আমাদের উন্নয়নের প্রেরণা

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২১, ০০:১৬

বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের প্রতিষ্ঠা। এই অর্জনের অনন্য রূপকার বঙ্গবন্ধু। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা হূদয়ের গভীরতম স্থানে ঠাঁই দিয়েছি। কারণ তিনি দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে অজস্র দুর্গম বাধা অতিক্রম করে স্বাধীন-স্বার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন। তাকে বলা হয় ইতিহাসের মহানায়ক। তিনি এমন কিছু ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে বিশ্ববাসী তাকে নিপীড়িত, বঞ্চিত মানুষের নেতা বলে মনে করে। যুগ যুগ ধরে তিনি বঞ্চিত, নিপীড়িত, মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের প্রেরণা জুুগিয়ে যাবেন। এ রকম নেতা ক্ষণজন্মা। বঙ্গবন্ধু জীবন উত্সর্গ করে গেছেন এ দেশের মানুষের মুক্তির কল্যাণে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন অবিচল। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা। তাই অনেকে মনে করেন, ‘জীবিত বঙ্গবন্ধুর চেয়ে পরপারের বঙ্গবন্ধু অনেক বেশি শক্তিশালী।’

বঙ্গবন্ধু একজন ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠান, একটি আন্দোলন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সর্বদা তার ছিল বলিষ্ঠ উচ্চারণ। একটি স্বাধীন জাতি নির্মাণের কারিগর। বাংলাদেশ নামক মহাকাব্যের অমরগাথা, একটি দীর্ঘ ইতিহাস, আন্দোলন—একবাক্যে শেখ মুজিবুর রহমানের নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সারসংক্ষেপ।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু নিহত হতে পারতেন। তিনি সেটা জানতেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালে বন্দিজীবন যাপনের সময়ও তিনি নিহত হতে পারতেন, যেমন হয়েছিলেন সহবন্দি সার্জেন্ট জহুরুল হক। কিন্তু মৃত্যুর চেয়ে দেশের মুক্তি, জনগণের মুক্তির কথাই ভেবেছেন সব সময়। ২৫ মার্চ ১৯৭১ বিকেলেই তিনি জানতে পেরেছিলেন যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে এবং পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন তিনি তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন, কিন্তু তিনি নিজে তার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে পালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানালেন। ২৫ মার্চের কালরাতে যখন পাকিস্তানি বাহিনী রাজারবাগ পুলিশলাইনস, পিলখানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ করে, তখন বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় ঘোষণা আসে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে, অর্থাত্ ২৬ মার্চ ওয়ারলেসে ভেসে আসে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা।

হ্যান্ডবিল আকারে বিলি করা ঘোষণাটি ছিল এরকম :বাংলাদেশের জনগণ ও বিশ্বের জনগণের প্রতি ২৬.০৩.৭১ তারিখে জিরো আওয়ারে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী অকস্মাত্ পিলখানায় ইপিআর দপ্তর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনস আক্রমণ করেছে। ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে এখনো যুদ্ধ চলছে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জনগণ বীরত্বের সঙ্গে শত্রুসেনার বিরুদ্ধে লড়ে চলেছে। বাংলাদেশের প্রতি সেক্টরকে প্রতিরোধ করার নির্দেশ দেওয়া হলো। আল্লাহর করুণা আপনাদের ওপর বর্ষিত হোক। তিনি যেন স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনাদের সাহায্য করেন।

জয় বাংলা

স্বাক্ষর

মুজিবুর রহমান

 

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে দেশের আপামর জনগণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে এগিয়ে এসেছিল শত্রুর মোকাবিলা করতে। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত ক্ষণ। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশের ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত  লাল-সবুজের পতাকায় লেখা হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। বিশ্বে স্বীকৃতি মেলে ৭ কোটি বাঙালির প্রাণ ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গমাইলের বদ্বীপীয় বঙ্গভূমি স্বার্বভৌম বাংলাদেশের।

এরপর শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন দেশের অবকাঠামো উন্নয়নসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়াস। স্বাধীন বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতিসহ সব খাতকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। সোনার বাংলা গড়ার প্রয়াসে নতুন উদ্যমে শুরু করেছিলেন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

কেমন দেশ চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু

১৯৭১ সালের সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শোষণ-বৈষম্যহীন একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, যে কথা স্বাধীনতা ঘোষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। এরপর বঙ্গবন্ধু অতি দক্ষতার সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার কাজটি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেন, যার মূল ভিত্তি ছিল গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রয়াস। সে অনুযায়ী (১৯৭৩-৭৮) বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চমবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী দেশ গঠনে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে সবাই কাজ  করতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতায় উক্ত পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য বিষয়বস্তু ছিল—১. দারিদ্র্য হ্রাস, ২. কৃষি ও শিল্পের পুনর্গঠন ও উত্পাদন বৃদ্ধি, ৩. কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ৪. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্য হ্রাস, ৫. গ্রামীণ উন্নয়ন, ৬. বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস, ৭. খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ৮. প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ৯. জনসংখ্যা হ্রাস, ১০. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ইত্যাদি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশে যেসব সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়, তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের যাবতীয় ইতিহাস ও স্মৃতিচিহ্ন মূল্যবোধ চাতুর্যের সঙ্গে ধ্বংস করে ফেলে। জঘন্যভাবে ইতিহাসকে বিকৃত করে, ধর্ম নিয়ে নোংরা রাজনীতিতে লিপ্ত হয়। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে নির্লজ্জ প্রহসন বর্বরতা আর মিথ্যার বেড়াজালে সত্যকে আড়াল করে ইতিহাস বিকৃতির প্রয়াস চলে। কিন্তু  ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মে সত্য প্রকাশিত হয়  দিবালোকের মতো।

তবে ভরসার জায়গা হলো, জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে দিন-রাত কাজ করছেন। ঘাতকের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডে বাবা-মা-ভাইসহ পরিবারের  আপনজনকে হারিয়ে একবুক বেদনা নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে অনেকবারই বলেছেন, আমার জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। শুধু একটাই চাওয়া, বাংলাদেশের মানুষের সব দুঃখ-কষ্ট দূর করা, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া। এ দেশকে একটি উন্নত সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে।  ২০৪১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে।  তারই অংশ হিসেবে ভিশন-২০২০ পরিকল্পনা গ্রহণ করে তার সফল বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনার সরকার। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) বাস্তবায়ন করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি সেক্টর কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে, শিক্ষার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ফলে বেকারত্বের হার কমেছে। শুধু তাই নয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটিয়ে আধুনিক বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত করার আন্তরিক প্রয়াস  সফলতা পেয়েছে।

২০২০ সালের শুরুতে যখন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করতে নানা আনন্দ আয়োজনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তখন সারা বিশ্বে কোভিড-১৯-এর থাবা। বৈশ্বিক মহামারি করোনায় থমকে যায় পুরো বিশ্ব। এই সংকট মোকাবিলায় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হাল ধরেছেন শেখ হাসিনা। অতি অল্প সময়ের মধ্যে কোভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন ক্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ক্রমান্বয়ে সবাইকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

যে কোনো সংকট, অতিমারি বা মহামারিতে ক্ষয়ক্ষতি অবধারিত। কিছু ক্ষতি আমাদের নিষ্ঠুরভাবে মেনে নিতেই হয়েছে। এটি সময়ের পরীক্ষা। আমরা অনেক গুণীজনকে এই মহামারির কারণে হারিয়েছি, যে ক্ষতি কখনো পূরণ হওয়ার নয়। এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে আমাদের আরো কিছুদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু হাজার বছর বেঁচে থাকবেন বাঙালির হূদয়ে। বিশ্বের ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন। পৃথিবীতে বাংলাদেশের মানচিত্র যত দিন থাকবে, লাল-সবুজের পতাকা যত দিন থাকবে, তত দিন বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হবে সগৌরবে।

শোকের মাস আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গমাতা ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ সব শহিদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। তোমাদের রক্তের ঋণ বাঙালি চিরকাল বয়ে যাবে। পিতা তোমায় হূদয়ের গভীর থেকে শ্রদ্ধা জানাই। তোমার আদর্শ ছড়িয়ে যাক প্রতিটি বাঙালির হূদয়ে। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম বেড়ে উঠুক জাতির পিতার জীবনাদর্শে, সেই প্রত্যাশা।

n লেখক :পুলিশ কর্মকর্তা