এবার উচ্চ মাধ্যমিক দেওয়ার কথা মেয়েটির (১৮)। এর মধ্যেই তাকে বিয়ে দিতে উদ্যোগী হয় পরিবার। কিন্তু মেয়েটির সাফ কথা, জিহাদের ময়দানে ডাক এলে সে সামনের সারিতে থাকবে। এমনকি শহিদি মৃত্যু হলেও সে পিছু হটবে না। ছেলেও যদি এমন মতাদর্শের হয় তাহলে বিয়ে হবে, অন্যথায় না। গত দুই বছর ধরে নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেয়েটি জিহাদের ময়দানে অংশগ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে বলে দাবি করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)।
সিটিটিসি গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের এই নারী সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। এ সময় তার কাছ থেকে সিম কার্ড ও মেমোরি কার্ডসহ একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছেন সিটিটিসির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান।
সিটিটিসির দাবি, এই প্রথম আনসার আল ইসলামের কোনো নারী সদস্যকে গ্রেফতার করা হলো। এর আগে অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনের নারী সদস্য গ্রেফতার হলেও তারা নাবিলার মতো ‘প্রশিক্ষিত’ ছিলেন না। গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে আসাদুজ্জামান বলেন, আনসার আল ইসলামের মিডিয়া শাখায় অর্থাত্ ‘জঙ্গিবাদের প্রচার প্রচারণার’ দায়িত্ব পালন করত মেয়েটি। তবে সামরিক শাখার সঙ্গেও তার ‘যোগাযোগ’ ছিল।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মেয়েটি জানায়, সে ২০২০ সালের প্রথম দিকে নিজের নাম পরিচয় গোপন করে ছদ্মনামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলে। এক সময় সে ফেসবুকে আনসার আল ইসলামের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ‘তিতুমীর মিডিয়া’র খেঁজ পায়। তখন সে ঐ পেজে যুক্ত হয়ে আনসার আল ইসলামের বিভিন্ন উগ্রবাদী ভিডিও, অডিও এবং আর্টিকেল সম্পর্কে ধারণা পায় এবং তাদের মতাদর্শ নিজের ভেতরে লালন করতে শুরু করে। একপর্যায়ে এসব মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে যুক্ত হয়। ফেসবুক ও টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফরমে ছদ্মনামে একাধিক অ্যাকাউন্ট খুলে তিনি কাজটি করতেন বলে কাউন্টার টেরোরিজম জানিয়েছে।
সিটিটিসি প্রধান বলেন, সে আনসার আল ইসলামের মতাদর্শ প্রচারের জন্য ব্যাপকভাবে টেলিগ্রাম মাধ্যম ব্যবহার করত। টেলিগ্রামে তার চারটি অ্যাকাউন্ট এবং সেই টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ১৫টির বেশি চ্যানেল সে চালাত। এসব চ্যানেলে সে আনসার আল ইসলামের বিভিন্ন উগ্রবাদী সহিংস ভিডিও, অডিও, ছবি ও ফাইল শেয়ার করত। তার সবগুলো টেলিগ্রাম চ্যানেল মিলে আনুমানিক ২৫ হাজার সাবস্ক্রাইবার আছেন, যারা নিয়মিত তার চ্যানেলগুলো অনুসরণ করেন।
‘জিহাদ কেন প্রয়োজন’, ‘একাকি শিকারি লোন উলফ’, ‘স্লিপার সেলগুলোতে গোয়েন্দাদের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধের উপায়’, ‘নীরবে হত্যার কৌশল’, ‘পুলিশ শরিয়তের শত্রু’সহ বহু উগ্রবাদী বই বিভিন্ন সময়ে মেয়েটির টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলো থেকে প্রকাশ করা হতো বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তাকে ছাড়া আনসার আল ইসলামের আর কোনো নারী সদস্যের সন্ধান পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে সিটিটিসি প্রধান বলেন, এ বিষয়ে তাকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। তবে এই মুহূর্তে বিস্তারিত আমরা বলতে চাইছি না। মেয়েটির টেলিগ্রাম চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবারদের মধ্যে কোনো নারী আছেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাবস্ক্রাইবার কোনো নারী থাকতে পারে। আমরা মূলত তরুণদের টার্গেট করে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করছি।
মেয়েটির জঙ্গিবাদে জড়ানোর ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা কী ছিল জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, পরিবার চেষ্টা করেছিল তাকে জঙ্গিবাদ থেকে দূরে সরিয়ে আনতে। কিন্তু পারেনি। পরিবারের অমতে তিনি এক আত্মীয়র বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে বেরিয়ে পড়েন। তার বিরুদ্ধে বাড্ডা থানায় মামলা হয়েছে। পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে জানান তিনি।
