শিরীষতলা :চট্টগ্রামের ফুসফুস বাঁচাতে এগিয়ে আসুন

আপডেট : ২৮ আগস্ট ২০২১, ২১:২৩

আমার জন্ম প্রাচ্যের অন্যতম সুন্দর শহর চট্টগ্রামে। নামের সঙ্গে গ্রাম শব্দটা কেন আছে, তার উত্তর দেবে ইতিহাস। কিন্তু জন্ম থেকেই দেখছি বিস্তৃত হওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে থাকা এই শহরের নান্দনিক সৌন্দর্য। একদিকে বঙ্গোপসাগর, আরেক দিকে শৈলমালা। শহর থেকে পা বাড়ালেই সমুদ্রের জলে পা ভেজানো যেমন সম্ভব, তেমনি আরেক প্রান্তে পা বাড়ালেই আকাশে হেলান দেওয়া পাহাড়ের সারি।

একেবারে পুরোনো আমলের কথা বাদ দিয়ে যদি ইংরেজ শাসনকাল থেকে শুরু করি, তবে জানব : পলাশীর যুদ্ধে বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইংরেজরা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য নবাব মীর জাফরের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে মীর জাফর কোনোভাবেই ইংরেজদের চট্টগ্রাম বন্দরের কর্তৃত্ব দিতে রাজি হননি। ফলে ইংরেজরা তাকে সরিয়ে মীর কাশিমকে বাংলার নবাব বানানোর ষড়যন্ত্র করে।

এই শহরের নানা হেরিটেজ ভবনের একটি রেলওয়ে ভবন। ১৮৭২ সালে ইংরেজদের হাতে নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এটি হয় রেলওয়ের অন্যতম প্রধান ভবন। সেই কাল থেকে আজ পর্যন্ত রেলওয়ের পাশাপাশি এখানে গড়ে উঠেছে আরো ইতিহাস। আমি জন্মেছিলাম এই পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নেমে আসা অতঃপর মূলত বিহার থেকে আগত হিন্দু রেল কর্মচারীদের আবাসভূমি গোয়ালটুলির এক প্রান্তে। সে সময় এলাকাটি ছিল সবুজে ঘেরা মায়াময়। আমাদের টিনের চালার বাসার সামনে ছিল বিশাল কয়েকটি গাছ, বিস্তৃত উঠান। কালক্রমে শৈশব পেরোনোর পরপর আমরা সেই এলাকা থেকে চলে আসি। কিন্তু আমার প্রথম স্কুল যাওয়া এখান থেকেই। রেলওয়ে কলোনির বুক চিরে চলে যাওয়া সরু রাস্তা ধরে যাওয়া-আসা করতাম। একাত্তরে এই কলোনির দুই যুবক যাদের একজন আমার মেঝদির সহপাঠী, আরেকজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহিদ হন। মনোয়ার ভাই নামের যে জন, তিনি মারা যান বাড়ির দরজায়। পাকিস্তানি বাহিনীর ছুটে আসা গুলিতে শহিদ হন মা-বাবার একমাত্র পুত্রসন্তান। অন্যজন লড়াকু ছাত্রনেতা। সে সময় এখনকার মতো মুজিবকোটের চল ছিল না। যারা তা পরিধান করতেন, তারা আদর্শ ও বঙ্গবন্ধুর অনুসারী বলেই তা করতেন। মুজিবকোট পরিহিত ইনি আবদুর রব। ছাত্রলীগের তুখোড় নেতা। পরবর্তীকালে আমাদের বন্ধু গদ্যলেখক জাকির হোসেন বুলবুলের বড় ভাই। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে যাওয়ার কালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত শহিদের নামে নামাকরণ হয় এই এলাকার। নাম হয় শহিদ আবদুর রব কলোনি। গোয়ালটুলির ঘোষদের ছেলে গঙ্গারামও শহিদ হন পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে। এই ত্রয়ী শহিদের খুনে পবিত্র এলাকা এত দিন শান্তিতে তার নিজের মতো চলে আসছিল।

সমস্যা বাড়ানো বা তৈরি করা এখন আমাদের সমাজ ও সমাজপতিদের দায়িত্বের পর্যায়ে চলে গেছে। আমরা যারা চট্টগ্রামের মানুষ, সবাই জানি এত ধনী আর বড়লোক নামে পরিচিত ব্যবসায়ী, আমলা কিংবা পুঁজিপতির এই শহরে পাঁচতারা চারতারা হোটেল আছে। আছে বিনোদন আর জৌলুসের ছড়াছড়ি। দেশে গিয়ে এই শহরের নতুন সব শপিং মলে গেলে নিজেকে ফকির মনে হয়। দুনিয়ার হেন ব্র্যান্ড বা দামি জিনিস নাই, যা এখানে মিলবে না। অথচ এই ধনীদের শহরে পর্যাপ্ত হাসপাতাল নেই। নাই চিকিত্সার মতো জরুরি বিষয়ে কোনো উদ্যেগ। বাড়তে থাকা চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদ মনসুরাবাদ হালিশহরে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। অথচ সেখানে কোনো হাসপাতাল নেই। হাসপাতাল নেই বহদ্দার হাট বা সে এলাকায়। হাসপাতাল যা আছে, তার মধ্যে জেনারেল হাসপাতাল দেখলে মনে হয় এখনো মধ্যযুগে আছি আমরা। রেলওয়ে যে হাসপাতাল, তা আসলে আছে কি নেই, বোঝা মুশকিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একটি হাসপাতাল নির্মাণ জরুরি বটে, কিন্তু তা কোথায়? কেন আগ্রাবাদের হাসপাতাল আপডেট করে সেখানকার খালি জায়গায় নতুন কিছু করার কথা ভাবা হয় না?

প্রাইভেট হাসাপাতাল কারা নির্মাণ করেন আর কেন করেন, এটা বোঝার জন্য কোনো গবেষণার দরকার পড়ে না। এই কুনজর এখন পড়েছে রেল ভবনের ঢালু বেয়ে নেমে যাওয়া কলোনি ও গোয়ালপাড়ার দিকে। এখানে দুটো কথা বলা দরকার। প্রথমত, জনসংখ্যার চাপে ভেঙে পড়া চট্টগ্রাম শহরে ভালো করে নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা বাকি নাই। যতবার দেশে যাই, প্রাণের শহর চট্টগ্রামের দশা দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। ছেলেবেলায় আমি দেখেছি, এনায়েত বাজারের মুখে বড় বড় বাদাম গাছের সারি। বাদামতলা নামে পরিচিত এখান থেকে ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা বা বেবিট্যাক্সি ভাড়া করা যেত। আর একটু এগোলে ঝাউতলায় ছিল ঝাউগাছের সারি। রেল ভবনের আরেক পাশে ছিল কদমতলী। কদমগাছগুলো কবেই উধাও হয়ে গেছে। আছে শুধু তলী। এই সবুজ অক্সিজেনবঞ্চিত শহরটিতে হাসপাতাল নির্মাণের নামে শেষ সবুজটুকু কেড়ে নিতে কালো হাত বাড়ানো হয়েছে, যার পেছনে কল্যাণের চাইতেও লুকিয়ে আছে ভয়াবহ পরিণতি।

এই জায়গাটা আর কেউ বুঝুক না-বুঝুক, যাঁরা শিল্প-সংস্কৃতি বোঝেন, তাঁরা স্পষ্ট দেখতে পান। সে কারণে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরা একযোগে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন। নানা প্রতিবাদে মুখর করে রেখেছেন সিআরবি নামের এই জায়গাটির শিরীষতলা। এই শিরীষতলা এখন বিখ্যাত এক সংস্কৃতিতীর্থ। আমি যখন দেশ ছাড়ি, তখনো এখানে সেই প্রক্রিয়া দানা বাঁধেনি। আমার শৈশব, যৌবনে এমনকি চাকরিজীবনের একটা সময় সেই এলাকায় কাটানোর কারণে আমি জানি কতটা নির্জন আর শান্তির এলাকা সেটি। রাতবিরাতে ভয়েও কেউ সেদিকে পা বাড়াতেন না। পাকিস্তান আমলে নির্জন বলে এখানে ছায়াছবির স্যুটিং করা হতো। আমি নিজে দেখেছি পাকিস্তানের জনপ্রিয় নায়ক ওয়াহিদ মুরাদকে। কালক্রমে কিছুটা ব্যস্ত হলেও জায়গাটি সুন্দর ও মনোরম করে তুলেছেন চাটগাঁর শিল্পপ্রেমী মানুষ। বলা বাহুল্য, এর আগে শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান নামে পরিচিত ডিসি হিলের জায়গাটি কৌশলে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন তাদের আগ্রাসনের মুখে শিরীষতলা।

একটা বিষয় বোঝা মুশকিল, যে সরকার, যে দল, যে গোষ্ঠীকে মসনদে আসীন করার জন্য শিল্প-সংস্কৃতির  মানুষ জান দিয়ে কাজ করেন, তাদের অর্জন বিনষ্ট করে তাদের বিপন্ন করতে তারা কেন অগ্রগামী। চট্টগ্রামের ফুসফুস বাঁচানোর কাজে এক হয়ে ওঠা সম্মানিত মানুষদের হৈব করে কথা বলা উচিত নয়। ড. অনুপম সেনের মতো দেশবরেণ্য সমাজবিজ্ঞানী যেখানে পুরোধা, সেখানে তাকে যে ভাষায় তাচ্ছিল্য করে কথা বলা হচ্ছে, তাতে সত্যি মর্মাহত হতে হয়। সরকারি দলের স্থানীয় নেতারা নিশ্চয়ই পরিবেশ ও বাস্তবতা জানেন, বোঝেন। তার পরও কেন এই গড়িমসি? কেন এই নাছোড়বান্দা মনোভাব?

পৃথিবীর যত শহর দেখেছি, তার সব কয়টাতেই মানুষের নিঃশ্বাস ফেলা ও অক্সিজেন নেওয়ার মতো সবুজ আছে। জনভারে ক্লান্ত কলকাতায় আছে গড়ের মাঠ। ঢাকায় আছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক। চট্টগ্রামে মরোমরো হয়ে বেঁচে আছে প্যারেড গ্রাউন্ড। চারদিকে শুধু দালানকোটা আর বাড়িঘর। শিশু-কিশোর-কিশোরীরা সন্ধ্যায় শিরীষতলা জমিয়ে রাখে। পহেলা বৈশাখ বা বিশেষ বিশেষ দিনে সমবেত শুদ্ধ মানুষদের জমায়েত হয় এখানে, তারুণ্যের প্রাণচ্ঞ্চলতা দেখা দেয়। এসব কি কিছুই নয়? এর কোনো মূল্য নেই? এখনো সময় আছে। অন্য কোথাও হাসাপাতাল হোক। শেষ সবুজটুকু বাঁচাতে জনগণের মনের কথা বুঝে শিরীষতলাকে রাখা হোক বিপদমুক্ত। ধরিত্রীর স্বার্থে, চট্টগ্রামের স্বার্থে, জনকল্যাণের জন্য এটা এখন জরুরি। এবারও কি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছেই যেতে হবে? না বোধোদয় ঘটবে সবার?

n লেখক : সিডনিপ্রবাসী