প্রসঙ্গ :নৌপথ নিরাপত্তা

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২১, ২১:৩১

এ দেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলোর সঙ্গে জীবন ও জীবিকা এক হয়ে মিশে আছে। নির্মল পরিবেশ ও যাত্রাপথ সহজতর হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই নৌপথ যাতায়াতের জনপ্রিয় এক মাধ্যম। এখনো প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক যাতায়াতে নৌপথকেই বেছে নেয়। তবে জনজীবনে নৌদুর্ঘটনাগুলো দুর্ভোগের কালো ছায়া হয়ে নেমে আসে। দেশে একের পর এক ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনায় নিরাপত্তা হারাচ্ছে যাত্রীদের প্রাণ, মৃতব্যক্তির স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠছে নদী তীরের বাতাস। নৌযান চালকের অদক্ষতা, যান্ত্রিক ত্রুটি, রুট না মেনে চলাচল, ধারণক্ষমতার চেয়ে অধিক হারে যাত্রীবোঝাই, ফিটনেসের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা, পর্যাপ্ত লাইফবয়ার ঘাটতি, নদীতে চর পড়ায় মাটির সঙ্গে ধাক্কা, নিবন্ধনহীন ট্রলার, অগ্নিকাণ্ড বিস্ফোরণ, লঞ্চের অভ্যন্তরে সুরক্ষা পথের অভাবসহ অসংখ্য কারণে সংঘটিত হচ্ছে এসব দুর্ঘটনা।

বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন-২০২০ অনুসারে, গত এক বছরে ১৮৩টি নৌদুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এমনকি চলতি বছরেও নিয়মিত ঘটছে এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যা দেশব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউন চলাকালেও থেমে ছিল না। ৪ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ শীতলক্ষ্যা নদীতে মুন্সিগঞ্জগামী লঞ্চডুবিতে ৩৫ জনের অধিক মৃত্যুবরণ করেন, মে মাসে মাদারীপুরের স্পিডবোটের সঙ্গে বাল্কহেড সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা ২৬ জন এবং এ মাসেরই ২৭ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বালুবাহী বাল্কহেড ও যাত্রীবাহী ট্রলারে (যাদের নিবন্ধন ও রুট পারমিট ছিল না) সংঘর্ষে বিআইডব্লিউটিএ-এর তথ্য মতে, শনিবার পর্যন্ত ২২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছে আরো অনেকে। ভরা নদীতে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনা সড়ক দুর্ঘটনার থেকেও ভয়াবহ! বেশির ভাগ যাত্রী লঞ্চ থেকে বের হতে না পারায় এখানে প্রাণের আশঙ্কাও সংকটাপন্ন। এছাড়া, স্রোতস্বিনী নদীগুলোতে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মৃতদেহেরও খোঁজ মেলে না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, ১০ শতাংশ নিখোঁজ ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া গেলেও বাকি ৯০ শতাংশ নিখোঁজ ব্যক্তি আর ফিরে আসে না।

এই দুর্ঘটনাসমূহের পুনরাবৃত্তি রোধ খুবই জরুরি। বেসরকারি সংস্থাসমূহের তথ্যমতে, দেশে ৬ হাজার নৌপথের বেশির ভাগই অরক্ষিত, এই পথগুলোতে অনুমোদনবিহীন নৌযানের সংখ্যাও অগণিত। দ্রুত এসব ক্ষেত্রকে সুশৃঙ্খল করা উচিত। এছাড়া সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নৌপথ নিরাপত্তায় আধুনিকায়ন প্রয়োজন। উদ্ধার তত্পরতা বাড়াতে আধুনিক জাহাজ, স্পিডবোট, হেলিকপ্টার ও সিপেনের সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। এতে প্রাণহানির আশঙ্কা কিছুটা হলেও কমবে। আর নৌযানগুলোর একাধিক বহিরাগমন পথ থাকা জরুরি, দুর্ঘটনার কবলে যাত্রীরা যেন প্রাণরক্ষায় দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ প্রশিক্ষক নিযুক্ত করে নৌচালকদের দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে প্রশাসনের তত্পরতা ও নজরদারি বাড়াতে হবে। সঠিক নকশায় লঞ্চ-ফেরি তৈরি হচ্ছে কি না এবং দেশে বিদ্যমান আইন অনুসারে প্রতি বছর ফিটনেস সনদ মূল্যায়ন হচ্ছে কি না; তাও নিশ্চিত করতে হবে। আইন অনুসারে ১৬ অশ্বশক্তির কম ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রলারসমূহের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় তাদের অনিয়ম ও বেপরোয়া গতিতে দিনের পর দিন দুর্ঘটনা বাড়ছে। এসব ট্রলারকেও জলদি আইনের আওতায় আনা উচিত। আর দুর্ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও কার্যকর করতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের আভাস পেলে যাত্রীবাহী এসব নৌযান চলাচল একেবারেই বন্ধ করতে হবে কর্তৃপক্ষকে। বিভিন্ন কারণে যাত্রীদের ভিড় এড়াতে স্পেশাল সার্ভিস সুবিধা চালু করাও অত্যাবশ্যকীয়। এসব কার্যক্রমের পাশাপাশি যাত্রীদেরকেও সজাগ হতে হবে। তাদের মনে রাখা দরকার, সময়ের থেকে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই লঞ্চে যাতায়াত থেকে বিরত থাকতে হবে। যাত্রাপথের সব নিয়ম-নীতি মেনে চলে লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে নিতে হবে। প্রতিটি নিয়ম মেনে সুরক্ষিত নৌপথে যাত্রীরা নিরাপদে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাক—এমনটাই সবার প্রত্যাশা।  

n লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়