চোরের মায়ের বড় গলা

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২১, ০০:৫৩

অনিয়ম, জালিয়াতি আর আর্থিক দুর্নীতির কারণে চাকরিচ্যুত উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের এক মাঠ সহকারীর হামলা-হুমকি-হয়রানিতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের ত্রাহী দশা এখন। কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ-অনুশোচনার বদলে উলটা তার চোটপাট ও তর্জন-গর্জনে আক্ষরিক অর্থে ‘চোরের মায়ের বড় গলার’ দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে ভাণ্ডারিয়ায়। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, প্রকৃত অগ্রাধিকারপ্রাপ্তদের বঞ্চিত করে অনিয়মের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসচ্ছলদের করোনাকালীন নগদ প্রণোদনার অর্থ আত্মসাতের পরিপ্রেক্ষিতে বরখাস্ত হওয়া ভাণ্ডারিয়া উপজেলার লাইভস্টক ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট শিবলী রুবায়েত লিয়ন তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের মারধর, হয়রানি এবং হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। মারধরের শিকার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুল আলিম হাওলাদার ও তার ছেলেরা আইনি সুরক্ষা চেয়ে ভাণ্ডারিয়া থানায় একটি জিডি করেছেন। জিডিতে তারা শিবলী রুবায়েত লিয়নকে ১ নম্বর আসামি করেছেন। অন্য আসামিরা হলেন—লিয়নের আত্মীয়স্বজন ও আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে প্রণোদনার টাকা হাতিয়ে নেওয়া কয়েক জন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বরখাস্ত হওয়া লাইভস্টক ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট শিবলী রুবায়েত লিয়ন উপজেলার ১ নম্বর ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের বাঞ্চারখাল এলাকার বাসিন্দা। পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় করোনাকালীন বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) জরুরি কর্মপরিকল্পনার আওতায় উপজেলার সুফলভোগী নির্বাচনের পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা মোতাবেক ৫০৬ জনের তালিকা প্রণয়ন করা হয়। এই তালিকায় স্থান না পাওয়া আর্থিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত ২৫ জনের পক্ষে ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের আবু হানিফ হাওলাদার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগে স্বাক্ষরকারী ২৫ জনের মধ্যে ৫ নম্বর মো. আনোয়ার হোসেনের বাড়ি মঠবাড়িয়া উপজেলার সাফা ইউনিয়নে। বাকিদের অধিকাংশ তেলিখালী এবং অন্যরা ইকড়ি, ভিটাবাড়িয়া, নদমুলা এবং কয়েক জন ভাণ্ডারিয়া সদর, গৌরীপুর, ধাওয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। অভিযোগে তারা বলেন, সুফলভোগীর তালিকায় স্থান পাওয়া ৫০৬ জনের মধ্যে ৮৫ জনের হাঁস, মুরগির খামার বা ডেইরি খামার নেই। তালিকা প্রণয়নের সময় জালিয়াতি, প্রতারণা ও আর্থিক দুর্নীতিসহ অসততার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। কতিপয় অসাধু ব্যক্তি খামারিদের পাওনা অর্থ ভুয়া ব্যক্তিদের নাম ও আইডি কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে জালিয়াতি করেছেন। তারা অভিযোগপত্রে ‘ভুয়া অসচ্ছল হাঁস-মুরগি ও ডেইরি খামারিদের’ নামের তালিকাও সংযুক্ত করেন। ফিল্ড অফিসার হিসাবে এই তালিকার সমন্বয় করেছিলেন ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট শিবলী রুবায়েত লিয়ন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয় যে, ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট লিয়ন নিজের প্রভাব খাটিয়ে নিজ বাড়ি ভাণ্ডারিয়ার ভিটাবাড়িয়া ইউনিয়নের বাঞ্চারখাল এলাকা এবং তার আত্মীয়স্বজনসহ ১৫ জনের নাম অনিয়মের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত করেন। এই তালিকাভুক্তির পর ১৫ ‘ভুয়া অসচ্ছল হাঁস-মুরগি ও ডেইরি খামারি’ আর্থিক প্রণোদনা সুবিধাও তুলে নেন। পরে অভিযোগের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করার জন্য উপজেলা ভ্যাটেরিনারি সার্জন ডা. সোমা সরকার ও লাইভস্টক ফিল্ড অফিসারসহ মোট তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি মাঠ পর্যায়ে চিহ্নিত বাড়ি বাড়ি ঘুরে অভিযোগের আংশিক সত্যতা পায়। পরে গত ২৫ মে তদন্ত রিপোর্ট ভারপ্রাপ্ত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা উপজেলা ভ্যাটেরিনারি সার্জন ডা. সোমা সরকার দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করেন। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত লাইভস্টক ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট শিবলী রুবায়েত লিয়নকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গত জুলাই মাসের শেষ দিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। অতঃপর তার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের ওপর প্রচণ্ডভাবে ক্ষিপ্ত ও মারমুখী হয়ে ওঠেন শিবলী রুবায়েত লিয়ন। তিনি চাকরিচ্যুতির পর আব্দুল আলিম হাওলাদার ও তার ছেলেদের প্রকাশ্যে মারধর করেছেন এবং অন্যান্য যারা অভিযোগ করেছিলেন তাদের দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছেন। এদিকে গতকাল লিয়নের হাতে লাঞ্ছিত ও মারধরের শিকার আবদুল আলিম হাওলাদারের ছেলে দাবি করেন, শিবলী রুবায়েত লিয়নকে শুধু চাকরি থেকে বরখাস্ত করলেই হবে না। এই প্রকল্প থেকে সে যে সরকারি ২ কোটি টাকা আত্মসাত্ করেছে তা উদ্ধার করে সুফলভোগীদের মধ্যে বণ্টনসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।