উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির রাজনৈতিক দলসমূহ বরাবরই যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় যাইতে বদ্ধপরিকর। ক্ষমতা এমনই এক আলাদিনের প্রদীপ, যাহার সংস্পর্শে রাতারাতি ভাগ্যের দুয়ার উন্মোচিত হইয়া যায়। ক্ষমতায় থাকিয়া যাহারা ধরাকে সরা জ্ঞান করিয়া থাকেন, তাহাদেরও একসময় ক্ষমতা ছাড়িয়া দিতে হয়, তাহাদের মোকাবিলা করিতে হয় কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু দুনিয়ার কোনো ক্ষমতাই চিরস্থায়ী নহে—এই সত্য কাহারো স্মরণে থাকে না। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে দেখা যায়, যখন যেই রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে তখন তাহাদের ক্ষমতার দাপটে বিরোধী দলগুলি এক প্রকার গর্তে লুকাইয়া পড়ে। আবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটিলে একসময়কার সেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলটিই দাবি করিয়া থাকে ক্ষমতাসীন দলের অত্যাচার, নিপীড়ন, নিষ্পেষণে তাহারা জর্জরিত! স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ক্ষমতা না থাকিলে কেন এত দুর্বল হইয়া পড়ে তাহারা?
আমরা দেখিতে পাই, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে যে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আরোহণ করিয়া বিরোধী দলগুলির উপর অত্যাচার, নিপীড়ন চালাইয়া থাকে। তখন তাহাদের ভাষ্যমতে, বিরোধী দলে থাকাকালীন তাহারাও নিষ্পেষণের শিকার হইয়াছিল। অথচ ক্ষমতায় থাকিতে তাহারা ভাবিয়া দেখে না, সময়ের পরিক্রমায় তাহাদেরও আবার বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে হইবে। পক্ষান্তরে যেই সকল দল একসময় ক্ষমতায় থাকিয়া এখন বিরোধী দল হইয়াছে তাহারাই আবার অভিযোগ তুলিয়া থাকে—ক্ষমতাসীন দল পুলিশ, প্রশাসন, কোর্ট কাচারি বাগাইয়া লইয়া তাহাদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাইতেছে। তাহাদের নামে প্রতিহিংসামূলক মামলা দেওয়া হইতেছে, তাহাদের জমিজমা কাড়িয়া লওয়া হইতেছে, দখলদার আর ক্যাডার বাহিনী শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করিতেছে, তাহারা বিচার পাইতেছেন না, তাহাদের মুখ তুলিয়া দাঁড়াইবার পথটুকুও রুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে ক্ষমতাসীন দল। অথচ তাহাদের কি মনে পড়ে না, একসময় তাহারাও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল, কোথায় গেল তাহাদের সেই ক্ষমতার প্রতাপ! একসময়কার মহাশক্তিধরেরা ক্ষমতার পালাবদলে নিরীহ সাধারণ জনতার কাতারে বিলীন হইয়া যায়। পার্শ্ববর্তী দেশের নিকটতম রাজ্যের রাজনৈতিক গতিবিধির দিকে লক্ষ করিলে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরিয়া ক্ষমতায় থাকা প্রভাবশালী দলটি ক্ষমতা হারাইয়া অভিযোগ করিতেছে, ক্ষমতাসীন দলের গুন্ডা, ক্যাডার বাহিনী তাহাদের উপর নিদারুণ অন্যায়-অত্যাচার করিতেছে, তাহাদের মারধর করিয়া, ঘরবাড়ি ভাঙচুর করিয়া নৈরাজ্যের সৃষ্টি করিতেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলটির দাবি, তাহারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন না, তাহাদের উপরও নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হইয়াছিল। সেইখানেও দেখা যাইতেছে হামলা-মামলা অরাজকতা।
বস্তুত উন্নয়নশীল বিশ্বে রাজনৈতিক দলগুলি ক্ষমতায় আরোহণ করিয়া অতীতকে ভুলিয়া যায়। ক্ষমতার জিয়ন কাঠির স্পর্শে তাহারা ভাবিতে শুরু করেন, তাহাদের এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী। যেইখানে রাজনৈতিক ক্ষমতায় আরোহণ করিয়া তাহাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হইবার কথা ছিল জনগণের উন্নয়ন, দেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সেইখানে তাহাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হইয়া দাঁড়ায় বিরোধী দলগুলিকে দমন, নিপীড়ন করা। দেশ জুড়িয়া দুর্নীতি-অপকর্ম, দরিদ্র অসহায় মানুষের ক্রন্দন, বেকারত্ব, অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নানা সমস্যা বিরাজ করিলেও ক্ষমতাসীন দলগুলি সেই সকল সমস্যা সমাধান না করিয়া যেন কেবল শাসনের বেলাতেই সিদ্ধহস্ত! কবির ভাষায় বলিতে হয়, ‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, প্রতিহিংসার রাজনীতি করিয়া চিরকাল টিকিয়া থাকা যায় না। আজ যিনি ক্ষমতায় থাকিয়া অন্যের উপর খড়্গহস্ত হইতেছেন, ক্ষমতার পালাবদলে কাল তিনি অত্যাচারিত হইয়া তাহার বিরুদ্ধেই অভিযোগ আনিবেন। অর্থাত্, উন্নয়নশীল বিশ্বে কোন নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তি কখনোই নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় না। ইহাই যেন এই সকল দেশের সিস্টেমে পরিণত হইয়াছে। কে অত্যাচারিত হইবে আর কে অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবে তাহা নির্ভর করে ক্ষমতায় কে বা কাহারা থাকিবেন তাহার উপর।
