একটি সেতু মানে কিছু ইট, বালু বা রড নহে; সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। বহু কাঠখড় পুড়াইয়া ও তদবির করিয়া এই স্বপ্ন একদিন বাস্তবায়িত হয়। সেতু হইয়া উঠে কয়েকটি জনপদের মানুষের মেলবন্ধন। সেতুর ফলে তাহাদের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্নতি হয়; কিন্তু একসময় দায়িত্বশীলদের অবহেলা, সেতুর রক্ষণাবেক্ষণে উদাসীনতা ও স্থানীয় একশ্রেণির অতিলোভী লোকের অপরিণামদর্শী আচরণের কারণে সেই সেতুই যখন মেয়াদোত্তীর্ণ হইবার অনেক পূর্বেই ভাঙিয়া পড়ে, তখন স্থানীয় জনগণের সেই স্বপ্নেরও মৃত্যু হয়। এমনই একটি ঘটনা ঘটিয়াছে টাঙ্গাইল জেলার ধনবাড়ী উপজেলার পাইস্কা ইউনিয়নের ভাতকুড়া সেতুর ক্ষেত্রে। সেতুটি গত শুক্রবার সকালে বৈরাণ নদে বিকট শব্দে মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছে। ইত্তেফাকের খবর হইতে জানা যায়, সেতুটি ভাঙিয়া পড়িবার পূর্বে সেখানকার ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য ফজিলা বেগম যথারীতি সেতুটি রক্ষার জন্য উপজেলা পরিষদে গিয়া এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলীকে বিষয়টি জানাইয়াছিলেন; কিন্তু তাহারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেন নাই। সেতুটির আশপাশ হইতে ক্রমাগতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে সেতুটি অনেক পূর্বেই ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিয়াছিল। অবশেষে বর্ষণে নদের পানি বাড়িয়া যাওয়ায় প্রবল স্রোতের মুখে সেতুটির যবনিকাপাত ঘটে।
ধনবাড়ীর এই ভাতকুড়া সেতুটিই শুধু নহে, বাংলাদেশের আরো বহু সেতু-কালভার্ট অসময়ে ভাঙিয়া পড়িবার পিছনে এমন দুঃখজনক কাহিনি রহিয়াছে। বিশেষ করিয়া অপরিকল্পিত ও অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে কত সেতু যে দুর্বল হইয়া একসময় ভাঙিয়া পড়িতেছে তাহার ইয়ত্তা নাই। আলোচ্য সেতুটির দুইটি পিলার যখন আলগা হইয়া দাবিয়া যায়, তাহার পাঁচ দিনেও উপজেলা প্রশাসনের কেহ পরিদর্শনে আসেন নাই, যাহা বেদনাদায়ক। আসিলে হয়তো সেতুটি রক্ষার একটি উপায় বাহির করা সম্ভব হইত। সেতুটি এডিবির অর্থায়নে এলজিইডি নির্মাণ করে ২০১৮ সালে। মাত্র তিন বত্সরেই একটি স্বপ্নের মৃত্যু মানিয়া লওয়া কঠিন। আমরা নদ হইতে বালু উত্তোলনের বিরোধী নই। বালু এমন এক প্রকার সম্পদ, যাহা আমাদের ঘরবাড়ি নির্মাণসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় একান্ত প্রয়োজন। উজান হইতে পলিমাটি ও অন্যান্য সম্পদ আসিয়া আমাদের নদীগুলি সমৃদ্ধ হয়। ইহা আমাদের পরম সৌভাগ্যের বিষয়; কিন্তু এই সম্পদ কীভাবে উত্তোলন করিতে হইবে তাহার ব্যাপারে প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। সেতুর আশপাশ হইতে যত্রতত্র বালি উত্তোলন করিয়া আমরা সেই সেতুকে অনিরাপদ করিয়া তুলি কোন বিবেচনায়? ইহা বড় ধরনের নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নহে। সেতুর পিলার ও অ্যাপ্রোচ সড়কের কোনো ক্ষয়ক্ষতি না করিয়াও আমরা পরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করিতে পারি, ড্রেজিং কার্যক্রম চালাইতে পারি; কিন্তু কাহারা ও কীভাবে বালু উত্তোলন করিতেছে, তাহা যাহাদের দেখভাল করিবার কথা, তাহারা যেন কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাইয়া আছেন। দায়িত্বশীলদের এই দায়িত্বহীনতা মোটেও মানিয়া লওয়া যায় না।
একটি সেতু যখন ভাঙিয়া পড়ে, তখন স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। তাহাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ঘটে ছন্দপতন। স্কুলের শিক্ষার্থীরা সেতুটি ব্যবহার করিয়া স্কুলে যাইতে পারে না। কৃষকরা তাহাদের উত্পাদিত পণ্য লইয়া যাইতে পারে না বাজারে। ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহনে বিপাকে পড়েন। বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন করিতে গিয়া পরিবহন খরচ বাড়িয়া যায়। নিত্যপণ্যের মূল্যে তাহারই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই জন্য কোনো একটি সেতুরও রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা প্রদর্শন কাম্য নহে। সেতু যাহারা দেখভালের দায়িত্বে থাকেন, তাহাদের অবশ্যই সরেজমিনে ঘন ঘন পরিদর্শনে যাইতে হইবে। কোথাও টুকিটাকি মেরামতের প্রয়োজন হইলে তাহার সমাধান করিতে হইবে। মেরামত বাবদ যে অর্থ বরাদ্দ থাকে, তাহা খরচ না করিলে তাহা যায় কোথায়? বালু ব্যবসায়ীদের অন্যায়-অপকর্মও বন্ধ করিতে হইবে। একটি সেতু মাত্র তিন বত্সরে ভাঙিয়া পড়া জাতীয় অর্থের অপচয়ের নামান্তর। জনগণের অর্থে গড়িয়া উঠা কোনো সরকারি অবকাঠামো রক্ষায় স্থানীয় জনগণেরও সচেতনতা অনস্বীকার্য। জনগণ না জাগিলে জনগণের সম্পদ রক্ষা করা কঠিন। পরিশেষে ভাতকুড়া সেতুটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ করা হইবে বলিয়া আমরা আশা করি।
