ভাদ্রমাসের কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম বলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস। ভারতীয় পুরাণে শ্রীকৃষ্ণ এক বিরাট স্থান অধিকার করে আছেন। বিষ্ণুপুরাণ, ভাগবতপুরাণ ও মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের জীবনের যাবতীয় কথা আছে। সমগ্র উত্তর ভারতে বৈষ্ণব সম্প্রদায় এবং দক্ষিণ ভারতে আড়বার সম্প্রদায় কৃষ্ণভক্ত। প্রাচীন ও মধ্যযুগ ছাড়িয়ে আধুনিক যুগে এসেও শ্রীকৃষ্ণের ব্যাপক জনপ্রিয়তা।
আমরা আমাদের বর্তমান লেখায় বাংলা সাহিত্যে শ্রীকৃষ্ণ-আশ্রিত রচনার কথাই আলোচনা করব। দেখা যাবে, শ্রীকৃষ্ণ হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। বাংলা ভাষায় যে বিষয় একটি প্রবাদ আছে ‘কানু বিনে গীত নাই,’ তার সত্যতাও আমরা এর ফলে উপলব্ধি করতে পারব।
প্রাচীনতম বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন পাই চর্যাপদে, দশম শতাব্দীতে। বাংলা সাহিত্যের পরবর্তী নিদর্শন পাওয়া যাবে বড়ু চণ্ডীদাস রচিত ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এ, যা রচিত হয়েছিল দ্বাদশ শতাব্দীতে। বাংলা ভাষায় শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে সুদীর্ঘ একটি কাব্য রচিত হয়েছিল, এতে শ্রীকৃষ্ণের জনপ্রিয়তা বাঙালির মধ্যে যে কতখানি ছিল, তা বোঝা যায়। তবে এ গ্রন্থেরও আগে বাঙালি কবি জয়দেব রাধাকৃষ্ণকে নিয়ে ‘গীতগোবিন্দ’ রচনা করেন, যার ভাষা ছিল সংস্কৃত। এ সবেরই উপজীব্য ছিল রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি, যা মূলত ভগবত পুরাণবাহিত। বড়ু চণ্ডীদাসের রচনা আধুনিক যুগেও আমাদের হূদয়ে আবেদন সঞ্চারী। রাধা গৃহে রন্ধনকাজে ব্যস্ত, এমন সময় শ্রীকৃষ্ণের বাঁশি শুনে রাধার আকুল উচ্চারণ ‘কে না বাঁশি বায় (বাজায়) বড়াঈি কালিনী নঈকূলে... বাঁশির শবদে মোর আউলাইলো রান্ধন।’ এ যেন আজকের বাঙালির মুখের ভাষা!
বৈষ্ণবধর্ম অতি প্রাচীন হলেও ষোড়শ শতাব্দীতে বাংলাদেশে শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব ও বৈষ্ণবধর্ম প্রচার কেবল বাংলায় নয়, উড়িষ্যা ও উত্তর ভারতেও ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে রাধাকৃষ্ণকেন্দ্রিক সাহিত্য, যাকে বৈষ্ণব পদাবলী বলে, তা প্রবল গতিময়তা লাভ করে। তবে শ্রীচৈতন্যের জন্মের পূর্ব থকেই এর উপক্রমণিকা দেখতে পাই বিদ্যাপতি ও চণ্ডীদাসের (এ চণ্ডীদাস বড়ু চণ্ডীদাস নন। এঁর বিখ্যাত উক্তি ‘শোন হে মানুষ ভাই, / সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’) কাব্যে। আজ থেকে ছ-সাত শো বছর আগের লেখা হলেও তাঁদের কাব্যের ভাষা অনেকাংশেই আজকের মানুষের কাছে সহজেই বোধগম্য। প্রসঙ্গত চণ্ডীদাসের সামান্য একটু পদ উদ্ধৃত করা যাক। কৃষ্ণকে প্রথম দেখার অনুভূতি রাধার কী রকম? ‘রাধার কী হইল অন্তরে ব্যথা / বসিয়া বিরলে থাকয়ে একলে / না শুনে কাহারো কথা।’ এ ভাষার সঙ্গে কি আজকের ভাষার মিল নেই?
বিদ্যাপতি চণ্ডীদাসেরও আগেকার কবি। তিনি বাংলার কবি নন, পার্শ্ববর্তী অঞ্চল মিথিলার। কিন্তু তাঁর কাব্য বাংলায় অতীব জনপ্রিয় ছিল। বাংলার সঙ্গে মৈথিলী ভাষা মিলিয়ে তিনি অপূর্ব এক কাব্যভাষার নির্মাণকর্তা, যাকে বলা হয় ব্রজবুলি ভাষা। বৈষ্ণবকবিতায় এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত প্রসারিত।
শ্রীচৈতন্য-পূর্ববর্তী ও তাঁর পরবর্তী বৈষ্ণব কবিতার মধ্যে মৌল একটি ফারাক আছে। বড়ু চণ্ডীদাস বিদ্যাপতি বা দ্বিজ চণ্ডীদাসের কাব্য স্বতোত্সারভাবে এগিয়েছে। কিন্তু শ্রীচৈতন্যের আমলে তাঁর অন্যতম প্রধান শিষ্য সনাতন ‘উজ্জ্বলনীলমণি’ নামে একটি বৈষ্ণব রসশাস্ত্র রচনা করলেন। তাতে কতকগুলি পূর্বাপরতার কথা বলা হলো। যেমন—‘গৌরচন্দ্রিকা,’ ‘পূর্ববাগ,’ ‘অভিসার’ ইত্যাদি অর্থাত্ যেকোনো কবিকে কাব্য রচনা করতে হবে ‘গৌর’ অর্থাত্ শ্রীচৈতন্যকে বন্দনার মাধ্যমে। এই পর্যায়ক্রম রক্ষা করতে গিয়ে কোনো কোনো কবি কোনো কোনো অনুক্রমের প্রতি যথার্থ সুবিচার করতে পারেননি।
তবে একথা ঠিক, অগণিত কবি এসময় আবির্ভূত হয়েছিলেন, যাঁদের অমর পঙিক্ত বাংলা কাব্যের চিরস্থায়ী সম্পদ। গোবিন্দদাস, বলরামদাস, জ্ঞানদাস প্রমুখ অজস্র কবি রাধাকৃষ্ণের কাহিনি নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন।
আরো আশ্চর্য, বাঙালি মুসলমান কবিরাও বৈষ্ণব কবিতা লেখা থেকে পিছিয়ে থাকেননি। একশো জনের ওপর মুসলমান কবি রাধাকৃষ্ণকে অবলম্বন করে কাব্য রচনা করে গিয়েছেন, যার একটি অনবদ্য সঙ্কলন কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি মজার জিনিস স্মরণীয়। মধ্যযুগ থেকে আজকের সময় পর্যন্ত হিন্দু বাঙালির নাম শ্রীকৃষ্ণের নাম অনুযায়ী হয়। মধুসূদন, গোবিন্দ, ব্রজেশ্বর, যদুপতি, বাসুদেব, জনার্দন, রাধামোহন, কৃষ্ণ, যশোদাজীবন, দ্বারকানাথ, মুকুন্দ, রাধানাথ, অনন্ত, এমনকি কংসারি পর্যন্ত।
আধুনিক বাংলা কাব্যে মুধুসূদন আবার নিয়ে এলেন বৈষ্ণব কবিতা, তাঁর ‘ব্রজাঙ্গনা’ কাব্যে। তারপর ‘ভানুসিংহের পদাবলী’-তে আনলেন রবীন্দ্রনাথ। নজরুলের গানেও এর অনুসরণ দেখি। আবার শ্রীকৃষ্ণ চরিত্র বিশ্লেষণ করে গ্রন্থ রচনা করলেন বঙ্কিমচন্দ্র। বুদ্ধদেব বসুর ‘প্রথম পার্থ’ কাব্যনাট্যে কর্ণের সঙ্গে কৃষ্ণের সংলাপ শ্রীকৃষ্ণের চরিত্রকে অভিনবত্ব দিয়েছে নিঃসন্দেহে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘রাধাকৃষ্ণ’ উপন্যাসে কৃষ্ণকে আধুনিক লেবাস দিয়েছেন। তাছাড়া দীনেশচন্দ্র সেনের কৃষ্ণচরিত্র অবলম্বনে সুললিত ভাষায় লেখা ‘সুবল সখা,’ ‘কানু পরিবাদ,’ ‘রাখালের রাজগি’-র কথাও মনে পড়বে আমাদের। নবীনচন্দ্র সেনের ‘রৈবতক, কুরুক্ষেত্র প্রভাস’-এও আছে শ্রীকৃষ্ণকাহিনি। বাংলা ভাষায় প্রথম একাঙ্ক নাটক মন্মথ রায়ের ‘কারাগার’ও শ্রীকৃষ্ণকেন্দ্রিক। অজস্র যাত্রাপালা, নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে। আছে কালিদাস রায় প্রমুখের কবিতা। গবেষকরাও নানান মাত্রায় শ্রীকৃষ্ণচরিত্রকে তুলে ধরেছেন নানা প্রকরণে, নানা মাত্রায়, নানা বৈচিত্র্যে।
শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে মুধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের কাব্য কীভাবে বিকশিত হয়ে উঠেছিল—একটু পর্যবেক্ষণ করা যাক। মধুসূদনের ‘ব্রজাঙ্গনা’ কাব্যে শ্রীকৃষ্ণ কীভাবে চিত্রিত, দেখে নিই আগে। কৃষ্ণ বিরহে কাতর রাধার উক্তি, ‘হে ধীর, শরমহীন ভেবনা রাধারে / অসহ যাতনা দেব, সহিব কেমনে?’ শ্রীকৃষ্ণ বন্দনায় মধুসূদন, ‘বরাঙ্গনা কুরঙ্গিনী তোমার কিঙ্করী; / বিহঙ্গিনী দল তব মধুর গায়িনী; / যত বননারী তোমা সেবে, হে শিখরি। / সতত তোমাতে রত বসুধা সুন্দরী /— তব প্রেমে বাঁধা গো মেদিনী।’ মধুসূদনের একটি সনেটও আছে ‘ব্রজবৃত্তান্ত’ নাম দিয়ে, ‘আর কি কাঁদে, লো নদি, তোর তীরে বসি / মথুরার পানে চেয়ে, ব্রজের সুন্দরী? / কোথায় রাখালরাজ পীত ধড়া গলে? / কোথায় সে বিরহিনী প্যারী চারুশীলা? / ডুবাতে কি ব্রজধামে বিস্মৃতির জলে, / কালরূপে পুনঃ ইন্দ্র বৃষ্টি বরষিলা?’
রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও বহুস্থানে শ্রীকৃষ্ণ প্রসঙ্গ আছে, তবে মাত্র ষোল বছর বয়সে প্র্রজবুলি ভাষা রপ্ত করে লেখা তাঁর ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ আশ্চর্য করে আমাদের। তারই সামান্য একটু, রাধার উক্তিতে, ‘অঙ্গবসন তব ভীখত মাধব, ঘনঘন বরখত মেহ / ক্ষুদ্র বালি হম হমকো লাগয় / কহি উপেখবি দেহ? / বইস বইস পহু, কুসুমশয়নপর / পদযুগ দেহ পসারি / সিক্ত চরণ তব মোছব যতনে কুন্তলভার উঘারি। / শ্রান্ত অঙ্গ তব হে ব্রজ সুন্দর, / রাখ বক্ষ- ’পর মোর / তনু তব ঘেরব পলুকিত পরশে / বাহুমৃনালক ডোর।’ সবশেষে নজরুল, ‘এলো নন্দের নন্দন নবঘনশ্যাম। / এলো যশোদা নয়নমণি নয়নাভিরাম / প্রেমরাধারমণ নব বঙ্কিম ঠাম, / রাখাল গোকুলে এল গোলোক ত্যাজি / কৃষ্ণজি, কৃষ্ণজি, কৃষ্ণজি, কৃষ্ণজি।’
নজরুল তো ছেলের নাম-ই রেখেছিলেন কৃষ্ণ, কৃষ্ণ মুহম্মদ।

