উন্নয়নশীল বিশ্বের শাসক দল, বিরোধী দল হইতে শুরু করিয়া সকলেরই মনে রাখা দরকার, পরাধীন দেশের রাজনীতি আর স্বাধীন দেশের রাজনীতি কখনোই এক নহে। এক রকম হইতে পারে না। পরাধীনতার সময়ের রাজনীতি হইল অন্যায়, অত্যাচার, শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করিয়া অধিকার আদায়ের রাজনীতি। আর স্বাধীন দেশের রাজনীতি হইল দেশ গড়িবার রাজনীতি, দেশের উন্নয়ন, জনগণের উন্নয়নের রাজনীতি। বাংলাদেশ পরাধীনতার শৃঙ্খলতা ভাঙিয়া স্বাধীন হইয়াছে ৫০ বত্সর হইয়াছে, স্বাধীনতার এই ৫০ বত্সরে দেশের অভাবনীয় উন্নতি সাধন হইয়াছে, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়াছে, অবকাঠামোগত উন্নয়ন দৃশ্যমান হইয়াছে, মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাইয়াছে, জীবনমানের উন্নতি হইয়াছে। বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ হইতে উন্নয়নশীল বিশ্বের কাতারে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। রাজধানী হইতে শুরু করিয়া বড় বড় শহরগুলিতে ছোট-বড়-মাঝারি বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়িয়া উঠিয়াছে। উন্নয়নের ছোঁয়া কেবলই রাজধানী কিংবা বড় বড় শহরকেন্দ্রিক নহে, বরং দেশের গ্রামগঞ্জে কিংবা প্রত্যন্ত এলাকাতেও তাহা পৌঁছাইতেছে। গ্রাম হইতে মানুষ যেন বাধ্য হইয়া শহরের দিকে ছুটিয়া না আসে, সেই জন্য গ্রামাঞ্চলেও যথেষ্ট কর্মচঞ্চলতা সৃষ্টির প্রয়াস চলিতেছে। অন্ততপক্ষে গ্রামের মানুষকে এখন আর অবধারিতভাবে শহরের মুখাপেক্ষী হইতে হয় না। উন্নয়নের এই ধারা একটি চলমান প্রক্রিয়া, সুতরাং স্বাধীন দেশে যাহারা রাজনীতি করিয়া থাকেন, শাসকবর্গ হইতে শুরু করিয়া বিরোধী দল, সকলেরই মূল লক্ষ্য হওয়া দরকার দেশের অর্থনৈতিক জাগরণকে আরো সামনের দিকে আগাইয়া লইয়া যাওয়া।
আমরা দুঃখের সহিত লক্ষ করিয়া থাকি, উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক স্বাধীন দেশের রাজনীতিকরা পুরোনো ধ্যানধারণা কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না করিয়া পরাধীন আমলের ন্যায় রাজনীতিতে মনোনিবেশ করিয়া থাকেন। সেই সকল দেশে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন হউক আর বিরোধী দল হউক, একে অপরকে বাক্যবাণে আক্রমণ করিতে অভ্যস্ত হইয়া থাকেন। বলা বাহুল্য, কাজের তুলনায় কথা বেশি হইলে অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হইয়া থাকে। যেই সময়ে দেশকে গড়িয়া তোলা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ, সেই সময়ে হানাহানি, মারামারি, প্রতিহিংসা দেশের কোনো সুফল বহিয়া আনে না বরং দেশের উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করে। যাহারা এই সকল দেশের ক্ষমতায় থাকেন কিংবা যাহারা ক্ষমতায় নাই সকলেরই পুরাতন ধ্যানধারণা, চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনা অত্যাবশ্যক। আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল বিশ্বেও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসিয়াছে, মানুষ সচেতন হইয়াছে। সেইখানে ভোট হইতেছে, সাধারণ মানুষ তাহাদের মতামত প্রকাশ করিতেছে, আবার অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চারও হইতে দেখা যায়। সুতরাং কীভাবে সকলের প্রচেষ্টায় দেশকে আগাইয়া লওয়া যায়, দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা যায়, তাহাই হওয়া উচিত রাজনীতির মূলমন্ত্র। রাজনীতি করিয়া হয়তো অনেকে নেতা হইতে পারেন, কিন্তু মনে রাখিতে হইবে নেতা হওয়া আর রাষ্ট্রনায়ক হওয়া এক কথা নহে। একজন রাষ্ট্রনায়ক দেশের কথা ভাবিবেন, দেশের মানুষের কথা ভাবিবেন। স্বাধীন দেশের রাজনীতিকদের কর্তব্য দেশকে গড়িয়া রাখিয়া যাওয়া, যাহাতে ভবিষ্যত্ প্রজন্ম একটি সুখী, সমৃদ্ধিশালী দেশ পাইতে পারে। দ্বিমত থাকিবে না তাহা নহে। তবে সেই দ্বিমত হইতে হইবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট। ইহাই উন্নত বিশ্বে দেখা যায়।
সুতরাং সময় আসিয়াছে আমাদের সকলের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের। দেশে বর্তমানে যে অভাবনীয় উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলিতেছে, অর্থনৈতিক জাগরণ চলমান রহিয়াছে, সেই সুবর্ণ সুযোগটাকে সকলেরই কাজে লাগাইতে হইবে। পিতা-মাতা যেমন তাহাদের সন্তানকে গড়িয়া তুলিয়া মানুষের মতো মানুষ বানাইতে চায়, ঠিক তেমনি করিয়া স্বাধীন দেশকেও গড়িয়া তুলিয়া রাখিয়া যাইবার চেষ্টা থাকা দরকার।
