প্রখ্যাত গীতিকবি গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা একটি বিখ্যাত গান আজও দুই বাংলার মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। গানটির কথাগুলি ছিল এরকম বিশ্বকবির সোনার বাংলা/ নজরুলের বাংলাদেশ/ জীবনানন্দের রূপসী বাংলা/ রূপের যে তার নেই কো শেষ। আবার রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও বহু বছর কাটিয়েছেন বাংলাদেশে, কর্মসূত্রে। এক কথায় বাংলাদেশের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছিল এক নিবিড় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সম্প্রতি হঠাত্ এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষা মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. সুভাষ সরকার, খোদ রবি ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বভারতীর এক অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানে তার পাশে ছিলেন বিশ্বভারতীয় উপাচার্য বিদ্যুত্ চক্রবর্তী। কী করেছেন, কী বলেছেন সেদিন ডা. সুভাষ সরকার। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া থেকে নির্বাচিত এই বাঙালি বিজেপি সাংসদ ও মন্ত্রী বিশ্বভারতীর সেদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন শিক্ষানীতি ব্যাখ্যা করতে। সেই অনুষ্ঠানে অপ্রাসঙ্গিকভাবে হঠাত্ এক অদ্ভুত মন্তব্য করে বসেন তিনি। বলেন, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে বর্ণবৈষম্যের চল ছিল। রবীন্দ্রনাথের গায়ের রং কালো ছিল, তাই তাকে তার মা কোলে নিতেন না। এমন উদ্ভট রুচিহীন মন্তব্য করার সময় তার পাশেই ছিলেন বিশ্বভারতীয় উপাচার্য বিদ্যুত্ চক্রবর্তী স্বয়ং। তিনিও এ কথার কোনো বিরোধিতা করেননি। স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এই বেফাঁস মন্তব্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে আশ্রমিক থেকে শুরু করে বিশ্বভারতীর সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। ক্ষিপ্ত হয়েছেন শিক্ষাজগতের মানুষ থেকে আমজনতা সকলেই। অনেকেই ডা. সুভাষ সরকারের রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকারের মতো মানুষও।
এ প্রসঙ্গে একটি জরুরি কথা বলা প্রয়োজন। ডা. সুভাষ সরকার হলেন আরএসএসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। আর সেদিন তার পাশে উপবিষ্ট উপাচার্য মশাইও আরএসএসের শিক্ষায় বড় হয়েছেন। যেহেতু বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার চলছে আরএসএসের কথাতেই, তাই তাদের কথায় আরএসএসের প্রভাব স্পষ্ট। আরএসএসের মতো একটি হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক সংগঠন, যারা বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে দেশের সুস্থিতি নষ্ট করতে চাইছে, অশান্ত করতে চাইছে বাংলাকেও, তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই এ ধরনের মন্তব্য করে বিতর্ক তৈরি করতে চাইছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত। সদ্যসমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রী বাংলায় এসে বাংলার মনীষীদের নিয়ে নানা মন্তব্য করেছেন। তার অধিকাংশই ভুলে ভরা, ভিত্তিহীন। মানুষের মন জয় করতে রবীন্দ্রনাথের মতো বড় বড় দাড়ি রেখে ধুতি-পাঞ্জাবি পরে ঘুরেছেন। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। বিজেপির বাংলা দখলের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে। এত কিছুর পরেও তাদের শিক্ষা হয়নি। এখনো বাংলায় এসে, বাংলায় বসে এখানকার মনীষীদের নিয়ে উলটোপালটা কথা বলে চলেছেন আরএসএস-বিজেপির ধ্বজাধারীরা, যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হলো ডা. সরকারের এই হাস্যকর মন্তব্য। আর তার পরও খোদ বিশ্বভারতীর উপাচার্যের এই নীরবতা কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মন্তব্যকে সম্মতি দিয়েছে ধরেই নেওয়া যায়।
মজার কথা হলো, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী যেখানে বলছেন, রবীন্দ্রনাথের গায়ের রং কালো ছিল বলে মা তাকে কোলে নিতেন না, সেখানে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই অন্য কথা বলেছেন। ‘জীবনস্মৃতি’র ‘ছেলেবেলা’য় রবীন্দ্রনাথ তার শৈশবের দিনগুলির এক অসামান্য বর্ণনা দিয়েছেন। সেখান থেকেই জানা যায়, শৈশবে মাকে খুব বেশি পাননি ঠিকই কিন্তু রাত পর্যন্ত রামায়ণ গান শুনে ভূতের ভয় কাটাতে মায়ের ঘরেই যেতেন ছোট্ট রবি। কখনো আবার শরীর খারাপের অজুহাতে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়া ফাঁকি দিতে মায়ের কাছেই আবদার করতেন। সরস ভঙ্গিতে তিনি লিখেছেন ছেলেবেলায় মাটি মেখে পালোয়ানের সঙ্গে প্যাঁচ কষার পরে ছেলের গায়ের রং মেটে হওয়া নিয়ে মায়ের উত্কণ্ঠার কথা। মা শিশু রবিকে বাদামবাটা, সর, কমলালেবুর খোসাবাটা মাখাতেন। মা-ছেলের চিরন্তন সম্পর্কের আন্তরিক ছবিটা রবি ঠাকুরের নিজের লেখাতেই অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলা’ যদি পড়তেন আরএসএস-শিক্ষিত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, জানতে পারতেন ছেলের প্রতি কী অসম্ভব ভালোবাসা ছিল সারদা দেবীর। একটু লেখাপড়া করে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যদি কথা বলতেন, এমন মন্তব্য করতে তার মুখে আটকাত অবশ্যই। কিন্তু সমস্যা হলো, আরএসএস-বিজেপির প্রচারকরা পড়াশোনা করতে চান না অথচ নিজেদের স্বঘোষিত পণ্ডিত বলে দাবি করেন। ফলে সত্যিকারের শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কাছে উপহাসের পাত্র হয়ে ওঠেন।
বিশ্বভারতীয় বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক প্রবীণ আশ্রমিক আলপনা রায় চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া, ‘রবীন্দ্রনাথের মা তাকে কোলে নিতেন না, এভাবেই এই কথাগুলো বলা যায় না। আর তিনি কতটা কালো বা ফর্সা ছিলেন, এ সব আলোচনা আদৌ জরুরি নয়।’ বিশ্বভারতীর আরেক অধ্যাপকের কথায়, ‘সবাইকে সব জানতে হবে এমন কোনও কথা নেই। কিন্তু বাক্সংযম ও পরিমিতিবোধ থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের নেতা-মন্ত্রীদের মধ্যে এর অভাব রয়েছে।’
মনীষীদের নিয়ে ভুল ও বিভ্রান্তিমূলক মন্তব্য অবশ্য আরএসএস-বিজেপির কাছে নতুন নয়। বাংলায় এসে বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, শরত্চন্দ্রকে নিয়ে অনেক হাস্যকর মন্তব্য এর আগেও করেছেন বিজেপি নেতারা। অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মাতঙ্গিনী হাজরাকে অসমের বাসিন্দা বলে উল্লেখ করেছেন। যে মাতঙ্গিনী মোদিনীপুরের একজন প্রাতঃস্মরণীয় মুক্তিযোদ্ধা, একটি শিশুও তাকে চেনে, তাকে অসমের মানুষ বলে বসলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী।
যা-ই হোক, মূল কথা হলো বরেণ্য মনীষীদের নিয়ে বেঠিক ও বেফাঁস মন্তব্য করলে কী হয়, ইতিহাসে তার উদাহরণ আছে। দুই বাংলাও তার সাক্ষী। ছয়ের দশকে স্বৈরাচারী সামরিক শাসক আইয়ুব খান পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। বাঙালি তা মেনে নেয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা এর প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিলেন। গর্জে উঠেছিল সমগ্র বাঙালি জাতি।
অতএব ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া দরকার আজকের আরএসএস-বিজেপির। না হলে এমন ধরনের বেফাঁস মন্তব্যের ফলে তাদের ভোটব্যাংকে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। ভোটের রাজনীতি করতে আসা বিজেপি এসব কথা বলে নিজের পায়েই কুড়ুল মারছে। বুঝতে পারবে যখন, ততদিনে হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে।
n লেখক :ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক
