বঙ্গোপসাগর অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২১, ২১:৫৭

ভূপৃষ্টের মোট আয়তনের ২৯ ভাগ স্থল এবং ৭১ ভাগ পানি। এই বিশাল জলরাশিকে সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সম্পদ হিসেবে পরিগণিত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা হয়েছে কিভাবে প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর যথাযথ ব্যবহার করে জীবনযাত্রার মান আরো উন্নত করা যায়। প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে সমুদ্র অন্যতম। সমুদ্র থেকে আমরা খাদ্য, খনিজ ও শিল্পের কাঁচামাল পেয়ে থাকি। কিন্তু সমুদ্রে এত বেশি  সম্পদ মজুদ রয়েছে যে একে আমরা সম্পদের গুদাম ঘর বলতে পারি। আধুনিক প্রযুক্তি ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়নের ফলে মানুষ সমুদ্রকে অনেকাংশে জয় করলেও এখনো অনেক কিছু অজানা রয়েছে ।

আমাদের বঙ্গোপসাগরের আয়তন প্রায় ২২ লাখ বর্গকিলোমিটার, গড় গভীরতা ২৫৮৬ মিটার এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ৫২৫৮ মিটার। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে প্রায় ৭৩২  কিলোমিটার উপকূল রেখা বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুসারে উপকূল থেকে সমুদ্রের দিকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এলাকা বঙ্গোপসাগরে আমাদের ‘একান্ত অর্থনৈতিক এলাকা’ (Exclusive Economic Zone) হিসেবে চিহ্নিত। সাধারণত সমুদ্রের যে অংশের গভীরতা ২০০ মিটারের কম সেখানে সামুদ্রিক মাছ বেশি থাকে। বিজ্ঞানীদের মতে, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে অনেক তেল ও গ্যাস মজুদ রয়েছে। বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্পদ বলতে বঙ্গোপসাগরের সম্পদকে বোঝায়। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদগুলো  মোটামুটি ভাগ করা যায় এভাবে—১. জৈব সম্পদ (ফুড—প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ এবং নন ফুড—প্রবাল পাথর ও অন্যান্য), ২. খনিজ সম্পদ (পেট্রোল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস), ৩. অপ্রচলিত শক্তি (জোয়ারভাটার শক্তি, তরঙ্গ শক্তি, বায়ু শক্তি),  ৪. বাণিজ্যিক সম্পদ (সমুদ্র বন্দর, পোতাশ্রয়, পর্যটন), ৫. স্বাদু পানি,  ৬. ওষুধের কাঁচামাল, ৭.সুন্দরবন।

বলা হয়, যে দেশ সামুদ্রিক অর্থনীতিতে যত বেশি উন্নতি করতে পেরেছে, সে দেশের অর্থনীতি তত বেশি সমৃদ্ধ। প্রসঙ্গত, ২০১২ ও ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের দুই রায়ে মিয়ানমার ও  ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারিত হওয়ায় বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার  ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র অঞ্চল, ২০০ নটিক্যাল মাইলের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কর্তৃত্ব পায়। একইসঙ্গে চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানে  অবস্থিত সব ধরনের প্রাণীজ ও অপ্রাণীজ সম্পদের ওপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার অধিকার লাভ করে। দেরিতে হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্লু ইকোনোমি বা সমুদ্র অর্থনীতি একটি নতুন দিগন্ত হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে। এরই মধ্যে ব্লু ইকোনোমি নিয়ে একটি গবেষণা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিন সাইনস অ্যান্ড ফিসারিজ ফ্যাকাল্টির অধীনে এ প্রকল্প বাস্তায়িত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান অনুষদে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে দেশ-বিদেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকগণ  ব্লু ইকোনোমি বা সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল গ্যাস খনিজ, মত্স্য সম্পদ, পর্যটন, সুন্দরবন ইত্যাদি বিষয়ে জোরালো বক্তব্য  দিয়েছেন তাঁরা।

দেশের জনসংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য, বস্ত্র, জ্বালানি ও  অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য স্থলভাগের সম্পদ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে জীবন-জীবিকায় ইতিমধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। কাজেই একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকায় আমাদের বঙ্গোপসাগর হয়ে উঠুক অর্থনীতির নতুন দিগন্ত।

যশোর