তদন্তে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত

মিরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সাসপেন্ড, এমপিও স্থগিত

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২১, ০০:১৭

বিভিন্ন কাজে দুর্নীতি এবং কলেজ ফান্ড থেকে অর্থ আত্মসাত্সহ নানা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রাজধানীর মিরপুর কলেজের অধ্যক্ষ মো. গোলাম ওয়াদুদের এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে কলেজের গভর্নিং বডি এই অধ্যক্ষকে সাময়িক বরখাস্তও করেছে। অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় গোলাম ওয়াদুদের বিরুদ্ধে মামলা করারও নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে কলেজটির গভর্নিং বডির সভাপতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক শরিফ এনামুল কবির কলেজের সার্বিক অনিয়ম ও দুর্নীতিবিষয়ক কোনো প্রশ্নের উত্তর দেননি। শুধু মামলার বিষয়ে বলেন, ‘মামলা করার আমি কে?’

নানা অভিযোগে মিরপুর কলেজ সরেজমিনে পরিদর্শন করে মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) একটি তদন্ত দল প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। এর আলোকেই ব্যবস্থা নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তর।  তদন্তে এই অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মোট ৩৪টি আর্থিক ও প্রশাসনিক অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ আগস্ট তার এমপিও স্থগিত করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর। আর গত শনিবার তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

যেসব অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে ডিআইএ

অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদের ঢাকায় নিজের নামে তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। তার নামে ডাকঘর ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের প্রমাণ মিলেছে। এর সঙ্গে তার আয়ের কোনো সংগতি পাওয়া যায়নি। কলেজের তহবিল থেকে অধ্যক্ষ দুই ধাপে মোট ৮ লাখ টাকা নিয়েছেন। এ টাকা তিনি আত্মসাত্ করেছেন। এ টাকার কোনো ভাউচার পায়নি তদন্ত দল।

নিজের নিয়োগই ছিল অবৈধ

অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদের নিয়োগও ছিল অবৈধ। তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এমপিও নীতিমালা (৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ প্রণীত মার্চ ২০১৩ পর্যন্ত সংশোধিত) লঙ্ঘন করে পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় অধ্যক্ষের নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

পথসভার ব্যয় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা : পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী পথসভায় ব্যয় দেখানো হয় প্রায় ১৮ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, যা আত্মসাতের শামিল। শান্তি পতাকা বাবদ ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা বিধিমতো ব্যয় করা হয়নি। কলেজ কর্তৃপক্ষের আয়োজনে ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি বই বিতরণ সমাবেশে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৫ টাকার ভাউচারটিও সন্দেহজনক বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

উপ-কমিটিকে সম্মানী ১২ লাখ : কলেজের উন্নয়ন উপ-কমিটিকে সম্মানী বাবদ ১২ লাখ ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সরকারকে ভ্যাট দিয়েছে ৪৫ লাখ ৪৮ হাজার ২১৮ টাকা, যা কলেজের রেজিস্টার বা কোনো নথিতে উল্লেখ নেই। এ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়নি।

নগদ হাতে রেখে ব্যয় ২৪ কোটি ২৬ লাখ টাকা : একজন অধ্যক্ষ সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নগদ খরচ করতে পারেন। এর বেশি খরচ করতে হলে তাকে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে খরচ করতে হবে। কিন্তু অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদ মোট ২৪ কোটি ২৫ লাখ ৯৩ হাজার টাকা নগদ ব্যয় করেছেন, যা বিধিবহির্ভূত। এছাড়া কলেজের বেশ কয়েকটি খাতে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।

গরমিল ৫ কোটি টাকায় : কলেজের আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ব্যাপক গরমিল পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। কলেজের লিখিত আয়ের মধ্যে ৫ কোটি ২৪ লাখ ৬ হাজার ৩৫৭ টাকার গরমিল রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরি বাবদ ১ লাখ ১ হাজার ৬০০ টাকার কোনো ভাউচার নেই। এটা আত্মসাত্ করা হয়েছে।

আরো যা আত্মসাত্ : অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদ ২০১৮ সালে কলেজ তহবিলের ২ লাখ টাকা হিসাবরক্ষক লরেন্স পলাশের কাছ থেকে গ্রহণ করেন, যা আত্মসাত্ হিসেবে গণ্য। বিধিবহির্ভূতভাবে দেওয়া পারিতোষিকের ১২ লাখ ৩৩ হাজার ৫৭ টাকা আদায়যোগ্য। নির্মাণ খাতে ব্যয় হওয়া ৬ লাখ ৮০ হাজার টাকার ভাউচার গ্রহণযোগ্য নয়, তাই তা আত্মসাত্ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। নির্মাণ ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় হওয়া ৫৮ লাখ ৩২ হাজার টাকার ভাউচারের অভিযোগ সম্পর্কে কোনো রেকর্ড পায়নি তদন্ত কমিটি।

কমিটি বলছে, অন্য একটি কাজে বিধিবহির্ভূতভাবে ১০ লাখ ১৭ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যা আত্মসাত্। বিধিবহির্ভূতভাবে ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার ফার্নিচার তৈরির কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৪ হাজার টাকা আত্মসাত্ হিসেবে গণ্য হবে। শিক্ষাসফরে ব্যয় হওয়া টাকার মধ্যে ৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা আত্মসাত্ হিসেবে গণ্য হবে। লিপি ফার্নিচার মার্টকে ১৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হলেও বিলটি চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়নি। যা অনিয়ম। 

কলেজটির প্রাক্তন অধ্যক্ষ ইসহাক হোসেনকে অবৈধভাবে সরিয়ে ২০১৩ সালে অধ্যক্ষ পদে মার্কেটিং বিভাগের প্রভাষক গোলাম ওয়াদুদকে বসিয়ে দেন প্রয়াত সংসদ সদস্য আসলামুল হক। সংসদ সদস্যের ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়েই অধ্যক্ষ ক্যাম্পাসে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছেন। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে এতদিন শিক্ষক ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এখন এসব অভিযোগের প্রমাণ পেল শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

অধ্যক্ষ মো. গোলাম ওয়াদুদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তিন দিন সময় দিয়ে ডকুমেন্ট চেয়েছে। কিন্তু এত অল্প সময়ে আমি সব ডকুমেন্টস দিতে পারিনি। এখন আমার কাছে সব ডকুমেন্টস রয়েছে। আমি সব দেখাতে পারব।’ পুনঃ তদন্তের জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরে চিঠি দিয়েছেন বলে জানান তিনি।