জিমে ঝুঁকছে তরুণ প্রজন্ম

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২১, ২২:৪৫

শহুরে জীবনে সারা দিনের চাকরি-ব্যবসার ব্যস্ততা আর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার চাপে শরীরের দিকে নজর দেওয়ার সময় কোথায়! অন্যদিকে, শরীর-স্বাস্থ্যের যত্ন না নিলে রোগে ভুগে নাকাল অবস্থার মধ্যে পড়তেই হবে। করোনাকাল এসে আরো বুঝিয়ে দিয়েছে সুঠাম-সুস্থ দেহ মানুষের সুস্থভাবে বাঁচার জন্য কতটা জরুরি! কে না জানে, স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। শহরে কি গ্রামে কিংবা দূর মফস্বলে সবাইকেই ভাবতে হচ্ছে স্বাস্থ্য নিয়ে। ভাবতে হচ্ছে স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিয়ে। তাই, সকালের আদুরে ঘুম কাটিয়ে পড়িমড়ি করে সবাই পার্কে, রাস্তায় ছোটে হাঁটতে, ব্যায়াম করতে।

এই করোনা মহামারির মধ্যেই গত বছর অক্টোবরে ফিটনেস সেন্টার চালু করেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। ‘ইন্সপায়ার ফিটনেস বাই সোহেল তাজ’ শরীরচর্চা কেন্দ্র চালু করার পেছনে তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তরুণদের সামনে নতুন কিছু দিতে হবে। দেশকে ফিট রাখতে হলে তরুণ প্রজন্মকে ফিট রাখতে হবে। শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে মানসিক সুস্থতার যোগ রয়েছে। তারা যদি সুস্থ থাকে, সুঠাম থাকে তাহলে সমাজ থেকে মাদক, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ এসব অপরাধ কমতে শুরু করবে। একটা সময় পাড়ায় পাড়ায় ব্যায়ামাগারে গিয়ে শরীরচর্চা করার প্রবণতা ছিল ঢাকায়। ঢাকার বাইরেও তরুণদের মধ্যে আগ্রহ ছিল ব্যায়ামের প্রতি। পরবর্তীকালে সেসবে ভাটা দেখা যায়। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ঘর বন্দিত্বকালের শুরু। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসে আবারও সেই পুরোনো স্বাস্থ্যচর্চার প্রবণতা ফিরে আসতে দেখা যাচ্ছে আমাদের তরুণদের মধ্যে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে দিনদিন মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ছে। স্বাস্থ্থ্যঝুঁকির কারণ তো আর কম নেই। খাদ্যে ভেজাল, দুধে ভেজাল, ফলমূলে কীটনাশক—এসবের প্রভাব তো শরীরে আসেই। এসব কিছু থেকে রক্ষা পেতেই শরীরের ফিটনেস বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে যুবক বুড়ো থেকে সবাই। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ধ্যান, নিয়মিত শরীরচর্চা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় বহু গুণ। করোনার এই সময়ে তাই মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে শরীরচর্চা। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ব্যায়ামের বিকল্প নেই। সারা দেশেই পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক ব্যায়ামাগার। তবে, সঠিক নিয়মে ব্যায়াম না করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়েও সতর্ক করছেন শরীরচর্চাবিদরা।

নগর জীবনের ব্যস্ততায় শারীরিক পরিশ্রমের চেয়ে মানসিক পরিশ্রমই বেশি। ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে হাঁটাহাঁটি আর ব্যায়ামের প্রতি ঝুঁকছে নগরবাসী। ভোরে সূর্য ওঠার আগে থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে সরব উপস্থিতি স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের। হাতির ঝিল, ধানমন্ডি লেক, চন্দ্রিমা উদ্যান, রমনা পার্ক প্রভৃতি স্থানে মানুষের ঢল নামে। গুলশান, বনানী, উত্তরা, মিরপুর এলাকার পার্ক, উন্মুক্ত স্থান বা একটু প্রশস্ত রাস্তার ফুটপাত ধরে হাঁটতে আর ব্যায়াম করতে দেখা যায় নগরবাসীকে। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ তরুণ—সবাই আছেন এই ভোরে ভ্রমণকারীর দলে। কেউ দৌড়াচ্ছেন আবার কেউ বা বয়সের ধকলে লাঠিতে ভর করেও হাঁটছেন। তবে স্বাস্থ্য ভালো রাখতে যে সকালেই হাঁটতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। যখন সময় পাবেন সেই সময়েই সেরে নিতে পারেন ব্যায়ামের কাজটা। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যায়ামের জন্য সবচেয়ে ভালো সময় বিকাল বা সন্ধ্যার সময়টা।

স্বাস্থ্য সচেতনতা মূলত স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি প্রক্রিয়া যাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে সুষম খাবার গ্রহণ, সঠিক সময়ে সঠিক খাবার, নিরাপদ পানীয়, নিয়মিত শরীরচর্চার মতো বিষয়গুলো।

ত্রৈমাসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘আমার স্বাস্থ্য’ রাজধানীতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে পরিচালিত স্বাস্থ্যবিষয়ক এক জরিপ থেকে জানা যায়, ৭৪ শতাংশ মানুষ তারা স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত বলে মনে করেন প্রায় ৮১ শতাংশ। ৬৮ শতাংশ মানুষ নিয়মিত হাঁটেন। দিনে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি খান। ৬০ ভাগ মানুষ সপ্তাহে মাত্র এক দিন লাল মাংস খান অর্থাত্ মোটামুটি আশানুরূপ পরিবর্তন বা সচেতনতা এসেছে মানুষের মধ্যে। ৬৯ শতাংশ মানুষ রোজ পরিমাণ মতোই ঘুমান। তার পরও প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অসুখে ভুগছে মানুষ।

জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জিম কালচার :রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগে থেকেই যদি নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস করা যায় তাহলে রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করেন চিকিত্সকরা। তাই এখন যোগব্যায়াম, হাঁটার দিকে ঝোঁক বাড়ছে নাগরিকদের। শহরের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে জিম। সেখানে তরুণ যুবকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। শহরগুলোতে মাঠ কমে আসার পাশাপাশি খেলার সুযোগও কমে আসছে। তাই তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকছে জিমনেশিয়ামে গিয়ে শরীর রক্ষার দিকে।

করোনা মহামারিতে অন্য ব্যবসায় যখন ধস, তখন নতুন নতুন ব্যায়ামাগার গড়ে উঠতে দেখা গেছে। সেখানে তরুণদের পদচারণাও বাড়ছে দিনদিন। এর পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের উদ্যোগেও রাজধানীতে ২০ থেকে ২৫টি ব্যায়ামাগার পরিচালিত হয়। সেখানেও স্থানীয় সব বয়সের মানুষরাই নিয়মিত শরীরচর্চা করেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নিয়মিত শরীরচর্চা তাদের করোনার ঝুঁকি থেকে দূরে রেখেছে। নিয়মিত শরীরচর্চা করেন এমন একজন বললেন, তাদের জিমে কয়েক জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু সবাই সহজেই বিপদ কাটিয়ে উঠেছেন।

সুস্থ থাকতে কেবল পুরুষরাই নয়, নারীরাও যাচ্ছেন এসব ব্যায়ামাগারে। এক নারী জানান, আমরা যখন অসুস্থ হই ডাক্তারের কাছে গিয়ে অনেক টাকা খরচ করতে হয়। যদি আমরা ব্যায়াম করে নিজেরা ফিট থাকি, তাহলে শরীরে অসুখ হওয়ার প্রবণতা কমে আসবে। অন্য এক তরুণী জানালেন, আমার ওয়েট ছিল ৭২ কেজি, সেখান থেকে এক বছরে আমি এখন ৫০ কেজি। তবে নিয়মিত শরীরচর্চা একটা অভ্যাসের মতো। একটা সময় এসে শরীরচর্চা না করলে খারাপ লাগে। এই অভ্যাসে পরিণত করা পর্যন্তই আপনার কষ্ট। তারপর দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে যায় শরীরচর্চা। তবে সঠিক নিয়মে ব্যায়াম না করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে জানান তারা।

এদিকে, এসব ব্যায়ামাগারে মানভেদে খরচটাও ওঠানামা করে। মাসে ১০ হাজার থেকে এর বেশি ফি নেয় এমন ব্যায়ামাগার যেমন রয়েছে আবার মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা নেয় পাড়ায় পাড়ায় এমন ব্যায়ামাগারও পাওয়া যায়। এসব স্থানে ব্যায়াম করার সময় সবচেয়ে বেশি জরুরি হচ্ছে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক আছে কি না তা দেখে নেওয়া। প্রশিক্ষক ভালো না থাকলে আপনার শরীর পেশিবহুল মাংসপিণ্ডে পরিণত হবে। সৌন্দর্য উধাও হয়ে যাবে। তাই, ভালো প্রশিক্ষকের অধীনে ব্যায়াম করা সবচেয়ে জরুরি।

খাওয়া-দাওয়ায় সচেতনতা :শুধু ব্যায়াম করলেই তো চলবে না। খাওয়া হতে হবে পরিমিত এবং স্বাস্থ্য উপযোগী। বছর জুড়ে উত্সব লেগে থাকা ভোজন রসিক বাঙালির কাছে উপাদেয় খাবার ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া তো শাস্তির শামিল। তাই স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ‘ভোজন রসিক বাঙালি’ উপাধি ত্যাগ করতেই হবে। মুখরোচক মসলাযুক্ত সুস্বাদু খাবারের দিকে ঝোঁক বরাবরই বাঙালির বেশি ছিল। আর সে কারণেই ডায়েটিশিয়ানের কাছে ছুটছেন সবাই। খাবারের তালিকা করে নেওয়ার প্রবণতা এখন শহরে বেশ জনপ্রিয়। সকাল দুপুর রাত মেপে খাবার খাওয়ার ট্র্যাডিশনও বেশ জনপ্রিয়। যদিও ডায়েটিশিয়ানরা বলে থাকেন, সব খেতে পারেন, খেতে পারেন যত ইচ্ছা। শুধু ব্যায়াম করে সেই ক্যালরিকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তা যদি না করেন, তবেই পরিধি বাড়বে শরীরের।