বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর গড়ে ২৩৬ জন বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করছে। দেশের সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় মার্চ থেকে জুন মাসে এবং সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনাও এই সময়ে ঘটে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য এবং দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বজ্রপাতের প্রবণতাও এখানে অনেক বেশি। বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, উত্তরে হিমালয় পর্বত, দক্ষিণের গরম আর আদ্র বাতাস এবং উত্তরের ঠান্ডা বাতাসের সংমিশ্রণই বজ্রপাতের উল্লেখযোগ্য কারণ। আবহাওয়াবিদদের মতে, দেশের উত্তর অঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য এবং গ্রীষ্মকালে যেসব এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা বেশি থাকে, সেসব এলাকার মেঘ থেকেই বজ্রপাতের সূত্রপাত ঘটে। তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাতের সম্ভাবনা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যু ব্যক্তির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগস্ট মাসের শুরুতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ ইউনিয়নে বজ্রপাতে একসঙ্গে ১৭ জন বরযাত্রীর নির্মম মৃত্যু সারা দেশের জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। বজ্রপাতে মৃত্যুর এ ঘটনা দেশব্যাপী বেশ কিছুদিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে দিনাজপুরে ফুটবল খেলতে গিয়ে চারজনসহ জেলায় মোট সাত জন বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করে। প্রাচীনকালে বড় বড় গাছপালা ছিল, ফলে ঘন ঘন বজ্রপাতের ঘটনা ঘটলেও গাছের জন্য মানুষের প্রাণ রক্ষা পেত। কিন্তু বর্তমানে বড় বড় গাছ কেটে ফেলায় খুব সহজেই মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে বজ্রপাত।
শহরের তুলনায় গ্রামগুলোতে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। বজ্রপাতে কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করছেন। গ্রামের কৃষকেরা বৃষ্টিতে ভিজে জমিতে কাজ করেন, জেলেরা মাছ ধরেন এবং মাঝিরা নৌকা চালান। তাঁরা দিনের অধিকাংশ সময় ঘরের বাইরে থাকেন। ফলে বজ্রপাতের সময় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে ব্যর্থ হওয়ায় ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করছেন। অন্যদিকে ছেলেমেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলতে, গোসল করতে কিংবা নদী-নালায় মাছ ধরতে গিয়ে মত্যুবরণ করছে। গ্রামের মানুষদের সচেতনতা একেবারে শূন্যের কোঠায়। তারা মৃত্যুর জন্য বজ্রপাতকে দায়ী না করে ভাগ্যকেই দায়ী করে। শুধু ভ্রান্ত ধারণা আর অসচেতনতার কারণেই হারিয়ে যাচ্ছে শত শত গ্রামীণ কর্মঠ পুরুষ।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে কিছু সাবধানতা অর্জন করা জরুরি। ভবন কিংবা খেলার মাঠে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করতে হবে। বর্ষাকালে আকাশে মেঘ কিংবা বিদ্যুত্ চমকালে ঘরের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। বেশি বেশি তালগাছসহ অন্যান্য বড় গাছ লাগাতে হবে এবং শতবর্ষীয় পুরোনো গাছগুলো রক্ষা করতে হবে। ঝড়ের সময় ফাঁকা মাঠে কিংবা বড় গাছের নিচে থাকা যাবে না। পিতামাতাকে অবশ্যই তাদের সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, বজ্রপাতের সময় ছোট শিশুরা যেন কোনোভাবেই ঘরের বাইরে যেতে না পারে। সর্বোপরি বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
