ইলামতি নাম রাখার প্রস্তাব
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ও শিবগঞ্জ সংবাদদাতা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের নতুন নাবি (বিলম্বে ফলন হয়) জাতের সন্ধান মিলেছে। বিশেষ বৈশিষ্ট্যের এ জাতের আমটিকে সংগ্রামী কৃষক নেতা ইলা মিত্রের নাম অনুসারে ইলামতি রাখার প্রস্তাবও দিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক মোজদার হোসেন বলেন, আমরা এর আগে নাবি জাত হিসেবে গৌড়মতি মুক্তায়িত করেছিলাম। আমাদের সন্ধান পাওয়া এই গুটি আমটি গত ও চলতি বছর পর্যবেক্ষণ করেছি। এর মিষ্টতা গৌড়মতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমটির আলাদা বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের আকৃষ্ট করেছে। নাবি জাত হিসেবে আমটি সম্ভাবনাময়। মোজদার হোসেন আরো বলেন, আমরা জানি এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য ইলামিত্র অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাই আমরা চিন্তাভাবনা করছি কৃষকদের প্রতি ইলামিত্রের ত্যাগ ও ভালোবাসাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নাবি জাত হিসেবে আমটির নামকরণ ‘ইলামতি’ করার। আমরা আমাদের দুই বছরের পর্যবেক্ষণ ও আমটির সম্ভাবনার বিষয়টি সামনে এনে নতুন জাত হিসেবে এটির মুক্তায়নের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে নিচ্ছি।
ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের এই আমের কথা ২০১৮ সালের দিকে জানতে পারেন চৌডালা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মু. মোমিনুল ইসলাম। তিনি বিষয়টি তার অফিসের তত্কালীন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহকে জানান। কিছু দিনের মাথায় হাবিবুল্লাহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে উদ্যানতত্ত্ববিদ হিসেবে বদলি হন। মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জানান, হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে তারা নাবি ও আগাম জাতের আমের জাত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছিলেন। গোমস্তাপুর ও নাচোল উপজেলায় দুটি বাগানের বিষয়ে জানতে পারেন। এরপর গোমস্তাপুরের বাগানের গাছগুলো গত দুই বছর পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহর মতে, সন্ধান পাওয়া আমটির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। এটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি নাবি জাতের। সেপ্টেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত এ আম গাছে রাখা যায়। এর গড় ওজন ৪২৭ গ্রাম, মিষ্টতা বা টিএসএস ২১-২২ শতাংশ, পাকলে হালকা হলুদাভাব সবুজ রং ধারণ করে ও সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।
এই আমের ব্যাপারে স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা জানান, আমের মৌসুমের শুরুতে যে পরিমাণ আম পাওয়া যায় ও জাত বৈচিত্র্য থাকে, শেষ দিকে এসে সে অবস্থা থাকে না। আমের প্রচলিত জাতগুলোর মধ্যে আশ্বিনা সবচেয়ে শেষে পাকে। আশ্বিনার মধ্য দিয়েই শেষ হয় আমের মৌসুম। তাই অনেকে মনে করেন যদি আরো কিছু বিলম্বিত জাত থাকত তবে বেশি সময় ধরে আমের স্বাদ নেওয়া যেত। বলাবাহুল্য বাণিজ্যিকভাবেও এর সুবিধা পাওয়া যেত। প্রকৃতিই যেন আমপ্রেমীদের সেই ইচ্ছা পূরণ করে দিয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার চৌডালা ইউনিয়নের বেলাল বাজার। এখানেই পারিবারিক বাগান রয়েছে আতিকুল ইসলাম আরমানের বাবা ও চাচাদের। প্রতি বছরই বাগানে মুকুল অবস্থায় আম ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতেন তারা। তাদের বাগানে বিভিন্ন জাতের আমগাছের পাশাপাশি পাঁচটি গাছ ছিল গুটি জাতের। আমগাছগুলো তারা একই ইউনিয়নের কদমতলী এলাকায় তাদের দাদার ভিটামাটিতে থাকা পুরোনো আমের গাছ (মাতৃগাছ) থেকে কলমের মাধ্যমে এনে লাগিয়েছিলেন। ইচ্ছা ছিল গাছগুলো একটু বড় হলে সেগুলোকে প্রচলিত আশ্বিনা বা অন্য কোনো জাতের কলম করে নিবেন। কিন্তু ফলন শুরু হওয়ার পর আমের আকার ভালো হওয়ায় অন্য কোনো জাতে পরিবর্তন করা হয়নি। এভাবেই থেকে যায় পাঁচটি গাছ। সাধারণত ল্যাংড়া বা ফজলি আম পাড়ার সময়ই ঐ পাঁচটি গাছের আম ভেঙে নেওয়া হতো। তবে আমগুলো কাঁচাই থাকত।
২০১৬ সালের দিকে আতিকুল ইসলাম আরমান নিজেই নাম লেখান আম ব্যবসায়। সে বছর তিনি পাশের আশ্বিনা আম বাগানের আম কিনেছিলেন। তাই আম মৌসুমের প্রায় শেষ পর্যন্ত চলে তার আম কেনাবেচা। বাগানের অন্য সব জাতের আম পাড়া শেষ। বাগানের ঐ পাঁচ গাছের আম তখনো পাকেনি। আতিকুল ইসলাম ভাবেন, যত দিন গাছে আম না পাকে, ততদিন আম পাড়বেন না। সেই ভাবনাতেই যেন উন্মোচিত হলো নতুন এক নাবি জাতের আম। আতিকুল ইসলাম বলেন, যেহেতু পাশের আশ্বিনা বাগানে আম আমার কেনা ছিল, তাই ঐ পাঁচটা গাছে আম পাকা পর্যন্ত অপেক্ষা করি। যখন আমার মনে হয়েছে এই আম বিলম্বে পাকে তখন ৬ হাজার টাকা মণ করে আম বিক্রি করলাম। তার পরের বার খুব বেশি আর হয়নি। শিলাবৃষ্টির কারণে আমে দাগ হয়ে গিয়েছিল। তারপরও ৭ হাজার ৩০০ টাকা মণে বিক্রি হয়েছিল। গতবার ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গাছে আম রেখেছিলাম, আরো কিছুদিন রাখা যেত। তারপরও ১০ হাজার ২০০ টাকা মণ ধরে বিক্রি করেছিলাম ১০ মণ আম। আমের ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখে বেশ কয়েক বছর আগে ৩০টি ডগা নিয়ে নাচোলে বাগান গড়ে তুলেছেন একজন। তার বাগানেও প্রায় ১৮০টি গাছ আছে।
