১২ জেলায় বন্যার অবনতি

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২১, ০২:১২

আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় অন্ততঃ ১২ জেলার নিম্নাঞ্চল বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের এই জেলাসমুহে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

উজানে ভারি বর্ষণ চলতে থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার বিস্তার ঘটছে। অব্যাহত পানি বৃদ্ধির কারণে গতকাল শনিবার সকালে দেশের আটটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। ইতোমধ্যে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ফরিদপুরে নিম্নাঞ্চলে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। গতকাল শনিবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর অবস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে নদ-নদীর পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসে বলা হয়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদ-নদীর পানি বাড়ছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। 

বন্যা হতে পারে এ মাসেই

গঙ্গা নদীর পানি কমছে, যা আগামী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। অন্যদিকে পদ্মা নদীর পানি স্থিতিশীল রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মার পানি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাড়তে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, উত্তর-মধ্যাঞ্চলের জামালপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা; মধ্যাঞ্চলের মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, শরিয়তপুর ও চাঁদপুর জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এতে আরও বলা হয়, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পুরাবাড়ি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। আটটি নদীর পানি ১২টি পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা নদীর পানি সুরেশ্বর ও গোয়ালন্দ পয়েন্টে, মেঘনা নদীর পানি চাঁদপুরে বিপত্সীমার উপর দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। যমুনা নদীর পানি ছয়টি পয়েন্টে বিপত্সীমা পার হয়েছে- আরিচা, মথুরা, সিরাজগঞ্জ, কাজীপুর, সারিষাকান্দি, বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনা নদীর পানি বিপত্সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্রের পানি চিতলমারী, ধরলার পানি কুড়িগ্রাম ও দুধকুমার নদীর পানি পাটেশ্বরী স্টেশনে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

সেপ্টেম্বরের শেষে আবার বন্যার আশঙ্কা

অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ী ঢল নেমে আসায় কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। গতকাল শনিবার ধরলার পানি বিপৎসীমার ৩১ সে.মি ও ব্রক্ষপুত্র নদের পানি বিপদ সীমার ১৮ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভুঁইয়া জানান, ব্রহ্মপুত্র-যমুনায় আগামী ৪৮ ঘণ্টা পানি বাড়বে। এ সময় বাহাদুরাবাদ, ফুলছড়ি ও মথুরা পয়েন্টে পানি বিপত্সীমার উপরে বয়ে যেতে পারে। তিস্তা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বিপত্সীমার কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। এদিকে শনিবার আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক জানান, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তত্সংলগ্ন এলাকায় একটি লঘূচাপ সৃষ্টি হয়েছে। মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে আগামী দু’দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়তে পারে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিপত্সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপরে যমুনার পানি। বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তা-ঘাটে পানি উঠে পড়েছে। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঠ। সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন,যমুনা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। গতকাল শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনায় পানি বেড়েছে ১১ সেন্টিমিটার। এলাকাবাসী জানান, বন্যাকবলিত এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় নষ্ট হচ্ছে রোপা, আমনক্ষেত, বীজতলা, আখ, পাট, তিল, সবজিবাগানসহ বিভিন্ন ফসল। এদিকে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নদ-নদী ও চলনবিলের পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভাঙন অব্যাহত থাকায় অসহায় হয়ে পড়েছেন নদীপাড়ের মানুষ।অন্যদিকে পানি বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়েছেন জেলার গো-খামারিরাও। এসব এলাকার বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাটে পানি উঠে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন বন্যাদুর্গতরা। মালশাপাড়া বাঁধ এলাকার শাহানা খাতুন জানান, পাঁচ দিন ধরে তাদের বাড়িতে পানি উঠেছে। ছেলে-মেয়ে আর বৃদ্ধ শাশুড়িকে নিয়ে বাঁধের উপর আশ্রয় নিয়েছেন।

ছয় জেলার বন্যার অবনতি, লক্ষাধিক পরিবার পানিবন্দি

বৃষ্টি আর রোদে অনেক কষ্ট হচ্ছে। এক বেলা রান্না করে তাদের তিন বেলা খেতে হচ্ছে। কাওয়াকোলা গ্রামের জিয়া উদ্দিন বলেন, ‘আমগোর পুরো গ্রাম বানের পানিত ডুইবা গেছে। আমরা সরকারের আশ্রয়কেন্দ্রে কেমনে যাবো। গরু ছাগল নিয়ে মহাবিপদ হয়েছে। টিউবয়েল ডুবে গেছে; খাওনের পানি, কোনো ত্রাণ পাইনি। কোনো মেম্বর-চেয়ারম্যান আমাদের খোঁজ নিচ্ছে না।’ সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি উপপরিচালক আবু হানিফ বলেন, আমাদের চরাঞ্চলে যে সকল কালাই, ধান, ভুট্টা, বাদাম ও সবজি চাষাবাদ করা হয়েছিলো তার সবই বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে এখনও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ জানা সম্ভব হয়নি। কারণ বন্যার পানি এখনো বৃদ্ধি থাকায় অনেক নতুন নতুন অঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। পানি কমতে শুরু করলে তখন জানানো যাবে।

কুড়িগ্রামে ভাঙন তীব্র রূপ ধারন করেছে

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ফজলে ইলাহী স্বপন জানান, বৃষ্টি আর উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সেখানকার বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। জেলায় ১০ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ও ৮৫ হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। চরাঞ্চলগুলোতে গ্রামীণ কাঁচা সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় এবং বাড়িঘরের চারদিকে পানি ওঠায় নৌকা বা কলাগাছের ভেলাই যোগাযোগের একমাত্র ভরসা। ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার চরাঞ্চলের নীচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে ঘর-বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্ততঃ ৩০ হাজার মানুষ। পানি বাড়ার সাথে সাথে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, দুধকুমারসহ অন্যান্য নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। চারিদিকে পানি ওঠায় বন্যা কবলিতরা গবাদিপশু নিয়ে স্থানীয় ওয়াপদা বাঁধ বা উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। দেখা দিয়েছে গোখাদ্য সংকট। তিস্তার ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী কোন প্রকল্প না থাকায় নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘর-বাড়ী ফসলী জমিসহ নানা স্থাপনা। এ অবস্থায় ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ করছে। তিস্তার পানি বাড়া-কমার সাথে সাথে রাজারহাট উপজেলার চর গতিয়াসাম, বুড়িরহাট, তৈয়বখাঁ, খেতাবখাঁ, ঠুটা পাইকর এবং উলিপুর উপজেলার গোড়াই পিয়ার, দালালপাড়া, হোকডাঙ্গা, ডাক্তার পাড়া, অর্জুনসহ বেশ কিছু এলাকায় ভাঙন তীব্র রূপ নিয়েছে। এসব এলাকার শতাধিক পরিবার ভাঙনের কবলে পড়ে ঘর-বাড়ি অন্যত্র সরিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, গতকাল শনিবার বিকেল ৩ টায় ধরলাার পানি সেতু পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মন্জুরুল হক জানান, নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমির আমন ক্ষেত ও ৮৫ হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে আছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আরিফুল ইসলাম জানান, উজানে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় আশা করছি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ধরলা ও তিস্তার পানি কমতে শুরু করবে। তবে ব্রহ্মপুত্রের পানি বর্তমানে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলেও আরো দুইদিন পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।

ইত্তেফাক/কেকে