কাবুল বিমানবন্দরে দু’টি ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ৬০ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২ জন মার্কিন মেরিন সেনাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দফায় দফায় আশঙ্কা প্রকাশ করার মধ্যেই এই হামলা হলো। যদিও এখনো কোনো গোষ্টি দায় স্বীকার করেনি তবুও যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করছে আইএসের দলছুট শাখা আইসিস-কে এই হামলা চালিয়েছে। প্রথম হামলাটি হয় বিমানবন্দরের অ্যাবি গেটে এবং দ্বিতীয় হামরা হয় ব্যারনস হোটেলের কাছে। তালেবান এই হামলার নিন্দা জানিয়ে একে ‘ন্যাক্কারজনক’ বলে উল্লেখ করেছে।
এই হামলার পর আফগানিস্তান থেকে বিদেশী সেনা ও নাগরিকদের অপসারণের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই মুহুর্তে বিমানবন্দরে যাওয়া আরো ঝুকিপূর্ণ। তাই জার্মানির পাশাপাশি ডেনমার্কও বলেছে তাদের নাগরিকদের অপসারণ আপাতত বন্ধ রাখবে। তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, তার দেশ উদ্ধার তত্পরতা বন্ধ করবে না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেদেশের নাগরিকদের সরিয়ে নেয়া হবে বলে তিনি জানান। এই হামলার ফলে নিজেদের চেয়ে শক্তিশালী কোনো জঙ্গি গোষ্টিকে মোকাবিলা করে শান্তিপূর্ণভাবে দেশ শাসন করতে তালেবানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরী হলো।
গতকাল দিনভর কাবুল বিমানবন্দর ও তার আশপাশে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছিল। যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের কাবুল বিমানবন্দরে না আসার জন্য সতর্কতা জারি করে। যারা বিমানবন্দরে জড়ো হচ্ছিল তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে বলা হচ্ছিল। কিন্তু তারপরেও আফগানিস্তান ছাড়তে মরিয়া লোকজন শয়ে শয়ে বিমানবন্দর অভিমুখে যাচ্ছিল। সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার খবর এবং শেষ মুহূর্তে এসে সতর্কতা জারির পরও দেশ ছাড়তে মরিয়া আফগান ও বিদেশীরা তাতে কানই দেয়নি। বিস্ফোরণ ঘটেছে বিমানবন্দরের যে গেটের কাছে যেখানে ছিল হাজারো মানুষের জটলা। যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি ব্যাটেলিয়নের সাবেক কমান্ডার কর্নেল কোল জ্যাসন এরকম আরও হামলা হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন।
গত বুধবার কাবুল বিমানবন্দর সন্ত্রাসী হামলার ‘উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছে জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের ওই এলাকা এড়িয়ে চলতে বলেছিল। বিমানবন্দরের কাছের লোকজনদের সরে যেতে বলা হয়েছিল। এই সতর্কবার্তার মধ্যে যুক্তরাজ্যের আর্মড ফোর্সেস বিভাগের জুনিয়র মন্ত্রী জেমস হিপি গতকাল বিবিসি রেডিও ফোরকে বলেন, কাবুল বিমানবন্দরে মারাত্মক হামলার চেষ্টা হতে পারে বলে ‘খুবই বিশ্বাসযোগ্য‘ খবর আছে তার কাছে। তিনি বলেছিলেন, সম্ভবত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেরকম কিছু ঘটতে পারে।
মার্কিন সেনা ও বিদেশি নাগরিকদের আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার জন্য তালেবান ৩১ আগস্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এ কারণে দেশটি ছাড়ার জন্য হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে আছে এয়ারপোর্ট এলাকায়। কাছাকাছি থাকা একজন প্রত্যক্ষদর্শী বার্তা সংস্থা এপিকে জানান, বিমানবন্দরে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা ভিড়ের মধ্যে বিস্ফোরণ ঘটে। গুলিবর্ষণের আওয়াজও শোনা যায়। ঘটনার পরপরই লোকজন হুড়োহুড়ি করে পালাতে শুরু করে। এ সময় পদদলিত হয়ে অনেকে আহত হয়। চারদিক রক্তে ভেসে যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতায় অনেকের হাত-পা উড়ে যায় বলে তিনি জানান। এর আগে বেশ কয়েকটি দেশ বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার জন্য নিজ নিজ জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিল। ইতিমধ্যে কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের অপসারণ শেষ করেছে এবং তাদের সৈন্য ও কূটনীতিকদের প্রত্যাহার করতে শুরু করেছে। তালেবানরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে অপসারণের সময় পশ্চিমা বাহিনী কিংবা নাগরিকদের তারা আক্রমণ করবে না। তবে ৩১ আগস্টের মধ্যেই সবাইকে বেরিয়ে যেতে হবে।
জানা গেছে, আফগানিস্তান ছাড়তে আরো ১০ হাজারের বেশি মানুষ কাবুল বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় আফগানিস্তান থেকে ১৯ হাজার মানুষকে এবং ১৪ আগস্ট থেকে মোট ৮০ হাজারের বেশি বিদেশি ও আফগান নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় ‘আইসিস-কে’ : গতকালের হামলার পর প্রশ্ন উঠেছে কারা এই আইসিস-কে যারা এত বড় হামলা চালালো। বিবিসি জানায়, ইসলামিক স্টেট-খোরাসান হচ্ছে আইএসের একটি আঞ্চলিক শাখা। আফগানিস্তানের কিছু অঞ্চল ছাড়াও পাকিস্তানেও এদের তত্পরতা আছে। আফগানিস্তানে যতগুলো জঙ্গিগোষ্টি আছে তাদের মধ্যে সবচে নৃসংশ হচ্ছে এই গোষ্টিটি। এদের সঙ্গে কেউ দ্বিমত পোষণ করলেই নির্মমভাবে তাদের হত্যা করে এরা। ২০১৫ সালে সংগঠনটি গঠিত হয়েছিল। আফগান এবং পকিস্তান জিহাদি বিভিন্ন গ্রুপের মধ্য থেকেই সদস্য সংগ্রহ করে এরা।
উদ্ধার তত্পরতা চলবে : গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ১ টা ২০ মিনিটে হামলা প্রসঙ্গে পেন্টাগনে ব্রিফিং শুরু হয়। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড কর্মকর্তা জেনারেল ম্যাককেনজি বলেন, তালেবানের সহযোগিতায় কাবুল থেকে মার্কিন এবং অন্যান্য দেশের নাগরিকদের সরিয়ে আনা হচ্ছে। হামলার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও এটা থামানো যায়নি দেশ ছাড়তে মরিয়া লোকজনের কারণে। তারা কোনো সতর্কবার্তায় কান দেননি। যেকোন মূলে আফগানিস্তান ত্যাগ করতে চেয়েছে। যুক্তরাষ্টের সন্দেহ এই হামলার জন্য আইসিস-কে দায়ী। আরো হামলার আশঙ্কা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের অপসারণ তত্পরতা বন্ধ করবে না।
গানবাজনা চলবে না :এদিকে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, ‘ইসলামে সংগীত নিষিদ্ধ। তাই আফগানিস্তানে এখন থেকে আর গানবাজনা চলবে না। আমরা আশা করছি, মানুষকে চাপ না দিয়েই এ ধরনের কাজকর্ম থেকে বিরত রাখতে পারব।’ এর আগে ১৯৯০-এর দশকে তালেবান শাসনের অধীনে আফগানিস্তানে সংগীত, টেলিভিশন ও সিনেমা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ নিয়ম ভঙ্গ করলে গুরুতর শাস্তির মুখে পড়তে হতো। তালেবান ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশটির সংগীত অঙ্গন ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়। চালু হয় আফগানিস্তান জাতীয় সংগীত ইনস্টিটিউট। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি একটি নারী অর্কেস্ট্রা দলও গঠন করে। এ দল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারফর্ম করত।
নেতাদের পাশে চায় তালেবান :অন্যদিকে, সরকার গঠনের আগে খুব সতর্ক পদক্ষেপ নিতে চাইছে তালেবান। ফের ১৯৯০-এর পুনরাবৃত্তি তারা চায় না। তারা চাইছে না ফের গৃহযুদ্ধে জর্জরিত হোক আফগানিস্তান। সেই পরিস্থিতি এড়াতেই আফগানিস্তানের প্রভাবশালী নেতাদের পাশে পেতে মরিয়া তারা। গোষ্ঠীটি চাইছে উজবেক, তাজিক ও হাজারা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা স্থায়ী সরকার গড়ে উঠুক। সরকার গঠনে তালেবান যেসব নেতাকে পাশে পেতে চায়, তারা হলেন গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার, হামিদ কারজাই, আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ, আবদুল রশিদ দোস্তুম, আমরুল্লাহ সালেহ্, আহমদ মাসুদ, আতা মোহাম্মদ নুর ও মোহাম্মদ করিম খলিলি। স্থায়ী সরকার গড়তে এই আট নেতাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন বলে মনে করছেন তারা। আর সে কারণেই তাদের সঙ্গে ইতিমধ্যে এই আলোচনা শুরু করেছে তালেবান। এদের মধ্যে গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার আফগানিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। হিজব-এ-ইসলামি দলের প্রভাবশালী নেতা এবং আফগান রাজনীতির অন্যতম ব্যক্তি। আমেরিকার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ জঙ্গির তালিকায় ছিলেন তিনি। হামিদ কারজাই দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট। একসময় তিনি তালেবানের ঘোর শত্রু ছিলেন। এখন তাদের সঙ্গেই আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছেন বলে মনে করা হচ্ছে। আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের প্রধান আহমদ শাহ মাসুদের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি পেশায় চিকিত্সক এবং রাজনীতিকও। একসময় তালেবান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আবদুল রশিদ দোস্তু উজবেক নেতা এবং আফগানিস্তানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন তিনি। অপরজন আমরুল্লাহ সালেহ আশরাফ ঘানি সরকারের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি গোয়েন্দাপ্রধানও ছিলেন। এখন তিনি তালেবানের হাত থেকে পঞ্জশির উপত্যকা রক্ষা করছেন। আহমদ মাসুদ নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের প্রধান এবং তাজিক মুজাহিদিন কমান্ডার আহমদ শাহ মাসুদের ছেলে। অন্যদিকে, আতা মহম্মদ প্রভাবশালী তাজিক নেতা। আফগানিস্তানের বলখ প্রদেশের গভর্নর ছিলেন তিনি। মোহাম্মদ করিম খলিফি আফাগনিস্তানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি হাজারা সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেতা। তালেবান আশা করছে, পাশে নিয়ে কিংবা সহযোগিতায় সরকার গড়তে পারলে তা ভঙ্গুর হবে না।
