ইহা আধাসামন্তবাদী সমাজের চালচিত্র

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২১, ২০:৪৮

এই চিত্রটি শুধু মৌলভীবাজারের নহে, কমবেশি সারা দেশেই আছে। ইত্তেফাকের খবর অনুযায়ী মৌলভীবাজারের বড়লেখায় কাটা গাছ, বাঁশ এমনকি জীবন্ত গাছকে খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করিয়া বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হইয়াছে। শুধু গ্রামগঞ্জেই নহে, অনেক সময় শহরের উন্নয়নশীল এলাকায়ও এই চিত্র পরিলক্ষিত হয়। ইহা যে কত বড় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তাহা মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনায় হতাহতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। অনেক সময় বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এই পরিস্থিতি বিরাজ করিলেও পাকা খুঁটির ব্যবস্থা করা হয় না। এইভাবে বিদ্যুত্সংযোগ দেওয়ার কোনো বিধান নাই। কিন্তু স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর জোরাজুরি ও তদবিরে এই লাইন দেওয়া হয়। নিয়মে নাই, তাহার পরও অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করা হয়। বিদ্যুত্ বিভাগের কর্মকর্তাদের দোষ দিয়া লাভ নাই। অনেক সময় এইরূপ অনিয়মে যখন খোদ মন্ত্রী প্রশ্রয় দেন, তখন তাহাতে বিস্মিত হইবার কোনো সীমা থাকে না। এই ক্ষেত্রে যুক্তি দেখানো হয় যে, একবার বাঁশ ও গাছের মাধ্যমে বিদ্যুত্সংযোগ দেওয়া হইলেও পরবর্তী সময়ে ঠিকই স্থায়ী খুঁটির ব্যবস্থা করা হইবে। ইহাকে প্রগ্রেসিভ ডেভেলপমেন্ট হিসাবে বিবেচনা করা হইলেও প্রকারান্তরে ইহা যে একটি আধাসামন্তবাদী সমাজব্যবস্থারই প্রতিফলন, তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নিয়ম চলিবে নিয়মের মতো। সেইখানে আশ্রয়-প্রশ্রয় বা ছাড় দিবার প্রশ্ন উঠিবে কেন? মুখের কথাই যদি বিধান হয়, তাহা হইলে নিয়ম তৈরি করিয়া লাভ কী? দেখা যায়, এমন অসহায় ও প্রান্তিক ব্যক্তিদের বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হইয়াছে, যাহারা  বিদ্যুত্ বিল পরিশোধে অক্ষম। যাহারা বিদ্যুত্ বিল দিতে পারিবে না, তাহাদের বাসায় বিদ্যুত্সংযোগ কেন দেওয়া হইবে? সরকারি কর্মকর্তারা অনেক সময় ভাবিয়া চিন্তা করিয়া কাজ করেন না। তাহারা মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধিদের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া কাজ করেন। সেই নির্দেশ কতটা আইনানুগ ও নিয়মমাফিক হইল, তাহা অনেক সময় বিবেচনা করা হয় না। ইহা ডেভেলপিং কান্ট্রি বা উন্নয়নশীল দেশের এক মারাত্মক সমস্যা। ইহা আধাসামন্তবাদী সমাজেরও বহিঃপ্রকাশ। কাজির গরু কিতাবে থাকে, গোয়ালে থাকে না। ঠিক তেমনই নিয়মকানুন খাতা-কলমে আছে, বাস্তবে নাই। বাস্তবে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কথাই ফাইনাল বা চূড়ান্ত। চেয়ারম্যান বলিয়াছেন, তাই সেভাবেই চলিতেছে সকল কিছু।

তাহার কথাই যেন আইন। এই দিকে পারিবারিক বা সামাজিক বিরোধ-বিসম্বাদ দেখা দিলে মানুষ থানার দ্বারস্থ হইলেও দেখা যায় অনেক সময় ওসি সাহেব মামলা নিতে গড়িমসি করেন, জিডি করিতে দেন না। আবার উপর হইতে চাপ দেওয়া হইলে ঠিকই মামলা হয়, জিডি হয়। তাহার মানে আইন তাহার নিজস্ব গতিতে চলিতেছে না। ইহা আধাসামন্তবাদী সমাজের অন্যতম চিত্র। ইহা অবশ্যই বদলাইতে হইবে। কেননা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আধাসামন্তবাদেরই-বা কেন অস্তিত্ব থাকিবে?

আধাসামন্ততন্ত্র (Quasi-feudalism) হইল পুরা সামন্তবাদী নহে, আংশিক বা আপাতসামন্তবাদ। সামন্তবাদের গর্ভে পুঁজিবাদের সূচনার পর বিভিন্ন উপায়ে সামন্তবাদ ক্ষয় হইতে থাকে। ইহাই আধাসামন্তবাদের রূপ লাভ করে। তবে এখানে আধা মানে ৫০ শতাংশ নহে। এইরূপ সমাজব্যবস্থায় জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হইলেও জমির মালিকানার ক্ষেত্রে পুঁজিবাদীরা প্রাধান্যে আসেন না। জোতদারদের প্রভাব বজায় থাকে। তবে বাংলাদেশে প্রতিদিন যেই সকল ঘটনা ঘটিতেছে, তাহাতে কি এই দেশকে আধাসামন্তবাদী দেশ হিসাবেও বিবেচনা করিবার অবকাশ আছে? তাহার চাইতেও আমরা যেন নিম্ন স্তরে নামিয়া যাইতেছি। এই ধরনের সমাজ পরিচালনা বলিতে গেলে একেবারে অসম্ভব। এইরূপ সমাজে নিয়মকানুন যে আছে তাহা অনেক সময় মানুষ জানেনই না। এই পরিস্থিতির অবশ্যই উন্নতির বিধান করিতে হইবে।