সুস্থ থাকিতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নাই

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২১, ২০:৪৮

দেশে করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হইলেও প্রকৃতপক্ষে সমগ্র দেশে ইহা লইয়া ভীতি ও আতঙ্ক এখনো কাটে নাই। ইহারই মধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আরেক আতঙ্কের কারণ হইয়া উঠিয়াছে ডেঙ্গু। গত কয়েক বত্সর ধরিয়া আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি পাইতে দেখা যায়। এবারও তাহার ব্যতিক্রম হইল না। গতকালের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় ২৫২ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হইয়াছেন। গত প্রায় এক মাস ধরিয়া প্রতিদিনই দুই শতাধিক ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাইতেছে। ইতিমধ্যে ডেঙ্গু সন্দেহে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন ৪২ জন। রোগতত্ত্ব, রোগ নির্ণয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য মতে, গত জানুয়ারি হইতে প্রায় ৯ হাজার ৮৫৭ জন রোগী ডেঙ্গু লইয়া বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছেন। ইহার চাইতে উদ্বেগের খবর হইল, করোনার মতো ডেঙ্গুও তাহার রূপ বদল করিতেছে। গতকাল ইত্তেফাকের এক অনলাইন খবরে বলা হইয়াছে, ডেঙ্গু রোগীদের শরীরে শনাক্ত হইয়াছে নূতন এক ভ্যারিয়েন্ট বা ধরন। ইহার নাম ডেনভি-৩। ইহা নিশ্চিত করিয়াছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ বা বিসিএসআইআর।  রাজধানীবাসীও এই ধরনটিতে অধিক আক্রান্ত হইতেছেন।

উল্লেখ্য, দেশে প্রথম বারের মতো ডেঙ্গু রোগ ধরা পড়ে ২০০০ সালে। তবে ডেনভি-৩ শনাক্ত হয় ২০১৭ সালে। ইতিমধ্যে ডেনভি-১ ও ২-এর বিরুদ্ধে আমাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা গড়িয়া উঠিয়াছে; কিন্তু ডেনভি-৩ লইয়া আমরা বিপদে রহিয়াছি। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, ডেনভি-৩ ডেনভি-১ ও ২ হইতে অধিক ভয়ংকর। কেহ ইহাতে আক্রান্ত হইলে তাহার অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার আশঙ্কা অধিক থাকে। হঠাত্ করিয়া জ্বরে বা সামান্য জ্বরে দুই-তিন দিনের মধ্যে প্ল্যাটিলেট কমিতে থাকে। ইহাতে শুরু হইয়া যায় রক্তক্ষরণ। পেটে বা বুকে জমিয়া যায় পানি। হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। শিশুদেরও অনেকে ইহাতে আক্রান্ত হইতেছে। এই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে সবচাইতে অধিক দরকার জনগণের সচেতনতা। ডেঙ্গু বা এডিশ মশার প্রজননক্ষেত্রগুলি কীভাবে তৈরি হয় তাহা আমাদের জানা দরকার। ফুলের টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার প্রভৃতিতে জমিয়া থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিশ মশা বংশ বিস্তার করিয়া থাকে। সেই মশা আবার সকাল ও বিকালের দিকে অধিক কামড়ায়। তাই এই সময় সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। ঔষধ স্প্রের মাধ্যমে ডেঙ্গু মশার লার্ভা ধ্বংস করিয়া বা ফগার মেশিনের সাহায্যে মশা মারিয়া আমরা এই রোগ প্রতিরোধ করিতে পারি। মশারি ও জানালায় নেট ব্যবহারের মাধ্যমেও আমরা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারি। তবে সবচাইতে গুরুত্ব আরোপ করিতে হইবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি। করোনার মতো ডেঙ্গু হইতে রক্ষায়ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নাই।

নিজের ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখিবার পাশাপাশি প্রতিবেশীর বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশও সুন্দর ও স্বাস্থ্যদায়ক রাখিতে হইবে। শুধু ডেঙ্গু বা করোনা নহে, অন্যান্য অসুখবিসুখ হইতে পরিত্রাণ পাইতে হইলেও আমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা একান্ত জরুরি। কেননা জানা-অজানা নানা ভাইরাস আমাদের  চারিপাশে ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। তাহাছাড়া আমাদের দেশ একটি জনবহুল দেশ। অধিক জনসংখ্যার কারণে এখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা কঠিন। ফুটপাত কিংবা হাটবাজারে অনেক সময় আমরা ভিড়ের কারণে ঠিকমতো চলাফেরাই করিতে পারি না। উন্নয়নশীল বিশ্বের ইহা এক সাধারণ সমস্যা। জনসংখ্যার ঘনত্ব অধিক হওয়ার কারণে যে কোনো রোগের সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব নহে। তাহা ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদ হইতে শুরু করিয়া উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় আবর্জনার স্তূপ। সড়ক ও জনপথের অনেক রাস্তায়ও ম্যানহোল খোলা থাকে। সেখানে যে কেহ পড়িয়া হতাহত হইতে পারেন। তাহা ছাড়া সেখানেও গড়িয়া উঠিতে পারে এডিশ মশার কারখানা। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই দায়িত্বশীল ও সক্রিয় হইতে হইবে। নৌপথে হাজার হাজার নৌকা, লঞ্চ প্রভৃতি যানবাহন চলিতেছে; কিন্তু দুঃখজনক হইল সেখানেও কোনো সঠিক বর্জ্যব্যবস্থাপনা গড়িয়া উঠে নাই। ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলিয়া নদীদূষণ করা হইতেছে। লঞ্চ ও নৌকায়ও যে মশার প্রজননক্ষেত্র তৈরি হইতেছে না তাহার নিশ্চয়তা কোথায়। মোটকথা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। তাই এই ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই সচেতন ও সতর্ক হইতে হইবে।