বরিশালকাণ্ডে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতি

প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্নমত-সমালোচনা

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২১, ২২:৩৮

বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বাসভবনে হামলার ঘটনার পর প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া বিবৃতির বিষয়ে সচিবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা দ্বিমত পোষণ করছেন। গত রবিবার অনুষ্ঠিত বিভাগীয় কমিশনারদের বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সচিব বিবৃতিতে ব্যবহূত ভাষা বিশেষ করে ‘রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন’ শব্দটির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। বৈঠকে এমনও বলা হয়, ইউএনওর পক্ষে যেখানে সরকার সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে, সেখানে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন শব্দটি ব্যবহার করায় পুরো পরিস্থিতি কর্মকর্তাদের বিপক্ষে চলে যায়। এখন পর্যন্ত ১৭ জন ইউএনও এবং এসসি ল্যান্ড ‘রাজনৈতিক হেনস্থার’ শিকার হলেও এসব ক্ষেত্রে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম গতকাল সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়ে দেন অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া বিবৃতির ভাষা ভুল ছিল, গ্রহণযোগ্য নয়। এর সঙ্গে সচিবরা একমত নন। অ্যাসোসিয়েশনও এখন তার অবস্থান থেকে সরে এসেছে।  

প্রসঙ্গত গত ১৮ আগস্ট রাত ১০টায় বরিশাল সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক শামীমের পক্ষে ১৫ আগস্ট উপলক্ষ্যে লাগানো ব্যানার-ফেস্টুন অপসারণ করতে যান সিটি করপোরেশনের কর্মী পরিচয়ে একদল যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। এ সময় অনুমতি ছাড়া সরকারি দপ্তরে প্রবেশে বাধা দেন কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা। একপর্যায়ে ইউএনও মো. মুনিবুর রহমান সেখানে উপস্থিত হলে তার সঙ্গে তর্কে জড়ান যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মীরা। তারা ইউএনওর বাসভবনে ঢুকে হামলার চেষ্টা চালালে আনসার সদস্যরা গুলি করেন। এ নিয়ে রাত ২টা পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পালটা ধাওয়া হয়।

এ ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলাতেই ১ নম্বর  আসামি করা হয় বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে। গত ২০ আগস্ট ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের জুম মিটিং হয়। এ সময় সংগঠনের সভাপতি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবীর বিন আনোয়ার, মহাসচিব ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ ঢাকার বাইরে থেকে জুম মিটিংয়ে যোগ দেন। ঐ রাতে সভাপতির স্বাক্ষরে পাঠানো বিবৃতিতে সাদিক আবদুল্লাহর গ্রেফতারসহ কড়া প্রতিবাদ করা হয়।

অ্যাসোসিয়েশনের সভায় যোগ দেওয়া একজন সিনিয়র সচিব ইত্তেফাককে বলেন, ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হবে মর্মে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হলেও তার ভাষা বা প্রতিবাদলিপির কোনো খসড়া বৈঠকে অনুমোদিত হয়নি। ১৭টি বানান ভুল আর রাজনীতির বিরুদ্ধে আঙুল দেখানের ঔদ্ধত্য গোটা প্রশাসনকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

উল্লেখযোগ্য কি ছিল বিবৃতিতে : বরিশালের মেয়র যার অত্যাচারে সমগ্র বরিশালবাসী অত্যন্ত অতিষ্ঠ সেই সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর হুকুমে ইউএনওর বাসায় হামলার ঘটনা ঘটেছে। অতএব বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ  সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অবিলম্বে তার গ্রেফতার দাবি করছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে। সেই সঙ্গে এসব রাজনৈতিক দুর্বৃত্তকে আইনের মাধ্যমে মোকাবিলার কথাও বলা হয়।

বিবৃতি প্রকাশের পর থেকেই তা সচিবালয়সহ সারা দেশে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা সমালোচনার মূল বিষয়ে পরিণত হয়। সরকারি কর্মচারীরা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কি না, এ রকম প্রশ্নও করেন অনেকে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘বরিশালের ঘটনা সরকার গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা দেখছি যে, একটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে এগুলো শুরু হয়। এ বিষয়ে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে মাঠ প্রশাসনকে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকেও বলে দেওয়া হয়েছে, ক্যাবিনেট থেকেও বলে দেওয়া হয়েছে।’

‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা জনপ্রতিনিধি সবাইকে বলা হয়েছে—আপনারা নিয়মিত ইন্টারঅ্যাকশন (মতবিনিময়) করবেন। ইন্টারঅ্যাকশন যেখানে কম হয়, সেখানেই এ ধরনের মিস কমিউনিকেশনের বিব্রতকর ঘটনাগুলো ঘটে।’

খন্দকার আনোয়ারুল বলেন, ‘এগুলো যাতে আর না ঘটে, সেজন্য বরিশালের কমিশনারকে বলা হয়েছে আপনারা নিজেরা আগে বসেন। বসে দেখেন কী সমাধান করা যায়। আপনারা সমাধান করতে না পারলে, আইন তো আছেই। আপনারা দেখেন এসব ঘটনা কেন ঘটছে?’

তিনি বলেন, ‘বরিশালের প্রকৃত ঘটনা কী, আমরা জানি না। আমরা আগে তাদেরই দায়িত্ব দিয়েছি, নিজেরা বসেন। সব লেভেলেই বলা হয়েছে। কেন সবাইকে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। কার কোথায় ফল্ট আছে নিজেরা দেখেন। দেখা যাক, তারা সময় নিয়েছেন, নিজেরা আগে দেখি।’

অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে—এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘গতকাল একটা মিটিং ছিল, সেখানে আমি যখন কথা বলছি... সচিবরা এবং অন্য কর্মকর্তা যারা ছিলেন তারা সবাই এ বিবৃতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। এই ভাষা হওয়া উচিত ছিল না। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের যারা ছিলেন তারাও একমত পোষণ করেছেন—এ ধরনের ভাষা ব্যবহার ভুল হয়েছে। এ ধরনের ভাষা ব্যবহার শোভনীয় নয়।’