আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে ভয়াবহ হামলার ঘটনার এক দিন যেতে না যেতেই আবারও ভয়াবহ হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশের গোয়েন্দারা। তারা বলেছেন, আগাম সতর্কবার্তার মধ্যেই আইএস-কে যখন বিনা বাধায় আত্মঘাতী হামলা চালাতে সক্ষম হলো, তখন তারা এবার আরো বড় ধরনের পরিকল্পনা করবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া বৃহস্পতিবারের হামলা মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঘটনা তাদের আরো উত্সাহিত করবে নতুন নতুন সহিংস ঘটনা ঘটাতে। এদিকে, কাবুলে বৃহস্পতিবারের হামলার ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১১০ জনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে রয়েছে ১৩ জন মার্কিন সেনা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাবুল বিমানবন্দরে বিস্ফোরণ ঘটে। জনবহুল বিমানবন্দরে হাজার হাজার লোকের ভিড়ের মধ্যে হামলা চালায় জঙ্গিরা।
ভয়াবহ এই হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএসের দলছুট একটি শাখা আইএস-কে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও তাদের আফগান মিত্রদের ‘লক্ষ্যবস্তু’ বানিয়ে তারা এ আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। হামলাকারীর নাম আবদুল রহমান আল-লোগারি বলে উল্লেখ করেছে আইএস। নাম থেকে মনে করা হচ্ছে, তিনি আফগান নাগরিক ছিলেন। আইএসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিস্ফোরক বেল্ট পরিহিত ঐ সন্ত্রাসী তালেবান নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা চৌকি পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা, দোভাষী ও সহযোগীদের জটলার পাঁচ মিটারের মধ্যে ঢুকে পড়ে এবং বিস্ফোরণ ঘটায়। এ বিস্ফোরণে হতাহতদের মধ্যে তালেবান সদস্যরাও আছেন।
বোমা হামলার বাইরে এলোপাতাড়ি গুলিও চালানো হয়। গতকাল আরো আমলার আশঙ্কার মধ্যেই কয়েকটি দেশ তাদের দেশের নাগরিকদের উদ্ধার তত্পরতা শেষ করেছে। দেশ ছাড়তে মরিয়া আফগানদেরও দেখা গেছে নোংরা খাল-নালার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে পার হয়ে যে কোনো প্রকারে কাবুল বিমানবন্দরের দিকে ছুটতে।
বাইডেনের হুঁশিয়ারি : এদিকে, এই হামলার বিষয়ে কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘এই ঘটনা আমরা ভুলব না, আর হামলাকারীদের ক্ষমাও করব না। ওদের খুঁজে বের করে, হিসেব বুঝে নেওয়া হবে। আর সেই প্রস্তুতি শুরুও হয়ে গেছে। কমান্ডারদের নির্দেশও দেওয়া হয়ে গেছে। সঠিক সময়ে উত্তর দেবে আমেরিকা।’
তালেবানের আক্রমণের মুখে গত ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানে পশ্চিমা-সমর্থিত সরকারের পতন ঘটে। তারপর থেকেই কাবুল চালাচ্ছে তালেবান। যদিও তারা সবার জন্য ‘সাধারণ ক্ষমা’ ঘোষণা করেছে, তবে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে আফগানিস্তান ত্যাগের হিড়িক পড়ে গেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ কাবুলে বিশেষ প্লেন পাঠিয়ে তাদের নাগরিকদের ফেরত নিয়েছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রই ১৪ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত লক্ষাধিক মানুষকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে নিয়েছে। কাবুল বিমানবন্দরে এই কার্যক্রমই চলছে এখনো।
অস্ট্রেলিয়া-স্পেন-জার্মানি-ফ্রান্স : আফগানিস্তানের কাবুল বিমানবন্দর থেকে শেষ ধাপে লোকজনকে সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাজ্য। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ তাদের লোকজন সরানোর কাজ সমাপ্ত করেছে। যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত মার্কিন সেনারা সেখানে অবস্থান করবে। জার্মানি বৃহস্পতিবারই তাদের লোকজন সরানোর কাজ শেষ করে। জার্মান সেনাবাহিনী ৪ হাজার ১০০ আফগানসহ ৫ হাজার ৩৪৭ জনকে সরিয়ে নেয় কাবুল বিমানবন্দর থেকে। ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আরো ১০০ নাগরিকসহ ২ হাজার ৫০০ আফগান ফ্রান্সের মাটিতে পৌঁছায়। স্থানীয় একটি রেডিওকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জিন ক্যাসটেক্স বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যার পর আর কোনো লোকজনকে সরিয়ে নেবে না তার দেশ। অপরদিকে, অস্ট্রেলিয়াও তাদের লোকজন সরানোর কাজ সম্পন্ন করেছে।
তুরস্ক-তালেবান প্রথম বৈঠক: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, প্রথম বারের মতো তালেবানের সঙ্গে তুরস্কের বৈঠক হয়েছে। তিনি বলেন, কাবুল বিমানবন্দর পরিচালনার কাজ করতে তালেবানের দেওয়া প্রস্তাব এখনো পর্যালোচনা করছেন তারা। সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে আলোচনা হয় বলে তিনি জানান। প্রয়োজনে আরো বৈঠকে বসতেও রাজি আছে তুরস্ক। ন্যাটোর সদস্য দেশ তুরস্কের শত শত সেনা গত ছয় বছর ধরে কাবুল বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। তালেবানকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে তুরস্কের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। যদিও এরদোয়ান বলেন, এটি কূটনৈতিক বিষয়, তাদের প্রত্যাশা কি বা তারা কি চায়, সেটা আলোচনা ছাড়া জানা সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরিকল্পনা : এদিকে, আফগানিস্তানে সব দলের সম্মতিক্রমে অন্তর্বতীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছে তালেবান। সংগঠনটির সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ডজনখানেক নাম আলোচনায় উঠে এসেছে কারা পাচ্ছেন নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে এ সরকারের মেয়াদ কত দিন হতে পারে তা এখনো স্পষ্ট জানা যায়নি। প্রায় ৪ কোটি জনসংখ্যার দেশটিতে বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী রয়েছে। পশতুনরা হচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী, যা জনসংখ্যার প্রায় ৪২ ভাগ। তালেবান সূত্র জানিয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে আমির-উল মুমিনিনদের নিয়ে (কমান্ডার অব দ্য ফেইথফুল) যারা ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তান পরিচালনা করবে। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে শীর্ষ নেতাদের নিয়ে গঠিত কাউন্সিল পরবর্তীতে সরকার গঠন ও মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পেতে পারেন। বিচারিক, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, তথ্য এবং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকবেন তারা। তালেবানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মোল্লা বারাদার এখন রাজধানী কাবুলে অবস্থান করছেন।
