আমরা সবাই শিশুদের সুস্থ দেখতে ও নিরাপদে রাখতে চাই। কিন্তু কিছু বিপত্তির কারণে সব সময়ই তা হয়ে ওঠে না। সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের জন্য অটিজম তেমন একটি বিপত্তি। এই বিপত্তি মা-বাবার জন্য অন্য একধরনের চ্যালেঞ্জ। পূর্বধারণার অভাবে বিষয়টি নিয়ে আমাদের মতো দেশে এই বিপত্তি আরো বেশি। শিশুর জন্মের সময় অটিজমের লক্ষণ বোঝা যায় না। কিছুদিন বা দু-এক মাস পরেও অনুমান সহজ হয় না। অন্তত কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়। অন্যদিকে অটিজম রোগ কি না, এই ধারণাও মা-বাবাকে বিব্রত করে। তাছাড়া রয়েছে বিষয়সংক্রান্ত কিছু মিথ। এটি বিষয়টিকে আরো বেশি প্রলম্বিত করে। আলোচনায় অটিজম কোনো রোগ নয় তেমন কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।
অটিজম কোনো রোগ নয়। অটিজম হলো একধরনের ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার বা বৈকল্য। আমাদের সাধারণদের জানা না থাকলেও ডাক্তার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পরিচর্যাদানকারীদের অজানা নয় যে, আন্তর্জাতিকভাবেই রোগ নির্ণয়ের কিছু গাইডলাইন রয়েছে। এই গাইডলাইনের সাহায্যেই কোনটি রোগ বা রোগ নয়, তা নির্ধারণ করেন। যেমন—‘ডায়বেটিস’ নির্ণয়ের বেলায় রয়েছে রক্ত পরীক্ষাসহ কিছু সাধারণ টেস্ট। রোগ নির্ণয়ে এই ধাপগুলো অনেকটাই সরাসরি। কিন্তু ডেভেলপমেন্টাল অথবা আচরণিক বিষয়গুলোর বেলায় এখন পর্যন্ত রক্ত পরীক্ষা কিংবা এক্সরের মাধ্যমে নির্ণয় করার ধাপে আসেনি। তাই অটিজম নির্ণয়ের বেলায় গাইডলাইনে ফোকাসের নির্দেশ রয়েছে শিশুর ডেভেলপমেন্টাল বা বিকাশ ইতিহাস জানার। সেই সঙ্গে লক্ষ করা দরকার তার আচরণগত দিকের নিরীক্ষণ। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে অটিজম নির্ণয়ের আরো কিছু স্কেল ও গাইডলাইন যোগ হয়েছে। এ রকম ধারণা থেকেও বলা হয়, অটিজম কোনো রোগ নয়; একধরনের ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার। কিন্তু অটিজমের ক্ষেত্রে ডিসঅর্ডার বিষয়টিও ১৯৮০ সালের আগে অফিশিয়ালি স্বীকৃতি পায়নি।
অটিজম রোগ নয়; একটি অবস্থা বা কন্ডিশন কিংবা মস্তিষ্কসংক্রান্ত বিষয়—এমনভাবেও বলার প্রচলন রয়েছে। আমরা অনেকেই জানি, অটিজম একধরনের স্নায়ুবৈকল্য। অটিজমের শিকারদের ব্রেন বা মস্তিষ্ক গড়নে ভিন্ন; ভিন্নভাবে কাজ করে। এর অর্থ, এদের সচরাচরের আচরণ অন্যদের মতো নয়। কিন্তু মোটেই ভাববার অবকাশ নেই যে, এই আচরণগুলো করে তারা ভুল করে।
এসব শিশু বা ব্যক্তি সহজে কমিউনিকেট করতে পারে না। এরা অন্যে কী বলছে, সেটি বুঝতে চ্যালেঞ্জ বোধ করে এবং সময় নেয়। অন্যদের মতো সব ধরনের খেলনা নিয়ে এরা খেলতে আগ্রহী হয় না। কিংবা খেললেও সবার মতো করে খেলে না। সবার মতো এরা বন্ধু তৈরি করতে পারে না। অর্থাত্, অন্যের জন্য সহজ হলেও অটিজমের শিকারদের জন্য এই কাজগুলো সহজ নয়। এছাড়া অটিজমের শিকারদের ব্রেন চোখ, কান, নাক, জিহবা, স্পর্শ ও চারপাশ থেকে যে তথ্য বা ইনফরমেশন পায়, সেগুলো অনেক সময় এদের জন্য দুর্বিষহ বা বিরক্তির কারণ হয়। সুতরাং এদের ক্ষেত্রে ব্রেনের কারুকাজে কিছু একটা ভিন্নতা রয়েছে।
অন্যদিকে এখনো অটিজমের সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে অনেকের গবেষণা ও মতামতে স্নায়ু, মস্তিষ্ক, জেনেটিক, পরিবেশ, খাবারদাবার এবং মা-বাবার জীবনাচারের আচার-আচরণ প্রভৃতিকে দায়ী করা হয়েছে। অনেক গবেষক অটিজম কোনো রোগ নয়—এই ব্যাখ্যায় বলতে চেয়েছেন, সাধারণত আমাদের দেহে কোনো ধরনের অসুস্থতা বোধ করলেই বলা হয় রোগ হয়েছে। কিংবা কোনো ব্যক্তির স্বাস্থ্যে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেও বলা হয় রোগ হয়েছে। মানুষ নানা কারণেই অসুস্থতা বোধ করতে পারে। অটিজম একটি রোগ—এমন ধরনের দাবির সমর্থনে বিজ্ঞানীদের হাতে এখনো এমন কোনো প্রমাণ নেই। তাই কারও কারও মতে, অটিজম হচ্ছে অটিজমের শিকারদের মস্তিষ্কের কাঠামোগত তফাতের ফলের ফলাফল।
তবে সবাই একমত, অটিজম জীবনব্যাপী বয়ে নিতে হয় এমন এক ধরনের ডিস-অ্যাবিলিটি। এজন্য আজীবন এদের দরকার হয় যত্ন-আত্তির এবং সাহায্য-সহায়তা। কিন্তু অনেক অটিজমের শিকার শিশু বা ব্যক্তি কোনো রকমের সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে জীবিকার্জন করছে। তবে এই স্বাভাবিকতা নির্ভর করে শিশু বা ব্যক্তির অ্যাবিলিটি ও স্কিলসের ওপর। অথবা এর সঙ্গে নির্ভর করে এই শিশু বা ব্যক্তিকে সক্ষমতার বিষয়গুলো কেমনভাবে রপ্ত করায় সাহায্য করা হয়েছে। এজন্য বলা হয়, সঠিক সময়ে অটিজম শনাক্ত করা গেলে, সঠিক পরিবেশে রাখা গেলে এবং সঠিক ধরনের শিক্ষা পেলে এরা অটিজমের অনেকগুলো উপসর্গই উতরাতে পারে।
n লেখক : সাবেক অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা এবং বর্তমানে টরোন্টো ডিসট্রিক্ট বোর্ডে কর্মরত

