সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর দশজন মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নারীরা কাজ করে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীনের পর থেকেই নারীদের জীবনমানে অকল্পনীয় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা তো কমেইনি বরং নিত্যনতুন কৌশল ও পন্থায় নারীর প্রতি পাশবিকতা এবং নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এমনকি নিজ ঘরেই নিগৃহীত হচ্ছেন তারা? সমাজ ও সভ্যতা যত এগিয়ে যাচ্ছে, ততই যেন এ প্রবণতা বেড়ে চলেছে। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতা ওলটালেই চোখে পড়ে নির্যাতিত, অবহেলিত, বিচারহীন হাজারো নারীর আর্তনাদের গল্প।
নারীর অবমাননা বা নারীর প্রতি পারিবারিক কিংবা মানসিক নির্যাতন সমাজে দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে। দেশে ধর্ষণ, গণধর্ষণ এমনকি ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন দেশের কোনো না কোনো স্থান থেকে ধর্ষণের ভয়াবহ বার্তা ভেসে আসে। সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে প্রায়ই নারীদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। নারী নির্যাতন তো কমছেই না বরং নির্যাতনের ধরন বদলেছে। এর মাঝে আবার নারীর ওপর সহিংসতার ঘটনাও দীর্ঘ হয়েছে করোনাকালে। নারী ও কন্যাশিশুর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি। নারী ও কন্যাশিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যার দরুন প্রতিনিয়তই ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, বৈবাহিক ধর্ষণ, বিবাহ-বিচ্ছেদ ও নারী পাচারের মতো ঘটনা ঘটছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপপরিষদে সংরক্ষিত ১৩টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৪৬ কন্যাশিশু ও নারী ধর্ষণের ঘটনাসহ মোট ৩ হাজার ৪৪০ জন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। যেখানে ২০১৯ সালে দেশে ১ হাজার ৩৭০টি ধর্ষণ, ২৩৭টি গণধর্ষণসহ ৪ হাজার ৬২২টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল।
নারী নির্যাতনের ফলে সমাজে শান্তির বদলে সহিংসতা এবং পৈশাচিকতার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ছে। মানসিক বিকারগ্রস্তে ভরে যাচ্ছে পুরো সমাজ। এর ফলে শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনের কারণে মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ হচ্ছেন হাজারো নারী। এরকম চলতে থাকলে সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ অলীক স্বপ্ন। প্রতিটি পদে পদে নারীকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়, শারীরিক মানসিক তা যেমনই হোক। বিচারহীন বা ন্যায়বিচারের অভাবে এই অপরাধটি সমাজ ধীরে ধীরে প্রবল আকারে ধারণ করেছে।
নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার প্রত্যাশিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। আমাদের নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রতিবাদ করতেই হবে এবং কোনোভাবেই এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। নারী নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি আরো বৃদ্ধি করতে হবে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অশিক্ষাসহ নানা কারণে যে নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে তাদেরকে এই অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য না করে তত্ক্ষণাত্ অত্যাচারকারীদের আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। এ অপরাধ প্রবণতা দূর করতে হলে সর্বাগ্রে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং সেই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পালটানোসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও পদক্ষেপ নিলে নারী নির্যাতনের মাত্রা কমানো সম্ভব হবে। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করতে হবে। দ্রুততম সময়ে প্রতিটি নারী নির্যাতনের ন্যায্য বিচার করতে হবে এবং বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে মামলা পরিচালনার প্রতি জোর দিতে হবে। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, জোরালো অবস্থান নিতে হবে এবং আওয়াজ তুলতে হবে। যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণ নারীর জন্য লজ্জার বিষয় নয় বরং এ লজ্জা নির্যাতনকারী ও ধর্ষণকারীর।
সুন্দর সমাজ গঠনে সুস্থ মানবিকতাসম্পন্ন মানুষের প্রয়োজন। একমাত্র সচেতনতাই পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতন রোধ করতে পারে। সর্বোপরি, আইনি প্রতিকারের মাধ্যমে নির্যাতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে নারী নির্যাতন প্রতিরোধবিষয়ক আইন ও নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিতকল্পে তদারকি সেল গঠন করতে হবে। আমাদের সবাইকে প্রতিটি নারীর সিদ্ধান্তকে যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত। বন্ধ হোক নারী নির্যাতন, প্রতিষ্ঠিত হোক সম-অধিকার। প্রতিটি দিন হোক নারী নির্যাতনমুক্ত।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
