সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

মানুষের কল্যাণের জন্য আল্লাহ হয়তো আমাকে বাঁচিয়েছেন

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২১, ২৩:০৬

নজরুল ইসলাম :প্রধানমন্ত্রী, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আপনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে এক ডজনের ও বেশি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয় এবং এই হামলায় আপনি প্রাণে রক্ষা পেলেও দলের ২২ নেতাকর্মী সেদিন নিহত হন, আহত হন প্রায় ৫০০ মানুষ। এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কী?

শেখ হাসিনা :দেখুন, বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে একটি সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বাংলা ভাই সৃষ্টি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, বোমা হামলা প্রভৃতি ঘটনা ২০০১ সালের অক্টোবর থেকে শুরু করে ২০০৬ সাল পর্যন্ত চলতে থাকে। যখন সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে গ্রেনেড হামলা করা হয় এবং সেই হামলায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার আহত হন এবং তিন/চার জন লোক মৃত্যুবরণ করেন তখন এই হামলা বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি খুব খারাপভাবে নষ্ট করে। তখনই আমরা সন্ত্রাসবিরোধী একটি র্যালি করার একটি সিদ্ধান্ত নিই এবং যখন সেই র্যালি আমরা করতে চেয়েছিলাম রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে, কিন্তু আমাদের অনুমতি দেওয়া হয় নাই। পরে আমরা প্রস্তুতি নিলাম, ঠিক আছে, আওয়ামী লীগ অফিসের সামনেই করব। হঠাত্ তার আগের দিন রাত সাড়ে ১১টায় তারা আবার পারমিশন দেয়। কিন্তু তখন আমাদের মাইক লাগানো হয়ে গেছে, প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন, কাজেই সেখানেই আমরা আমাদের সমাবেশটা করি।

আমি যাই এবং বক্তব্য রাখি এবং বক্তব্য রেখে মাইকটাও হাত থেকে রাখতে পারিনি, এরই মধ্যে বোমার আওয়াজ। শব্দ শুনেই আমাদের নেতাকর্মীরা আমাকে ধরে বসিয়ে দেয়। বিশেষ করে, হানিফ ভাইয়ের কথা আমি বলব (সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ)। মামুন, আমার সঙ্গে কাজ করত, নজীব—সে ছুটে আসে, মায়া—তখন ট্রাকের ভেতরেই ছিল। ট্রাকের ভেতরেই সবাই আমাকে একদম ঘিরে রাখে। প্রথমে তিনটা তারপরে তিনটা এভাবে এক ডজনের কাছাকাছি গ্রেনেড তারা ছুড়ে মারে।

তখন সত্যি কথা বলতে কি, নিজের কথা চিন্তার চেয়েও বেশি চিন্তা হচ্ছিল এতগুলো মানুষ আমরা ট্রাকের ওপরে, তারপর চারদিকে আমাদের নেতাকর্মীরা সবাই। সে সময়কার যে কী অবস্থা কিছুই বুঝতে পারছি না। একটা পর্যায়ে যখন গ্রেনেড হামলা একটু থামল, তখন দেখলাম, সিটি মেয়র হানিফ ভাই, যিনি আমাকে ঘিরে রেখেছিলেন সমস্ত স্প্লিন্টারগুলো তার মাথা এবং গায়ে পড়েছে এবং ঐ রক্ত আমার কাপড়ে চলে আসে। সবাই ভেবেছে আমি বোধ হয় আহত, তাই আমাকে ধরে ওঠাতে গেল আমি বললাম, না, আমার কিছু হয়নি। এটা আমার কাছে একটা বিস্ময় যে আমার গায়ে একটা ও স্প্লিন্টার লাগেনি। কিন্তু আমার চশমা হারিয়ে যায়।

সেখান থেকে আমার গাড়িতে ঠিক যখন উঠতে যাব, আমার গাড়ির দরজাটা খুলে দাঁড়িয়েছিল আমার সাথেই একজন সেনা কর্মকর্তা মাহবুব, ও ছিল আমার ড্রাইভার কাম সিকিউরিটি। ও গেটটা খুলে দাঁড়ায় আর ঠিক সে সময়ে সেখানে একটা গুলিও চলে আসে এবং মাহবুব গুলিবিদ্ধ হয়ে সেখানেই মারা যায়। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে সে সময় চলে আসি, পুলিশ সেখানে লাঠিচার্জ করে এবং টিয়ার গ্যাস মারে। সেটা আমি আবার পরে জানতে পেরেছি, সে সময় জানতে পারিনি।

আমাদের পার্টির ভলান্টিয়ার যারা সমাবেশের আগে প্রত্যেকটি ছাদে অবস্থান করে, কিন্তু সেদিন কাউকেই ছাদে থাকতে দেওয়া হয়নি। পুলিশ বাধা দিয়েছে। অর্থাত্ আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার যে ব্যবস্থাটা নিই, সেটাও তারা করতে দেয়নি।

অনুভূতির কথা আমি এটুকুই বলব—আল্লাহ হয়তো জীবনটা বাঁচিয়ে রেখেছেন। হয়তো আমার হাত দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের কিছু কল্যাণ করবেন সেজন্যই বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তাছাড়া আর কি!

নজরুল ইসলাম :এই নৃশংসা হামলা ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। যেভাবে এর ছক কষা হয়েছে তাতে মনে হয়েছে পুরো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে ধ্বংস করার জন্য এই হামলা করা হয়েছিল। এর কারণ কী?

শেখ হাসিনা :তার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতির পিতার হাতে গড়া, আওয়ামী লীগকে নিয়েই তিনি (বঙ্গবন্ধু) বাংলাদেশের মানুষকে সংগঠিত, ঐক্যবদ্ধ করেছেন, প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বিজয় অর্জন করেছেন।

যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ছিল, যারা পাকিস্তানি সরকারের সাপোর্ট করেছে বা পদলেহন করত, তারা তো কখনো এ দেশের স্বাধীনতাটাই চায়নি। তাই আওয়ামী লীগের ওপর তাদের ক্ষোভ।

নজরুল ইসলাম :বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং হামলা-পরবর্তী তাদের আচরণ ছিল অত্যন্ত অমানবিক, বিশেষ করে তখনকার সরকারপ্রধান খালেদা জিয়ার কথাবার্তা, আলামত নষ্ট করা, তদন্তের নামে প্রহসন, জজ মিয়া নাটক ইত্যাদি তাদের এই আচরণকে আপনি কীভাবে আখ্যায়িত করবেন?

শেখ হাসিনা :আমি বলব খালেদা জিয়ার এক একটা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কিন্তু মেসেজ যায়। সে যখন বক্তৃতা দিল—আওয়ামী লীগ ১০০ বছরেও কোনো দিন ক্ষমতায় আসতে পারবে না; এই ২১ আগস্টের আগে তার বক্তৃতা—শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, বিরোধী দলের নেতাও কোনো দিন হতে পারবে না—এই যে বক্তব্য, তার মধ্য থেকেই তো বোঝা যায়—তাদের উদ্দেশ্যটা কী ছিল। আর এর সাথে যে সরকারের সব জড়িত ছিল তাতো খুব স্পষ্ট। তার (খালেদা জিয়ার) ক্যাবিনেটের মন্ত্রী সালাম পিন্টু—সে এর সাথে জড়িত, তখনকার ডিজিএফআই, এনএসআইয়ের কর্মকর্তারা, পুলিশের কর্মকর্তা তাদেরকে নিয়েই কিন্তু এই চক্রান্তটা করে এবং সব থেকে বড় কথা হচ্ছে তারেক রহমান। সে এই চক্রান্তটা দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করেছে এবং কার্যকরে সব থেকে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। খালেদা জিয়া তো নিশ্চয়ই তার পেছনে ছিল এবং তাকে সমর্থন দিয়েছে।

গ্রেনেড হামলার পরে একটি গ্রেনেড যেটি বিস্ফোরিত হয় নাই, সেই গ্রেনেডটা সেনা অফিসার একজন নিয়ে যায় এবং সে বলল যে এটা রেখে দিতে হবে, এই মামলায় কাজে লাগবে; কিন্তু আমি শুনেছি এই কথা শোনার পর খালেদা জিয়া নিজেই তাকে ধমক দিয়ে বলেছে, এটা করা যাবে না এবং সেটা ধ্বংস করে দেওয়া হয়। সিটি করপোরেশন থেকে গাড়ি নিয়ে এসে ঘটনাস্থল ধুয়ে মুছে সব আলামত সরিয়ে ফেলে। সাধারণত পুলিশ সেখানে যায় রেড টেপ দিয়ে সমস্ত আলামত সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করে। সে রকম কোনো প্রচেষ্টা ছিল না, বরং সব আলামত ধ্বংস করে দেওয়ার, মুছে ফেলার চেষ্টা। আর এটা যখন করে তখন আমি সাথে সাথে আমাদের যুবলীগের নানক ছিল, আযম ছিল, ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বললাম—ওরা এগুলো ধ্বংস করছে, তোমরা শিগিগর যাও, এগুলো সংরক্ষণ করো, চেষ্টা করো। যেখানে গ্রেনেড পড়েছিল পরে ওরা সেখানে গিয়ে ঐ জায়গাগুলোকে অন্তত চিহ্নিত করে। এরপর তদন্ত কমিশনের নামে একটা তামাশা হলো। মানে একটা তদন্ত কমিশন হলো, সে দেখল কী, পাশের দেশ থেকে এসে এ ঘটনা ঘটিয়েছে।

আমাদের দলের এতজন এমপি আহত। আইভি রহমান, তিনি নিহত হয়েছেন; আরো অনেক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন, অনেক জন এমপি আহতাবস্থায় চিকিত্সাধীন, আমরা যারা ছিলাম কথা বলতে চেয়েছিলাম, কথা বলতে দেবে না পার্লামেন্টে। আলোচনাই করতে দেবে না। খালেদা জিয়া তো বলেই বসল ওনাকে আবার কে মারতে যাবে? তার এবং তার নেতাদের বক্তব্য হচ্ছে—উনি তো নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি তো ব্যাগ ছাড়াই মঞ্চে উঠেছি। তাহলে গ্রেনেডটা নিলাম কীভাবে। আর গ্রেনেড মারতে এতটা পারদর্শীই-বা হলাম কীভাবে। আর এটা হলো আর্জেস গ্রেনেড, যেটা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। আর এটা পাকিস্তান থেকেই আসা, যেটা তদন্তে পরে বের হয়েছে। কাজেই সবকিছুতেই যে তাদের সম্পৃক্ততা সেটা তো বোঝাই যায়। এবং ঐ দিন খালেদা জিয়া কোথায় ছিল? খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া কিন্তু ঢাকায় ছিল না। একজন লক্ষ্মীপুরে আর একজন গোপালগঞ্জে।

নজরুল ইসলাম : ঐ দিন যদি আপনাকে হত্যার মিশন সফল হতো তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা হতো আফগানিস্তানের মতো, মৌলবাদীরা এ দেশ দখল করত। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলার স্বপ্ন অধরাই থেকে যেত, আপনার অভিমত কী?

শেখ হাসিনা :সবাই এটা বিশ্বাস করে। কারণ ঐ সময় খালেদা জিয়ার আমলেই যেভাবে সন্ত্রাসীদের মদত দেওয়া হয়েছে, রাজশাহীতে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে বাংলা ভাই মিছিল করেছে আর পুলিশ তাদের পাহাড়া দিচ্ছে, আর বিএনপি নেতারা এদের মদত দিচ্ছে। পরবর্তীতে জঙ্গিবাদ যেভাবে বিস্তার লাভ করে কিবরিয়া সাহেবের জনসভায় গ্রেনেড হামলা করে তাকে হত্যা করা হলো। সুরঞ্জিত সেনের মিটিংয়ে বোমা হামলা হলো, সিলেটে কামরানের মিটিংয়ে আরেকবার বোমা, গ্রেনেড হামলা হলো, শুধু তাই নয় এভাবে সারা বাংলাদেশে চলছিল। ১৭ আগস্ট একটা দিনে সারা বাংলাদেশের ৫০০ জায়গায় বোমা হামলা হলো। আমাদের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টি জেলায় কিন্তু বোমা হামলা হয়েছে এবং ঢাকা সিটিতে ৩৫ জায়গায় বোমা হামলা হয়। সে সময় আমি টুঙ্গিপাড়া। আমি ঢাকায় চলে আসলাম। আপনাদের একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করতে বলি। একমাত্র মুন্সীগঞ্জে তখনো কিন্তু বোমা হামলাটা হয় নাই। আমার কিন্তু মুন্সীগঞ্জ থেকেই আসার কথা ছিল। তবে, আমি এসেছিলামও মুন্সীগঞ্জ দিয়ে, এটা ঠিক; কিন্তু ওরা সময়টা হিসেব করতে পারে নাই। কারণ, আমার রওনা হওয়ার কথা টুঙ্গিপাড়া থেকে বিকাল ৩টার থেকে ৪টার দিকে এবং আমি মুন্সীগঞ্জ পৌঁছাতে বিকাল ৫টা-৬টা বাজবে; কিন্তু আমি রওনা হয়ে গিয়েছি ১১টায়। ঐ খবর পাওয়ার সাথে সাথে আমি সাড়ে ১১টার মধ্যে রওনা হয়ে গিয়েছি। আমাকে অনেকে ফোনে মানা করেছে যে ঢাকার সব জায়গায় বোমা। কোথায় যে বোমা পড়বে ঠিক নাই। আপনি এই সময় মুভ করবেন না, আপনি থাকেন। আমি বলি এই সময় আমাকে ঢাকায় যেতেই হবে। ঢাকায় না থাকলে তো আমি কিছু করতে পারব না। আমি সরাসরি রওনা হয়ে চলে আসি। ওটাও যদি কেউ একটু চিন্তা করে যে, সব জেলায় হলো ওখানে হলো না। কারণ, নিশ্চয়ই তাদের ওটা একটা প্ল্যান ছিল যে আমি যখন আসব, পার হবো তখন ওখানেই হবে, মারবে বা কিছু করবে। কারণ, আমার যে সময় ফেরি ধরার কথা আমার জন্য তো ফেরি স্পেশাল থাকল ওটার একটা হিসাব তাদের ছিল; কিন্তু, আমি তার আগেই চলে এসেছি। নরমাল যেই রাস্তা দিয়ে আসি সেভাবে না এসে আমি সোজা বিডিআরের ভেতর দিয়ে ঢুকে সুধা সদনে ঢুকি।

বিএনপি আমলে তো একটা সন্ত্রাসী দেশ করেই ফেলেছিল এবং এতে বহু লোক তালেবানের ট্রেনিং নিয়ে চলে যায় আফগানিস্তানে। সেই মুফতি হান্নান নিজেই তো ট্রেনিং নিয়ে এসেছে। তারপর এই তাজউদ্দিন, আরেক জন যে সেও তো ট্রেনিং নেওয়া। এ তো সব বিএনপির লোক। তাজউদ্দিন তো বিএনপির খাস এবং গ্রেনেড হামলার পরপর ঐদিন রাত্রে রাত ১১টার সময় চার জনকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসে তুলে দেয়। বিশেষ ব্যবস্থায় তারা চলে যায় এবং সেখানে কিন্তু ডালিম আর রশীদও ছিল।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হত্যার সাথে যে জিয়াউর রহমান জড়িত এবং তার স্ত্রী যে তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে এবং ছেলেকেও সেই একই পথে নামিয়েছে, এটা তো স্পষ্ট।

নজরুল ইসলাম : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শুধু ২১ আগস্ট নয় আপনাকে হত্যার জন্য ২০ থেকে ২২ বার হামলা করা হয়েছে। এই যে এতবার আপনার ওপর হামলা, এত আক্রোশ কেন আপনার ওপর? এরা কারা?

শেখ হাসিনা :হ্যাঁ, বারবার আঘাত এসেছে। সেই ’৮১ সালে আমি বাংলাদেশে নামার পর থেকেই আমার ওপর হামলা হচ্ছে। আর আল্লাহ আমাকে কীভাবে যেন বাঁচিয়ে দিচ্ছেন। হয়তো আল্লাহ সবার জন্য কিছু কাজ লিখে দেয়। হয়তো আমার ওপরে এই দায়িত্বটা আছে যে এই বাংলাদেশটাকে যেই মর্যাদাটা হারিয়ে গেছে সেই মর্যাদাটা ফিরিয়ে দেওয়া। আর এই যে গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য আমার আব্বা যে কাজ করতে চেয়েছিলেন সেটা যেন হয়। এটাই বোধহয় আল্লাহর ইচ্ছা। আর সেটা যেন আমার হাত দিয়ে হয়। আল্লাহ সেটা চাচ্ছিলেন বলেই বারবার আমাকে হামলা থেকে বাঁচিয়েছেন এবং এই যে আমি যতটুকু সফলতা অর্জন করছি বা যতটুকু বাংলাদেশের জন্য করতে পারছি বা বাংলাদেশের গরিবের জন্য করতে পারছি—এটাও আমি মনে করব যে একদিকে আমার দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অপরদিকে বাংলাদেশের জনগণ এবং ওপরে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের ইচ্ছায়। এটাই হলো বাস্তবতা। তা না হলে আমার তো এ দেশে থাকার কথা না।

এখানে খুনিরা অবাধে চলছে। জিয়াউর রহমান তাদের পুরস্কৃত করেছে। তাদেরকে সংসদ সদস্য করা হয়েছে। তাদেরকে সব রকমের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে। সেই খুনিদের একজনকে প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যান্ডিডেট করা হয়েছে। যেখানে এই রকম অবস্থা, রশীদকে খালেদা জিয়া এমপি বানাল। রশীদ এবং হুদাকে সংসদ সদস্য বানিয়ে নিয়ে আসল। ফারুককে এরশাদ প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যান্ডিডেট করল। জিয়াউর রহমান তাদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে, কূটনৈতিক মিশনে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করল। সেই দেশে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থাকে? এরা তো বাংলাদেশটাকেই জঙ্গি রাষ্ট্র করতে চেয়েছিল।

যাই হোক, আমি দেশবাসীকে এটা বলব যে, তাদের সচেতন থাকতে হবে। আমরা ঐ আফগান হতে চাই না। বাংলাদেশ বাংলাদেশই হবে। বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। হ্যাঁ, আল্লাহ যত দিন হায়াত দিয়েছেন তত দিন বেঁচে থাকব। মৃত্যু তো অবধারিত। ‘জন্মিলে মরিতে হবে, / অমর কে কোথা কবে, চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে?’ এটা তো কবি বলে গেছেন। আর সেটাই আমি মনে করি। আজকে মরি, কালকে মরি, সবই আল্লাহর ইচ্ছা। কাজেই, এ নিয়ে আমার কোনো চিন্তা, কোনো দুশ্চিন্তা নাই। আমি একটাই চিন্তা করি, সকালে উঠে ভাবি—একটা দিন পেলাম। অন্তত দেশের মানুষের জন্য একটু কাজ করতে পারব। ব্যস, এইটুকুই।

নজরুল ইসলাম : আপনার ওপর এতবার হামলা হলো। এসব হামলা, হুমকি, ধমকিকে আপনি তোয়াক্কা না করে আপনার লক্ষ্য থেকে আপনি বিচ্যুত হননি। এই যে শক্তি, এতটা সাহস, এটা কোত্থেকে পেলেন? এর উত্স কী?

শেখ হাসিনা :এটা আমার আব্বার কাছ থেকে শিখেছি। মার কাছ থেকে শিখেছি। এই দেশের যে মানুষ ক্ষুধার্ত, তাদের ছিন্ন কাপড়, তাদের ঘর নাই, তাদের চিকিত্সা নাই, তাদের শিক্ষা নাই। আমি ’৮১ সালে এসে সারা বাংলাদেশ যখন ঘুরেছি—ঐ একই দৃশ্য, ঠিক যেই দৃশ্য দেখে আমার বাবা এই দেশ স্বাধীন করেছিলেন। কিন্তু তাকে তো করতে দেওয়া হলো না। একটা যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ গড়ে তুলে তিনি যখন দেশটাকে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, সেই সময় কিন্তু ঘাতকের দল হত্যাটা করল। কারণ, তারা দেখল যে এই বাংলাদেশকে আর থামানো যাবে না। তাকে শেষ করে দিল, অর্থাত্ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে শেষ করতে পারলেই আটকানো যাবে। ঠিক সেটাই হলো। ২১টা বছর বাংলাদেশের মানুষের কী অবস্থাটা ছিল। কোনো পরিবর্তন তো হয়নি। তার পরে আমরা সরকারে আসার পর থেকে যখন কাজ করেছি, আস্তে আস্তে সেই বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

এখানে শক্তি ও সাহসটা হচ্ছে, এটা আমার মনের শক্তি, যেটা ছোটবেলা থেকে বাবা-মায়ের কাছে শেখা। আর আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছি সব সময়। আর বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি বা তাদের যেই সমর্থনটা আমি পেয়েছি। কারণ বাবা-মা ভাই-বোন সব হারিয়ে যখন একা আসলাম, (’৮১ সালে বাংলাদেশে ফেরার সময়) আমার ছোট দুটো বাচ্চাকে আমি রেহানার কাছে দিয়ে আসলাম। একজন ১০ বছরের, একজন ৮ বছরের। তাদের তো মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত করেছি। আমি আসলাম বাংলাদেশের জনগণের জন্য।

আমি বলব যে আমার শক্তি বাংলাদেশের জনগণ। আমার শক্তি বাংলাদেশের জনগণ, আমার সাহস আল্লাহ রব্বুল আলামিন। আর শিক্ষা আমার বাবা-মায়ের।

নজরুল ইসলাম : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ২১শে আগস্ট যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের পরিবারবর্গ বা যারা আহত হয়েছিলেন, তাদের জন্য আপনারা কী কী কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন?

শেখ হাসিনা :প্রত্যেকের চিকিত্সার ব্যবস্থা করা, যারা মারা গিয়েছে সেই পরিবারকে সাহায্য করা। ধন্যবাদ সেই সময় যারা এগিয়ে আসছেন, আমাদের ফান্ডে টাকা দিয়েছেন এবং আমরা আলাদা একটা অ্যাকাউন্ট করে সবাইকে সাহায্য করা। তা ছাড়া সব চিকিত্সার জন্য দেশে-বিদেশে পাঠিয়ে পাঠিয়ে আমরা সব চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছি। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে আমি তাদের এখন পর্যন্ত চিকিত্সার জন্য টাকা দিয়ে যাচ্ছি। অনেক পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছি। যারা মারা গেছে, ঢাকা শহরে তাদের সবাইকে ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছি। তাছাড়া যারা নিজের দেশে আছে, সে দেশে ঘরবাড়ি তৈরি করে দেওয়া তাদের জীবন-জীবিকার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা। সব রকম সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে পরবর্তীতে যারা আহত ছিল অনেকেই মারা গেছে। কিন্তু তার পরও তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য যা যা সহযোগিতা করার আমরা করে যাচ্ছি।

নজরুল ইসলাম : আজকে ২১ অগস্টের এই বিয়োগান্তক দিনে দেশবাসীর উদ্দেশে কিছু বলুন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা :দেশবাসীকে আমি এটাই বলব যে, হ্যাঁ, আমি বেঁচে আছি ব্যস এটাই সত্য। আর যতক্ষণ বেঁচে আছি, দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাব। কারণ আমি তো দেশের মানুষের কাছে ওয়াদা দিয়েছি, যেভাবে এই বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আমার বাবা-মা জীবন দিয়ে গেছেন, এ দেশের মানুষের জন্য আমি সেভাবে আমার জীবন দিতেও সব সময় প্রস্তুত। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। ওপরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন, তাকেই ভয় করি এবং তারই দোয়া আর জনগণের সমর্থন। জনগণের দোয়া নিয়েই আমি চলি। কাজেই আমার এই পথ চলায় আমার একটাই লক্ষ্য যে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করে এই বাংলাদেশকে একটা উন্নত, সমৃদ্ধ, সুখী বাংলাদেশ করব, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন আমর বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব দেখেছিলেন। সেটাই আমি করতে চাই।

কাজেই, সেক্ষেত্রে দেশবাসীর সহযোগিতা চাই, দোয়া চাই এবং সবাই ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন সেটাই আমি চাই। (সংক্ষেপিত)