কিশোর উপন্যাস

দুরন্ত দুখু

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২১, ১৯:৫২

॥ চৌদ্দ ॥

দুখুর ঘাড়ে অপবাদের বোঝা

 

পুব আকাশে কচি সূর্য উঠতে শুরু করেছে। আলোর চিকচিক হাসি ধুয়ে দিচ্ছে লোলার মন। ক্যানভাসের চেয়ারটি টেনে নিয়ে সে বসল কিচেন কোয়ার্টারের পেছনে গার্ডেনের পাশে। কাঁটাতারঘেরা বাগানে পুঁতেছিল গোটা চার-পাঁচ দোপাটি আর গাঁদাগাছ। পুঁতেছিল একটি লাউয়ের বীজ। ফুলে ফুলে ভরে গেছে বাগান। কাঁটাতারের বেড়া জড়িয়ে ছড়িয়ে গেছে লাউয়ের লতা। লম্বা লম্বা লাউ ঝুলে আছে মাটি পর্যন্ত। রোজ ভোরে লোলা এখানে বসে আর প্রকৃতির অপরূপ শোভা দেখে মুগ্ধ হয়। আনন্দে ভরে ওঠে তার মন।

নোরা হঠাৎ খেয়াল করলেন লোলা আর সেখানে বসছে না। লোলার সৎবাবা পলও বুঝল একটা কিছু হয়েছে। বিকলাঙ্গ মেয়েটি কেন বসছে না বাগানের পাশে তার আনন্দের জায়গায়? প্রশ্নটি দুজনকেই ভাবিয়ে তুলল। সুযোগ বুঝে একদিন নোরা জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে, লোলা? এখন ওখানে বসো না কেন?’

‘তোমরা যখন বাসায় থাকো না, যখন আমি একা থাকি তখন এক সাহেব রোজ এখানে আসে। আমার সৎবাবা পল সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে। আরও বলে আমাকে বিয়ে করবে। তার সঙ্গে পালিয়ে যেতে বলে। না গেলে আমাকে তুলে নেওয়ারও হুমকি দিয়েছে।

লোলার কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল নোরা। পল বাসায় ছিল না। এ বিপদ থেকে উদ্ধারের উপায় ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল লোলার আসল বাবা, তার প্রাক্তন স্বামী বেটস এবং গার্ড সাহেবের কথা। একমাত্র এ দুজনই তার মেয়ের সুরক্ষায় এগিয়ে আসবেন ভাবলেও বেটসের বিষয়ে আস্থা পেলেন না।

কল্পিত বাঘের ভয়ের সঙ্গে হঠাৎ যোগ হয়ে গেল বাস্তবের ভয়। নোরা দেখলেন লাঠিতে ভর দিয়ে চোখে চশমা-পরা লোলার বাবা এসে বহুদিন পর সামনে দাঁড়িয়েছেন। তার চাউনি আর ভঙ্গি কঠোর। নির্মমও। কথাবার্তার এক পর্যায়ে বেটস জানাল, ‘লোলাকে নিতে এসেছি আমি।’ মাটিতে কয়েকবার লাঠির ঠোকা দিয়ে নিজের শক্ত অবস্থানের কথাও জানান দিলো সে।

নোরাও কঠোর হয়ে বলল, ‘খোঁড়া মেয়েটাকে এতদিন পর কেন নিতে এসেছ? মায়ার টান, না অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে তোমার?’

একথার জবাব দিলো না বেটস।

বিকলাঙ্গ খোঁড়া হতভাগি লোলা শুনে ফেলেছে বাবা-মায়ের কথা। আকাশের বিশাল সীমানায় হারিয়ে গেল তার চোখের দৃষ্টিসীমা। একসময় সে-চোখ থেকে ঝরে পড়তে লাগল জল। নোরার চোখ থেকেও টসটস করে ঝরে পড়ল কয়েক ফোঁটা জল। তিনি বুঝে ফেলেছেন ভণ্ড সাহেবেরই লোক বেটস। মেয়েকে বিক্রি করে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য। লোভী এই বাবার কাছ থেকে কোনো কন্যাসন্তান এর বেশি কিছু আশা করতে পারে না।

‘আবার আসব মেয়েকে তুলে নিতে’―এমন কথা বলে চলে যাওয়ায় ভয়ে নোরার টেনশন বেড়ে গেল। উদ্বেগের এ মুহূর্তে শুনল ঢংঢং করে বেজে ওঠা পাঁচটার ঘণ্টাধ্বনি। আর দেখল আপনমনে গান গাইতে গাইতে এগিয়ে আসছে দুখু, বালকটিকে দেখে প্রাণের শুষ্কতা কমে গেল। গলা ভিজে উঠল জলে। একটু পরই এলেন গার্ড সাহেব।

নোরার মুখ থেকে সব শুনলেন মিস্টার বোস। একবার খেপে গিয়ে বললেন, ‘বললেই হলো! তুলে নেওয়া এত সহজ! ওই বুড়োর দুই ঠ্যাং ভেঙে দেবো আমি।’

নোরা বলল, ‘জোয়ান গুণ্ডা যদি পাঠায় মেয়েকে তুলে নিতে?’

একটু থমকালেন মিস্টার বোস। তারপর আবার বললেন, ‘থানায় একটা ডায়ারি করে রাখব।’

শান্তস্বরে কথাটা বললেও হঠাৎ ঘুরে উঠল তার চোখের বল। বলের কন্দর ফুঁড়ে ছুটে বেরোতে লাগল আত্ম-অহংকারের রক্তলাল চিহ্ন। টেবিলের উপর সজোরে একটা ঘুসি মেরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘দুখু!’

‘আজ্ঞে আমি হাজির।’

‘কোমর বেঁধে প্রস্তুত হও।’

‘আজ্ঞে, প্রস্তুত আছি আমি। যা বলছেন সবই তো করছি।’ বুক উঁচিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে বলল দুখু।

এবার নোরাকে বললেন, ‘লোলার জামা-জুতো সুটকেসে ভরে দাও। এখনই দুখু ওকে নিয়ে চলে যাবে প্রাসাদপুরের বাংলোয়। মেমসাহেবকে বোলো দক্ষিণদিকের ঘরটি ওকে ছেড়ে দিতে। ওই ঘরে পিয়ানো আছে। লোলা পিয়ানো বাজিয়ে সময় কাটাবে। দেখি কে ওকে তুলে নিতে আসে!’

নোরা বলল, ‘আমিও যাব। ওকে রেখেই ফিরে আসব।’

 

পরের দিনও বেটস এসেছে মেয়েকে নিতে।

নোরা বলল, ‘এক মুসলমান ছেলের সঙ্গে পালিয়েছে লোলা।’

বেটস ধমক দিয়ে বলল, ‘পালিয়েছে, নাকি লুকিয়ে রেখেছ?’

নোরা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘পালিয়েছে। তোমার ভয়ে পালিয়েছে। মুসলমান ছেলের সঙ্গে পালিয়েছে।’

বেটস বলল, ‘এর শেষ দেখে ছাড়ব আমি। ওই ছোঁড়াকে ছাড়ব না, তোমাকেও না।’

নোরা হতবাক হয়ে বসে রইল। বেটস চলে যাওয়ার পর ভাবতে বসল―কেন এত সহজে মিথ্যা বলল নিজে! বলার আগে তো একটুও ভাবেনি। একটা নিরপরাধ সুবোধ ছেলে কেন দোষের অংশীদার হবে? কেন বইবে অপবাদের বোঝা! একি করলাম আমি! ভাবতে ভাবতে শূন্যচোখে তাকিয়ে রইল ঝুলে থাকা লাউ আর গাঁদাফুলের দিকে। প্রকৃতি আপন মহিমায় ছড়ায় ঔজ্জ্বল্য, ভালো লাগা, আবার জীবনপ্রকৃতিও আপনি-আপনি ভরে ওঠে মলিনতা আর কলুষতায়। ভাবতে গিয়ে নোরা এ মুহূর্তে মেয়ের চেয়েও বেশি মায়া অনুভব করতে লাগলেন নিরপরাধ দুখুর জন্য।

সাহেবের বাড়িতে খারাপ ছিল না দুখু। তবে এই চাকরিও কয়েক মাসের বেশি স্থায়ী হলো না। কাজে অবহেলা বা কোনো অপরাধের জন্য তার চাকরি যায়নি, লোলা-দুখু ঘটনার জটিল অবস্থার জন্যই চাকরিটা চলে গেল নিরপরাধ দায়িত্ববান দুখুর।

দু মাসের বেতন পঞ্চাশ টাকা হাতে নিয়ে সে বেরিয়ে গেল জীবনের আরেক অচেনা পথের দিকে।

 

 

 

॥ পনেরো ॥

জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত

 

পকেটে আছে দু মাসের অগ্রিম পঞ্চাশ টাকা। পকেট গরম থাকায় হতাশা ছুঁতে পারল না দুখুকে। চাকরি চলে যাওয়ায় ক্ষোভ নেই। তবে কষ্ট হয়েছে গার্ড সাহেবের স্ত্রী হিরণপ্রভা ঘোষের জন্য। ছোটো ভাইয়ের মতো আদর পেয়ে শৈশবের ভবঘুরে জীবনের আদরের ঘাটতি পুষিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। দুখু অনেক গান শুনিয়েছে দিদিকে। তাঁকে দিদি বলেই ডাকত দুখু। গার্ড সাহেবের অতিরিক্ত নেশা চূড়ান্তভাবে ভেঙে দিয়েছিল দিদির মন। সেই ভাঙা মন কি আর জোড়া লেগেছিল, নিশ্চিত লাগবে না, জানত দুখু। সেই নৈরাশ্য বুকে ঢুকে থাকলেও কিছুই টানল না দুখুকে। যদিও তাঁকে ছেড়ে আসার সময় কষ্ট হয়েছে, কষ্টের বিষজ্বালা ক্রমশ উড়ে যাচ্ছে। কেবল পঞ্চাশ টাকাই সম্বল নয়, গ্রামীণ জনপদ চুরুলিয়া থেকে বেরিয়ে বর্ধমান জেলার মহকুমা শহর, কয়লাখনি অঞ্চল আসানসোলে চলাফেরা করার কারণে চিনে নিয়েছে সে এখানকার রাস্তাঘাট, দোকানপাট ইত্যাদি। মানুষজনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে―মফস্বল শহর, কলকারখানা, নানা পেশা, নানা জাতের লোক দেখেশুনে নিজের অগোচরে অভিজ্ঞতা ও বোধের ডালি পূর্ণ করেছে। দেখেছে সর্বহারাদের। আত্মার ডাক থেকেই সে নিজেকে আবিষ্কার করল এ দলের সদস্য হিসেবে। আর তাই সাহেববাড়ির চাকরি গেলেও অকূলপাথারে ডুবে গেল না দুখু। আসানসোলেই রুটি খেতে এসে দেখা হয়ে গেল চা-রুটির দোকানের এক মালিকের সঙ্গে।

সুঠাম কিশোর দুখুর মায়াবী মুখ আর কথাবার্তা শুনে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ?’

‘আজ্ঞে, বেকার।’

‘চাকরি করবে?’

‘করব।’

‘রাতের ঘুম ছাড়া বাকি সময় পুরোটাই কাজ করতে হবে, রাজি?’

‘রাজি।’

‘খাওয়া মিলবে তিনবেলা। মাইনে যৎসামান্য, মাসে এক টাকা। রাজি?’

মনে মনে দুখু ভাবল―তিনবেলা খাবার জুটবে, কম কীসে! এক টাকা মাইনের কথা স্পর্শ করল না তার অহংবোধ। মাথা ঝুঁকিয়ে জানান দিলো রাজি।

‘তবে একটা সমস্যা আছে।’ বলতে গিয়েও থেমে গেলেন মালিক।

‘কী সমস্যা?’ এবার প্রশ্ন করল দুখু।

‘রাত কাটাতে হবে অন্য জায়গায়। এখানে থাকার ব্যবস্থা নেই।’

চমৎকার! এমন চরমতম ভাগ্যের জন্য কষ্ট পেল না দুখু। ঈর্ষান্বিত হলো। নিজেকে নিজেই হিংসা করে বলল, ‘বাঃ, চমৎকার ভাগ্য!’

মালিক শেষ পর্যায়ে আবার জোর দিয়ে বললেন, ‘তাহলে কাজ করবে তো?’

ঠান্ডা স্বরে দুখু জবাব দিলো, ‘করব।’

‘ঠিক আছে, কাজে লেগে যাও। মালপত্র কিছু থাকলে আপাতত আমার কুশের তলে রেখে দাও। রাতের বেলায় নিয়ে যেয়ো।’

‘জিনিসপত্তর নেই। চালচুলো নেই। গায়ের কাপড় ছাড়া সঙ্গে কিছু নেই। ভাগ্যহতদের কিছুই থাকে না’, বলল দুখু।

ছন্দের জাদু যেন স্পর্শ করল দোকান-মালিককে। দুখুর কথা বলার ধরন দেখে বুঝলেন এ ছেলে অসাধারণ মেধাবী। অনেক গুণের অধিকারী। ভাবনার আড়ালে আড়ালে নত হতে লাগলেন তিনি। তারপর সজ্জন ব্যক্তির মতো জিজ্ঞেস করলেন, ‘কার দোকানে কাজ করবে, লোকটা কেমন, জিজ্ঞেস করলে না যে কিছু?’

‘জানি সব। আপনার নাম এম বখ্‌শ। হুগলি জেলার সজ্জন লোক আপনি। জীবিকার তাগিদে ছুটে এসেছেন আসানসোলে, চা-রুটির দোকান চালিয়ে সৎ উপায়ে আয়রোজগার করছেন এখানে।’

হতবাক হয়ে বখ্‌শ প্রশ্ন করলেন, ‘কীভাবে জানলে?’

আমি চা-রুটি খাওয়ার সময় এক ভদ্রলোক এসেছিলেন। ক্যাশের পাশে বসে আপনার সঙ্গে কথা বলছিলেন। আপনাদের আলাপচারিতা থেকে জেনে গেছি সব।

আবারও অবাক চোখে দুখুর দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। চোখ নামিয়ে লাজুক দুখু বসে রইল তাঁর সামনে। অনেকক্ষণ পর এম বখ্‌শ বললেন, ‘কাজে লেগে যাও।’

ব্যস। কাজে আটকে গেল দুখু। প্রথম কয়েক ঘণ্টা মানিয়ে নিতে অসুবিধা হলেও চা-রুটি খদ্দেরদের সামনে তুলে দিতে গিয়ে অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারল। ‘কোথায় রাত্রিযাপন করব’―চিন্তাটা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলেও কাজের মুহূর্তে সব ভুলে গেল সে। খদ্দেরের চাপ হালকা হলে চিন্তাটা আবার উদয় হলো মাথায়। উদিত চিন্তা মগজ থেকে জেগে উঠলেও মোচড় দিলো পেটে। পেটের মোচড়ে আবার পালিয়ে গেল মাথার চিন্তা। এমনই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছিল সে। হঠাৎ দেখল দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন এক পুলিশ কর্তা। পুলিশের লোক হলেও খুব বিনয়ের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন এম বখ্‌শের সঙ্গে। নিজের কাজে মগ্ন থাকলেও বারকয়েক দুখু আড়চোখে দেখে নিয়েছে সজ্জন পুলিশকে। কথা শেষ করে তিনি চলে যাওয়ার পর মালিক ডাকলেন দুখুকে।

‘শোনো, ওই যে পাশের তিনতলা বাড়ি, সেখানেই থাকেন এই দারোগা। মাঝে মাঝে আমাদের রুটি আর ডালভাজা নিয়ে যান তাঁরা। আজ রাতেও ওদের জন্য চারটি রুটি আর দুই প্লেট ডালভাজা দিয়ে আসবে তুমি। টাকা চাইতে হবে না। উনি বিল দিয়ে গেছেন।’

দুখু বলল, ‘আচ্ছা।’

কিছুক্ষণ পর, খদ্দের কমে আসায়, এম বখ্‌শ আবার ডাকলেন দুখুকে। ‘শোনো, ওই বাসায় যাওয়ার সময় একটু পরিষ্কার হয়ে যেয়ো। হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ো। ওনার নাম কাজী রফিজউল্লাহ্, খুবই ভদ্র পুলিশ, সাব-ইনসপেক্টর, অপরিষ্কার থাকা একদম পছন্দ করেন না। ওঁনার স্ত্রীও গুণী মহিলা। আমার ক্যানটিনের খাবার ওঁনাদের খুবই পছন্দের। অপরিচ্ছন্ন এক বয় ছিল এখানে। একবার খাবার দিতে গিয়ে বকা খেয়েছে হাত অপরিচ্ছন্ন ছিল বলে। আমিও খেয়ে ফেলেছি তার চাকরি। আশা করি, মনে থাকবে তার উদাহরণটা।’

দুখু জবাব দিলো, ‘আচ্ছা।’

মুখে উচ্চারিত ‘আচ্ছা’ শব্দটি বুকের ভয় দূর করতে পারল না। তবুও সাহস হারাল না সে।

কিছুক্ষণ পর দুখুর মুখের দিকে তাকিয়ে মালিক আবার প্রশ্ন করলেন, ‘ভয় পেয়েছ?’

জবাব না দিয়ে চুপ করে রইল দুখু। ভয় পেয়েছে কি না নিজেও বুঝতে পারল না। ‘পাইনি’ সে-কথাটাও বলতে পারল না।

‘শোনো। ভয় পেয়ো না। একটা কাকতালীয় ব্যাপার খেয়াল করলাম। তোমার আসল নামটা যেন কী বলেছিলে?’

‘কাজী নজরুল ইসলাম।’

‘হ্যাঁ। দারোগার ‘কাজী’ পদবিটার সঙ্গে তোমার নামের মিল আছে। তোমার নাম জিজ্ঞেস করলে পুরো নামটিই বোলো। কী বলো?’

‘জি বলব।’

‘যদি ওদের মনে মায়া ধরে যায়! তোমাকে দেখে তাদের মনে মায়া তৈরি হতেও পারে। নিঃসন্তান দম্পতি তো!’

একথার কোনো জবাব দিতে পারল না দুখু। কথার পিঠে কথা চালাতে পারে সে। অথচ মায়ার কথা শুনে কথা এখন থেমে গেল কেন! মায়াবোধের শূন্যতায় কি হাহাকার করে উঠল তার মন! কিছুই বুঝতে পারল না সে।

‘শোনো, কাজী রফিজউল্লাহ্ সাহেবের দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার কাজীর শিমলা গ্রামে। অনেক দূর বিভুঁইয়ে এসে চাকরি করছেন তিনি। তবে বুঝা যায় না তাঁর বাড়ি এত দূরে। এলাকার সবাইকে তিনি আপন ভাবেন। বেয়াদবি করে বোসো না যেন।’

‘না। বেয়াদবি করব না।’ আশ্বস্ত করল দুখু।

 

নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ রাত প্রায় আটটায় যথারীতি ফরমায়েশি খাবার নিয়ে পাশের বাড়ির সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় হাজির হলো দুখু। দরজায় টোকা দেওয়ার পর দরজা খুলেছেন মিসেস শামসুন্নেসা খানম, দারোগা সাহেবের স্ত্রী। হাতে ধরা প্লেটগুলো বেশ পরিচ্ছন্ন। বড়ো একটা থালার মধ্যে সাজানো-গোছানোর ধরন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন মিসেস রফিজউল্লাহ্। থালা-সহ প্লেটটা নিতে গিয়ে একবার মাত্র তাকালেন বাহকের দিকে।

চট করে যে তাঁর কী হলো! একটা চিনচিন করা মায়ার স্রোত ছড়িয়ে গেল দেহজুড়ে। বড়ো থালা-সহ বাটিগুলো হাতে নিয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি একটু দাঁড়াও।’

চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল দুখু। সুনসান নীরবতা দেখে বুঝল, ঘরে কেউ নেই। একা আছেন গৃহকর্ত্রী। এত বড়ো বাড়িতে একা থাকেন কীভাবে? এ প্রশ্নই ঝটিতি উদয় হলো দুখুর মাথায়।

ফিরে এসে থালাবাটি ফিরিয়ে দিতে দিতে গৃহকর্ত্রী মায়াবী স্বরে বললেন, ‘কী নাম তোমার?’

‘দুখু।’ এম বখ্‌শের কথা ভুলে মুখ ফসকে বলে ফেলল নিজের ডাকনামটি।

‘ওঃ! দুখু?’

‘জি দুখু। তবে আসল নাম কাজী নজরুল ইসলাম।’

‘কাজী’ শব্দটাও আমূল নাড়িয়ে দিলো শামসুন্নেসা খানমের অতৃপ্ত হৃদয়।

কোনো প্রতিক্রিয়া জানালেন না। নীরব ক্রিয়ার আঘাতে ভেতরটা নড়ে উঠলেও নীরবই রইলেন তিনি।

ফেরার সময় দুখু দেখল সিঁড়ির তলে বেশ খোলামেলা একটা জায়গা খালি পড়ে রয়েছে। বাড়ির বাইরে বড়ো গেট নেই। সহজেই এ জায়গায় ঢোকা যাবে। ঘুমানোও যাবে মনে হলো তার। থাকার জায়গার ব্যবস্থা হয়ে গেল ভাবতে ভাবতে রুটির দোকানে ফিরে গিয়ে রাতের খাবারের সুযোগ পেল দুখু। টানা কাজের চাপে খিদের কথা ভুলে গিয়েছিল। খেতে বসে বুঝল খিদের রাজ্যটা অনেক বড়ো। এ রাজ্য শাসন করা কঠিন।

খাবার শেষ করে দোকান বন্ধ হওয়ার পর বেরিয়ে এলো দুখু। সিঁড়ির তলে শুয়ে পড়ল মাথার তলে হাত দিয়ে। শীত শীত লাগছে। গায়ের কাপড় টেনেটুনে নিজেকে ঢেকে শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়ল সে।

 

চলবে...