হতাশা, ব্যর্থতা আত্মসম্মানহানি, সম্পর্কের টানাপোড়া, যৌন হয়রানি, আর্থিক সংকট, পারিবারিক কলহসহ নানা কারণে ব্যক্তি আত্মহত্যায় প্ররোচিত হয়। বাংলাদেশ, নেপাল, কেনিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশে আত্মহত্যার চেষ্টা ও প্ররোচনা আইনত অপরাধ হলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ মতে, সারা বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে প্রায় দশ লাখ মানুষ আত্মহত্যার করছে; যা এ বিশ্বের জন্য এক অশনি সংকেত! বাংলাদেশেও আত্মহত্যা জাতীয় জীবনে অনন্য এক উত্কণ্ঠার কারণ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ১১ হাজার; যা ২০১৯ এ ১০ হাজার ছিল। আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যাকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ঘটনা বলে মনে হলেও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের মতে, আত্মহত্যা একটি সামাজিক সমস্যা এবং সামাজিক অস্থিরতার সাপেক্ষেই ব্যক্তি আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়।
বিশেষত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম ১৮৯৭ সালে ‘দ্য সুউসাইড’ গ্রন্থে বিষদভাবে আত্মহত্যাকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি আত্মহত্যা সংঘটিত হওয়ার পেছনে চারটি কারণকে দায়ী করেন। এগুলো হলো- এক. আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা, সামাজিক সংহতি যখন দুর্বল হয়ে যায় এবং ব্যক্তি সমাজ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে তখন এ ধরনের আত্মহত্যা বেশি সংঘটিত হয়। সাধারণত শহরের আত্মহত্যাগুলোতে আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যার হার অনেক বেশি হয়। দুই. পরার্থপর আত্মহত্যা, দেশপ্রেম; মানবপ্রেম বা অন্য কোনো পরিস্থিতিতে ব্যক্তি যখন প্রয়োজনের তুলনায় নিজের জীবনকে তুচ্ছ মনে করে তখন এ ধরনের আত্মহত্যা ঘটে। তিন. নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা, ব্যক্তি যখন সামাজিক মূল্যবোধকে পরোয়া না করে নিজ ইচ্ছায় পরিচালিত হয় তখন এ ধরনের আত্মহত্যা বেশি সংঘটিত হয়। মহামারি, দুর্যোগ বা সামাজিক বিশৃঙ্খলার পরিপ্রেক্ষিতে এমন আত্মহত্যার জরিপ বেড়ে যায়। বাংলাদেশেও করোনা মহামারিতে আত্মহত্যার পরিমাণ বেড়ে গেছে। আঁচল ফাউন্ডেশন এর তথ্য মতে, ২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৪ হাজার ৪৩৬ জন ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে, যার অধিকাংশই শিক্ষার্থী যারা হঠাত্ গৃহবন্দি পরিস্থিতি ও প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি। আর চার. হতাশামূলক আত্মহত্যা ব্যক্তি যখন স্বপ্ন পূরণে হতাশ হয় বা লক্ষ্য অর্জনে নিরাশ হয়ে পড়ে এবং নিজে নিজেকে শেষ করে তখন হতাশামূলক আত্মহত্যা পরিলক্ষিত হয়। বছর জুড়ে হতাশামূলক আত্মহত্যার সংখ্যাই অনেক বেশি। এ চারটি কারণের মাঝে পরার্থপর আত্মহত্যা অনেকটা ইতিবাচক হলেও বাকি তিনটি জনস্বাস্থ্যমূলক সমস্যা, যা সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
অতি সত্বর এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। আত্মহত্যার কারণ নিরূপণে গবেষণাধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা নিরসন করা অত্যাবশ্যকীয়। বেকারত্ব দূরীকরণ, আর্থিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণ, মহামারি মাঝেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রয়াস বাস্তবায়নসহ সামাজিক অন্যান্য সমস্যা রোধ করে আত্মহত্যাকে প্রতিহত করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। উন্নত দেশে মানসিক সমস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে কাউন্সিলিং সেবা নিশ্চিত করা হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নানা জটিলতায় মানসিক স্বাস্থ্য বরাবরই উপেক্ষিত থেকে যায়। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশব্যাপী মানসিক সেবার হটলাইন চালু ও কাউন্সিলিং সেবা নিশ্চিত করা একান্তই প্রয়োজন। পাশাপাশি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সিলর নিয়োগ করা উচিত বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে করে কম বয়সি শিক্ষার্থীরা নিজেদের সমস্যাসমূহ উত্তরণের সঙ্গে মানসিকভাবেও শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠবে। সর্বোপরি প্রয়োজন নিজেকে ভালোবাসা। সারা দিনের ব্যস্ততা শেষে ব্যক্তি যদি নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখে এবং পছন্দনীয় কাজ করে তবে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়। এছাড়া, পুঁজিবাদী এ সমাজে প্রযুক্তির আড়ালে প্রকৃতির কাছাকাছি অবস্থান করেও মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রেখে আত্মহত্যার প্রবণতাকে কমানো যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, দিনে অন্তত ২০ মিনিট প্রকৃতির দিকে চোখ রাখলে মানসিক অস্থিরতা ও হতাশা, ব্যর্থতা, গ্লানি অনেকাংশে কমে যায় এবং ব্যক্তির কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়। তাই মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসব নিয়ম মেনে আনন্দপূর্ণ উপায়ে জীবনকে পরিচালিত করা প্রয়োজন। এতে করে আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে সমাজ, সমৃদ্ধ হবে দেশ ও জাতি।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
