আজ ২৮ আগস্ট, আমার আব্বা মরহুম ডাক্তার আখলাকুল হোসেন আহমেদের নবম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের এই দিনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পিতার দৃষ্টি, আদর্শ, স্বপ্ন ও শক্তিকে ধারণ করেই প্রতিটি সন্তান নিজেকে পৃথিবীতে উপযুক্ত করে গড়ে তোলে। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে চোখের সামনে কত স্মৃতি যে ভেসে আসছে—কি সততায়, কি ন্যায়পরায়নতায়, কি শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব হিসেবে, কি মানুষের ডাক্তার হয়ে পুরো ভাটি অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে আমার বাবার নাম।
আমার আব্বা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে কল্যাণধর্মী রাজনীতি ও মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে প্রাদেশিক আইন পরিষদের মোহনগঞ্জ-বারহাট্টা আসনে বঙ্গবন্ধু তাকে মনোনয়ন দেন এবং তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার পিতা ভারতের মেঘালয় রাজ্যে চলে যান। দেশ ও মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব পালনই ছিল তার কাছে বড়। এ সময় মহেষখোলা ক্যাম্পের ইনচার্জ থাকার পাশাপাশি পরবর্তীকালে সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিলের ময়মনসিংহ নর্থ-ইস্ট জোন-২-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য, স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাক্ষর করেন।
সেবায় ও কল্যাণে তিনি সারা জীবন মানুষের পাশে থেকেছেন। অন্যায়-অবিচার আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। একজন সত্ এবং ন্যায়পরায়ণ রাজনীতিবিদ হয়ে সর্বদা তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, উদ্দেশ্য ও ধারণাকে প্রচার করেছেন।
বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার মর্মান্তিক সংবাদ শুনে নীরব রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল বাবার মনে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে—এই সংবাদটা যখন রেডিওতে ভেসে এলো—বাবা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। স্তম্ভিত এবং হতভম্ব হয়ে বলেছিলেন, কী বলছে ওরা!
কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় তাত্ক্ষণিকভাবে তিনি মোহনগঞ্জ উপজেলায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দকে খবর দিলেন। অনেকেই এলেন। তাদেরকে নিয়ে আসেন লোহিয়ার মাঠে। উত্তেজিত এবং দিশেহারা একটি সমাবেশে তিনি বক্তৃতা করেন। হত্যাকারীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে বিচারের দাবিতে অনেকেই সেদিন আমার বাবার সঙ্গে প্রতিবাদের আওয়াজ তোলেন। তাত্ক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে নির্মমভাবে নিহত জাতির পিতার জন্য তারা গায়েবানা জানাজা পড়বেন। লোহিয়ার মাঠেই জানাজা হবে। সবাই জানাজা পড়ার জন্য সমবেত হলেন। কিন্তু জানাজা পড়াবেন কে? জানাজায় ইমামতি করার জন্য যখন হুজুর পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন মাঠের পাশ দিয়ে একজন ধার্মিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যাচ্ছিলেন। তাকে বলা হলো, ‘আমরা নিহত বঙ্গবন্ধুর গায়েবানা জানাজা পড়ব। তুমি কি জানাজা পড়াতে পারবে?’ বলার সঙ্গে সঙ্গে সে রাজি হলো। মোহনগঞ্জের ঐতিহাসিক লোহিয়ার মাঠে অনুষ্ঠিত হলো মহান নেতার অতি সাদামাটা গায়েবানা জানাজা। মোহনগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা আব্দুল গনি আমার কাছে সেদিনের সেই জানাজা পড়ার স্মৃতির কথা আবেগমথিত কণ্ঠে স্মরণ করছিলেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে নেত্রকোনার সীমান্ত এলাকায় একদল প্রতিরোধ যোদ্ধা তখন সরাসরি অস্ত্র হাতে তুলে নেন। কিছু দিনের মধ্যে মোহনগঞ্জের মল্লিকপুর গ্রামে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের এক গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। মোহনগঞ্জের মল্লিকপুরের হরেন্দ্র তালুকদারের বাড়িতে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে বিশ্বস্ত নেতৃবৃন্দের সে সভায় আব্বাসহ উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন গণপরিষদ সদস্য ধর্মপাশার হেকিম চৌধুরী, কেন্দুয়ার হাদিস চৌধুরী, কলমাকান্দার আব্দুল মজিদ তারা মিয়াসহ আরো অনেক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী। ঐতিহাসিক এই সভার কথা আমাদের কোনো ইতিহাসগ্রন্থে উল্লিখিত হয়নি। সেই সভার পরেও আমার আব্বা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চললেন। অনেক প্রতিরোধ গেরিলা সেদিন নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। কিন্তু প্রিয় নেতার হত্যাকারীদের কাছে মাথা নত করেননি।
কিছু দিন পরে দেখলাম সেনাবাহিনী মোহনগঞ্জে অবস্থান নিয়েছে। একদিন হঠাত্ করে সেনাবাহিনী আমাদের বাড়িটা ঘিরে ফেলল। সবাই তখন আতঙ্কিত। আমার আব্বাকে একটা খোলা জিপে করে মোহনগঞ্জ পাইলট হাইস্কুলে নিয়ে আসা হলো; আম্মা তখন কান্নাকাটি করছেন। আমি তখন পাইলট হাইস্কুলে এসএসসির নির্বাচনি পরীক্ষা দিচ্ছি। মনের মধ্যে একটি অস্থিরতা। সে সময় পাইলট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত শামসুল হক স্যার। পরীক্ষার হলে ঢুকে পেছন থেকে আমার পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভালো করে পরীক্ষা দাও। তোমার আব্বার জন্য চিন্তা কোরো না। তিনি ভালো আছেন।’
সন্ধ্যায় ওরা আব্বাকে বাসায় ফেরত নিয়ে আসে। কী একটা অনিশ্চিত মুহূর্ত যে গেছে—এটা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আব্বাকে ওরা বাসায় রেখে গিয়েছিল ঠিকই; কিন্তু আদেশ জারি করে দিয়েছিল যে বাড়ির বাইরে কোথাও যাওয়া যাবে না। অর্থাত্ আব্বাকে গৃহবন্দি করে রাখা হলো। কিন্তু আব্বাকে দেখেছি সারা জীবন তার আদর্শ ও কর্তব্যের প্রতি অবিচল থেকেছেন। কত মানুষ যে এই সময়টায় নির্যাতন ভোগ করেছেন। মোহনগঞ্জের লোহিয়ার মাঠে যারা গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করে প্রতিবাদ মিছিলে গিয়েছিলেন তাদের প্রায় সবাই আমার আব্বার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদে স্থানীয়ভাবে আমার পিতাসহ তার সহযোগী যারা সেদিন অসীম সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, নতুন প্রজন্মের তা জানা প্রয়োজন। ইতিহাসের পবিত্র শিখা থেকে প্রেরণা নিয়েই আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হয়। আজ এটা ভেবে আমি ছেলে হিসেবে গর্বিত যে আমার আব্বা তার মফস্সল শহরে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বেশ কিছু অনুসারী নিয়ে একটা প্রতিবাদ মিছিল করেছিলেন, গায়েবানা জানাজা পড়িয়েছিলেন এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পাশে ছিলেন সব সময়। আমাদেরকে সত্য ইতিহাস জানতে হবে।
আল্লাহর কাছে হাজারো শুকরিয়া, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজ বঙ্গবন্ধুর যোগ্য উত্তরাধিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত খুনিদের বিচার করেছেন। একটা ঘোর সংকটকালে তিনি দল ও দেশের দায়িত্ব নিয়েছেন। অসীম দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞা নিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এবং বাংলাদেশকে এক অনন্য উচ্চতায় সমাসীন করেছেন। সেজন্য আমাদের সকলের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি জানাই অশেষ কৃতজ্ঞতা। শোকের এই মাসে আমার বাবার প্রয়াণ দিবসে সকলের কাছে দোয়া চাইছি—মহান রাব্বুল আলামিন যেন আমার পিতাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
n লেখক :সাবেক সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
