ গবেষণায় দেখা গেছে, কর্ণফুলী নদীতে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছের আনাগোনা রয়েছে। কিন্তু এখন কালুরঘাটের কাছে পোয়া আর ফাইশ্যা ছাড়া আর কোনো মাছ পাওয়া যায় না।
নদী ব্যবহারে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের অবসান না হলে এই কর্ণফুলীকে শুধু মাছই নয় আর কোনো জলজ উদ্ভিদের বিকাশ হবে কি না, এ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্ণফুলী নদীতে সাম্প্রতিককালে লবণাক্ততা বৃদ্ধির হারও অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়েছে। এই নদীর পানিতে মাছ ও জলজ উদ্ভিদ জন্ম নিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টির অনুকূল ধারা এখন প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত। তারা বলছেন, বন্দর চ্যানেল হিসেবে এই নদীতে জাহাজ ও জলযানের চলাচল গত দুই দশকে প্রায় দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব জাহাজ ও জলযান থেকে পোড়া তেল মবিলসহ নানা ক্ষতিকর পদার্থ প্রায়শ নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। ফলে নদীর পানিতে একদিকে যেমনি দূষিত কণা (টারবিডিটি) বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে পানিতে মাছ ও জলজ উদ্ভিদ জন্মানোর অনুকূল উত্স অক্সিজেনের পরিমাণ ব্যাপকহারে হ্রাস পেয়েছে। এই পানিতে আগে নদী পাড়ের লোকেরা গোসল করতেন। কিন্তু এখন পানি দূষণের কারণে এই নদী ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত দুই দশক আগেও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা চট্টগ্রামের নদীর পানি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ পরীক্ষণ রিপোর্ট প্রকাশ করতেন। কিন্তু বর্তমানে এই রিপোর্টও নিয়মিত আসছে না জনসমক্ষে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, কর্ণফুলী নদী এখন একটি জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীবিহীন মৃত নদীতে পরিণত হয়েছে। তারা বলেন, এই নদীর পানিতে সাম্প্রতিক সময়ে লবণাক্ততা বৃদ্ধির পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। পানি বিজ্ঞানীরা চলতি বছরই কয়েক দফা জানান, কর্ণফুলীতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে জোয়ারের সময় চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক মত্স্য প্রজনন স্থল হালদা, সাঙ্গু নদীসহ আরো অনেক শাখা নদী ও খালে লবণাক্ত পানির প্রবেশ ঘটছে। ফলে উজান ও অতিউজানে মিষ্টি পানির নদী ও খালগুলোতে মাছ ও জলজ উদ্ভিদের জন্য অত্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা চলতি বছর হালদা নদীতে কর্ণফুলী থেকে আসা লবণাক্ত পানির অতি সঞ্চালনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেন, অতিসত্বর কর্ণফুলী নদীর খননকার্য সম্পাদন করে নদীটিকে পানি ধারণের জন্য উপযোগী করে তুলতে হবে। পাশাপাশি এই নদীর দুই পাশে যে দূষণ বিস্তার ঘটছে তা রোধে একটি জাতীয় টাস্কফোর্সের মাধ্যমে আশু উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে মাছশূন্য কর্ণফুলী নদীর মতো দুরবস্থা অন্যান্য নদীগুলোতেও বিস্তৃত হতে থাকবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া ইত্তেফাককে বলেন, এক সময় কর্ণফুলী নদীতে এক প্রজাতির ইলিশ মাছও শিকার করতেন জেলেরা। এই মাছ সারা দেশে পাঠানো হতো। কিন্তু নদীতে অনুকূল পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ায় আশির দশকের শুরু থেকে ঐ বিশেষ প্রজাতির কর্ণফুলী নদীর ইলিশ আর দেখা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, ১৯৮৬-৮৭ সালে কর্ণফুলী নদীতে প্রায় ১৪০ প্রজাতির মাছের আনাগোনা ছিল। তিনি বলেন, এখনো কর্ণফুলীর উজানে হালদাসহ বিভিন্ন নদীতে জেলেরা কেচকি, রুই, কাতল, কালিবাউশ, মৃগেল ইত্যাদি মাছ পেয়ে থাকেন। কিন্তু কর্ণফুলী নদীর অধিকতরও উজানে কালুরঘাট এলাকায় বর্তমানে ফাইশ্যা ও পোয়া মাছ জাতীয় দুই ধরনের মাছ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে আহরণের আর কোনো মাছ পাওয়া যায় না।
